২০২৫ সালজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একের পর এক শুল্ক আরোপ করলেও সেই চাপ সামলে রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে চীন। শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত গত বছর প্রায় ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ।গতকাল বুধবার প্রকাশিত রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের উৎপাদন সক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রভাব কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছে। আগামী অন্তত তিন বছর যুক্তরাষ্ট্রের অর্ডার অন্য বাজারে সরিয়ে নেওয়ার কৌশল নেওয়া হলেও, তার বিপরীতে চীনা উৎপাদকেরা আগেভাগেই প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গত জানুয়ারিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর নতুন করে শুল্ক উত্তেজনা শুরু হয়। তবে সেই প্রভাব তুলনামূলকভাবে ভালোভাবেই মোকাবিলা করেছে বেইজিং। মার্কিন শুল্কের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার বাজারে আরও জোর দিয়েছে।
একই সময়ে দীর্ঘদিনের আবাসন খাতের মন্দা ও দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদা সামাল দিতে চীন রপ্তানিনির্ভর কৌশলের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত চীনের বাণিজ্যনীতি, অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে অতিনির্ভরতা নিয়ে বিভিন্ন অর্থনীতির উদ্বেগ বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
চীনের শুল্ক বিভাগের তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে দেশটির বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ১.১৮৯ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অঙ্ক সৌদি আরবের মতো বিশ্বের শীর্ষ ২০টি অর্থনীতির একটি দেশের মোট জিডিপির সমান। গত নভেম্বরে প্রথমবার ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা ছাড়ানোর পরই এই রেকর্ড গড়ে।
এ প্রসঙ্গে বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের কাস্টমস প্রশাসনের উপমন্ত্রী ওয়াং জুন বলেন, বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি এখনো পর্যাপ্ত নয়। তিনি বলেন, চীনের বৈদেশিক বাণিজ্য উন্নয়নে বাইরের পরিবেশ কঠিন ও জটিলই রয়ে গেছে। তবে তাঁর মতে, বাণিজ্যিক অংশীদারদের বহুমুখীকরণের ফলে ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বেড়েছে। চীনের বৈদেশিক বাণিজ্যের ভিত্তি এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির রপ্তানি গত ডিসেম্বরে মূল্যমানের হিসাবে বছরে ৬.৬ শতাংশ বেড়েছে। আগের মাস নভেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৯ শতাংশ। অথচ রয়টার্সের জরিপে অর্থনীতিবিদেরা এ সময়ে মাত্র ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। আমদানিও বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ডিসেম্বরে আমদানি বৃদ্ধি পায় ৫.৭ শতাংশ, যেখানে নভেম্বর মাসে ছিল ১.৯ শতাংশ। এই হার ০.৯ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাসকেও ছাড়িয়ে গেছে।
পিনপয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান অর্থনীতিবিদ ঝিওয়েই ঝ্যাং বলেন, শক্তিশালী রপ্তানি প্রবৃদ্ধি দুর্বল অভ্যন্তরীণ চাহিদার নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা হলেও কমিয়েছে। তাঁর মতে, শেয়ারবাজারের চাঙ্গাভাব এবং যুক্তরাষ্ট্র–চীন সম্পর্কের আপাত স্থিতিশীলতার কারণে সরকার অন্তত প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে না।
প্রত্যাশার চেয়ে ভালো বাণিজ্য পরিসংখ্যান প্রকাশের পর চীনের মুদ্রা ইউয়ান স্থিতিশীল ছিল। শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সকালের লেনদেনে শাংহাই কম্পোজিট ও সিএসআই ৩০০ সূচক উভয়ই এক শতাংশের বেশি বেড়ে যায়।
গত বছর চীনের মাসিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সাতবারই ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৪ সালে যেখানে এমন ঘটনা ঘটেছিল মাত্র একবার, সেখানে এই প্রবণতা স্পষ্টভাবে বেড়েছে। তুলনামূলকভাবে দুর্বল ইউয়ানের সহায়তায় এই উদ্বৃত্ত আংশিকভাবে টিকে ছিল। এতে বোঝা যায়, ট্রাম্পের নীতিগত পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রমুখী রপ্তানি কিছুটা কমালেও বৈশ্বিক বাজারে চীনের সামগ্রিক বাণিজ্যে তার প্রভাব সীমিত ছিল।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের রপ্তানি ডলারমূল্যে ২০ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে চীনের আমদানি কমেছে ১৪.৬ শতাংশ। তবে অন্য বাজারগুলোতে চীনা কারখানাগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। আফ্রিকায় রপ্তানি বেড়েছে ২৫.৮ শতাংশ। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানে রপ্তানি বেড়েছে ১৩.৪ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নে এই প্রবৃদ্ধি ৮.৪ শতাংশ।
গত মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন চীন মার্কিন পণ্যের জন্য নিজেদের বাজার খুলে দিতে পারে। এর এক দিন আগেই তিনি ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলোর ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। এতে বেইজিংয়ের সঙ্গে পুরোনো উত্তেজনা ফের উসকে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, কারণ ইরান চীনের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, চলতি বছরও বৈশ্বিক বাজারে চীনের অংশীদারি বাড়বে। চীনা কোম্পানিগুলোর বিদেশে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন এতে বড় ভূমিকা রাখছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে কম শুল্কে প্রবেশের সুযোগ মিলছে। পাশাপাশি নিম্নমানের চিপ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যের শক্তিশালী চাহিদাও রপ্তানি বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে।
চীনের অটোমোবাইল শিল্পকে বেইজিংয়ের বৈশ্বিক শিল্পাকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। গত বছর দেশটির মোট গাড়ি রপ্তানি ১৯.৪ শতাংশ বেড়ে ৫.৭৯ মিলিয়ন ইউনিটে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে পুরোপুরি বৈদ্যুতিক গাড়ির রপ্তানি বেড়েছে ৪৮.৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে জাপানকে পেছনে ফেলে বিশ্বের শীর্ষ অটো রপ্তানিকারক হওয়ার পর টানা তৃতীয় বছরও এই অবস্থান ধরে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে চীনের।
তবে দীর্ঘমেয়াদে সাফল্য ধরে রাখতে শিল্পপণ্যের রপ্তানি কিছুটা সংযত করার প্রয়োজনীয়তার কথা ভাবছে বেইজিং। অতিমাত্রায় রপ্তানিনির্ভরতার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা ও ভাবমূর্তিগত ঝুঁকি নিয়ে নেতৃত্ব পর্যায়ে আলোচনা বাড়ছে। গত নভেম্বরে ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের তথ্য প্রকাশের পর চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং জাতীয় টেলিভিশনে সক্রিয়ভাবে আমদানি বাড়ানো এবং আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের আহ্বান জানান। এরই মধ্যে সৌর শিল্পে দীর্ঘদিনের রপ্তানি কর রেয়াত বা ভর্তুকি বাতিল করেছে চীন, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিরোধের বড় কারণ ছিল। পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্যের প্রতি অঙ্গীকার দেখাতে বৈদেশিক বাণিজ্য আইনের সংশোধনীও দ্রুত পাস করা হয়েছে।
অক্টোবরের শেষ দিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিনপিং এক বছরের জন্য শুল্কসংক্রান্ত একটি সমঝোতায় পৌঁছালেও, চীনা পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত শুল্ক এখনো গড়ে ৪৭.৫ শতাংশে রয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই হার যদি প্রায় ৩৫ শতাংশের মধ্যে থাকে, তাহলে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো লাভজনকভাবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারবে।

