জেফ্রি এপস্টেইন ছিলেন এমন এক ব্যক্তি—যার নাম উচ্চপদস্থ, ধনকুবের ও সেলিব্রিটিরা প্রকাশ্যে বলতেও দ্বিধা করতেন। তিনি ছিলেন না কোনো অভিনেতা বা নির্বাচিত রাজনীতিক, তবে বিশ্বের ক্ষমতাশালী মানুষদের সঙ্গে তার সামাজিক ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল বিস্তৃত। পরবর্তীতে তিনি পরিচিত হন ভয়াবহ যৌন অপরাধী ও মানব পাচারকারী হিসেবে।
রহস্যময় উত্থান-
১৯৫৩ সালে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম জেফ্রি এপস্টেইনের। গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে মেধাবী ছিলেন, কলেজ শেষ না করেই তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন একটি অভিজাত প্রাইভেট স্কুলে। স্কুলের ধনী অভিভাবকদের সঙ্গে পরিচয় তাকে ফিনান্স জগতের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছে দেয়। কিন্তু তার সম্পদের প্রকৃত উৎস আজও রহস্যময়।

ক্ষমতার নেটওয়ার্ক-
এপস্টেইনের সামাজিক নেটওয়ার্ক বিস্ময়কর। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার সম্পর্ক নথিতে উঠে এসেছে। নিউইয়র্ক, ফ্লোরিডা, প্যারিস ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপে তার বিলাসবহুল প্রাসাদ এবং নিজস্ব দ্বীপ লিটল সেন্ট জেমস পরিণত হয়েছিল ভয়ংকর অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে।

যৌন নির্যাতন ও মানব পাচার-
২০০০ দশকের শুরু থেকেই অভিযোগ উঠতে থাকে যে তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের প্রলুব্ধ করে যৌনকর্মে বাধ্য করতেন। দরিদ্র ও অসহায় কিশোরীদের ম্যাসার বা মডেলিংয়ের সুযোগ দেখিয়ে ডেকে নিয়ে তার বাসভবনে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন হতো। ২০০৮ সালে ফ্লোরিডায় এক মামলায় তিনি দোষ স্বীকার করলেও মাত্র ১৩ মাসের কারাদণ্ড পান।

দ্বিতীয় গ্রেপ্তার ও রহস্যময় মৃত্যু-
২০১৯ সালে নিউইয়র্কে ফের গ্রেপ্তার হন এপস্টেইন। অভিযোগ ছিল যৌন পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও বহু ভুক্তভোগীর নির্যাতন। ১০ আগস্ট ২০১৯ তারিখে তিনি ম্যানহাটনের কারাগারে মৃত অবস্থায় পাওয়া যান। সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী এটি আত্মহত্যা। তবে সিসিটিভি অকেজো থাকা, রক্ষীদের গাফিলতি ও তার উচ্চপ্রোফাইল অবস্থান আজও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কেন্দ্রবিন্দু।

এপস্টেইন ফাইলস ও উত্তরাধিকার-
মৃত্যুর সাত বছর পরও এপস্টেইনের কাহিনী শেষ হয়নি। আদালত নথি, সাক্ষ্য ও এপস্টেইন ফাইলসের মাধ্যমে একের পর এক নাম, যোগাযোগ ও গোপন নেটওয়ার্ক সামনে আসছে। যদিও অনেক নাম অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কেসটি বিশ্বজুড়ে ক্ষমতা, যৌন শোষণ ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

জেফ্রি এপস্টেইনের গল্প কেবল একজন অপরাধীর কাহিনী নয়—এটি আধুনিক সমাজের অন্ধকার দিকের প্রতিফলন। তার মৃত্যুর পরও ফাইলস প্রকাশের মাধ্যমে দেখা যায়, যেখানে অর্থ ও ক্ষমতা থাকলে অপরাধ দীর্ঘদিন আড়াল করা সম্ভব, সেখানে ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে। এপস্টেইন মারা গেছেন, কিন্তু তার সাথে জড়িত নামগুলো আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, উইকিপিডিয়া, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, বিবিসি

