উন্নয়নশীল বিশ্বের প্রতি চারটি দেশের মধ্যে একটি দেশে এখনো ২০১৯ সালের তুলনায় গড় আয় কম। ২০১৯ ছিল কোভিড-১৯ মহামারির আগে। এমন তথ্য জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থাটি বলেছে, নিম্নআয়ের অনেক দেশ গত বছরের শেষ পর্যন্ত ছয় বছরে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা পেয়েছে। এসব দেশের অধিকাংশই সাব-সাহারান আফ্রিকায় অবস্থিত।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এই তালিকায় রয়েছে বতসোয়ানা, নামিবিয়া, মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র, চাদ ও মোজাম্বিক। দক্ষিণ আফ্রিকা ও নাইজেরিয়াও এই সময়ে গড় আয় বাড়াতে পারেনি। বিশেষ করে নাইজেরিয়ার জনসংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ২০২৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার অর্থনীতি ১.২ শতাংশ এবং নাইজেরিয়ার অর্থনীতি ৪.৪ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেলেও গড় আয় বাড়েনি।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, মহামারির পর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ‘নিম্নমুখী’। প্রবৃদ্ধি এত ধীর যে তা চরম দারিদ্র্য কমানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চলতি বছরে ৪.২ শতাংশ থেকে কমে আগামী বছর ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে।
সংস্থা জানিয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি স্থিতিশীল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি গত বছর ভালো ফল দেখিয়েছে। তবে ২০২৬ সালে অগ্রগতি সীমিত হতে পারে। কারণ উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জে পড়বে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ২০২৫ সালে ২.১ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ২.২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। জুনে দেওয়া পূর্বাভাসের তুলনায় এটি যথাক্রমে ০.৭ ও ০.৬ শতাংশ পয়েন্ট বেশি। ইউরো অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি পিছিয়ে রয়েছে। সেখানে ২০২৫ সালে বৃদ্ধি মাত্র ০.৯ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ১.২ শতাংশ হতে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, আগামী দুই বছরে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি মোটামুটি স্থির থাকবে। ২০২৫ সালে ২.৭ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালে ২.৬ শতাংশে নামতে পারে। এরপর ২০২৭ সালে আবার ২.৭ শতাংশে পৌঁছাবে। এটি জুনের পূর্বাভাসের তুলনায় সামান্য ঊর্ধ্বমুখী।
প্রতিবেদন বলেছে, যে প্রতি চারটি উন্নয়নশীল দেশের একটিতে গড় আয় এখনও ২০১৯ সালের নিচে, তাদের অনেক দেশে যুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষ হয়েছে। মহামারি থেকে পুনরুদ্ধার দেরি হওয়ায় সাম্প্রতিক প্রবৃদ্ধি আগের ধস কাটাতে পর্যাপ্ত নয়।
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, “এই প্রবণতাগুলো শুধু দুর্ভাগ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অনেক উন্নয়নশীল দেশে এগুলো এড়ানো সম্ভব ছিল নীতিগত ভুলের কারণে।” তিনি আরও বলেন, টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কঠোর বাজেট নীতি মেনে চলা দরকার। দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জনের সূত্র সব দেশের জন্য প্রায় একই।
গিল বলেন, “স্থবিরতা ও বেকারত্ব এড়াতে উদীয়মান ও উন্নত অর্থনীতির সরকারগুলোকে বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাণিজ্য উদার করতে হবে। সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। পাশাপাশি নতুন প্রযুক্তি ও শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।” তিনি সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হলেও তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারছে না। আগামী এক দশকে ১৬ বছরের নিচে প্রায় ১.২ বিলিয়ন মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করবে।
গিল আরও জানিয়েছেন, “প্রতিটি বছর পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতি প্রবৃদ্ধি তৈরির সক্ষমতা হারাচ্ছে। নীতিগত অনিশ্চয়তার প্রতিও সহনশীল হয়ে উঠছে। কিন্তু অর্থনৈতিক গতিশীলতা ও স্থিতিশীলতা দীর্ঘদিন আলাদা থাকতে পারে না। তা হলে সরকারি অর্থব্যবস্থা ও ঋণবাজারে ভাঙন ধরবে।” তিনি বলেন, আগামী বছরগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতি ১৯৯০-এর দশকের সংকটময় সময়ের চেয়েও ধীর গতিতে বাড়বে। অথচ তখন সরকারি ও বেসরকারি ঋণ রেকর্ড উচ্চতায় থাকবে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চীনের অর্থনীতি চলতি বছরে ৪.৪ শতাংশ এবং আগামী বছরে ৪.২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। জুনে দেওয়া আগের পূর্বাভাসের তুলনায় এটি উন্নত হলেও চীনের ৩৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম প্রবৃদ্ধি। ২০২৫ সালের জন্য আগের পূর্বাভাস ছিল ৪.৯ শতাংশ। কমিউনিস্ট পার্টি লক্ষ্য ৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক বাড়ির পর চীনের অর্থনীতি চাপের মুখে রয়েছে। দ্রুত বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা ও আবাসন খাতের ওঠানামা সামলাতেও দেশটি হিমশিম খাচ্ছে। সরকারি ব্যয় বৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ ভোক্তা ব্যয়ের কারণে চীনের অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে স্থিতিশীল প্রমাণিত হয়েছে।

