পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তানে টানা তিন দিন ধরে চলা নিরাপত্তা অভিযানে ভয়াবহ প্রাণহানির খবর সামনে এসেছে। ১ থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশটির সেনাবাহিনী ও নিরাপত্তা বাহিনী প্রদেশটির অন্তত ১২টি শহরে অভিযান চালায়। এতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী নিহত হয়েছেন ১৯৭ জন স্বাধীনতাকামী যোদ্ধা এবং ২২ জন সেনা সদস্য।
পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর আন্তঃবিভাগীয় জনসংযোগ দপ্তর (আইএসপিআর) বুধবার এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযানের সময় ‘ক্রসফায়ারের’ মধ্যে পড়ে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ৩৬ জন বেসামরিক সাধারণ মানুষ। এই তথ্য নতুন করে বেলুচিস্তানে চলমান সংঘাতের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।
এই সহিংস পরিস্থিতির সূচনা ঘটে গত ৩১ জানুয়ারি। সেদিন বেলুচিস্তানের রাজধানী কোয়েটাসহ নুশকি, দালবান্দিন, খারান, পাঞ্জগুর, তাম্প, গাওদার ও পাসনিসহ মোট ৯টি শহরে একযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলার লক্ষ্য ছিল পুলিশ স্থাপনা, সেনা ঘাঁটি এবং বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামো। পরবর্তীতে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র সংগঠন বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এসব হামলার দায় স্বীকার করে।
এই হামলার পরপরই বেলুচিস্তানজুড়ে নিরাপত্তা অভিযান শুরু করে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী। ৩১ জানুয়ারি থেকেই অভিযান চলতে থাকে এবং পরদিন ১ ফেব্রুয়ারি থেকে এতে সরাসরি সেনাবাহিনী যুক্ত হয়। এরপর টানা কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন শহরে অভিযান পরিচালিত হয়, যা দ্রুতই বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেয়।
বেলুচিস্তান ভৌগলিক আয়তনের দিক থেকে পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ। একই সঙ্গে এটি প্রাকৃতিক সম্পদে—বিশেষ করে গ্যাস, খনিজ ও সমুদ্রবন্দর সম্ভাবনায়—অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কিন্তু এই বিপুল সম্পদের মাঝেও বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে দারিদ্র্যপীড়িত ও অবহেলিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। উন্নয়ন বৈষম্য, রাজনৈতিক বঞ্চনা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধ এখানকার সংঘাতকে আরও গভীর করেছে।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর থেকেই বেলুচিস্তানে স্বাধীনতার দাবি ঘিরে সশস্ত্র আন্দোলন চলমান। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও সেনাবাহিনী এই আন্দোলন দমনে বরাবরই কঠোর নিরাপত্তা নীতি অনুসরণ করে এসেছে। বহু বছর ধরে চলা এই সংঘাতের ফলে অঞ্চলটি কার্যত স্থায়ী অস্থিরতার মধ্যে রয়েছে।
বর্তমানে বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) বেলুচিস্তানের সবচেয়ে প্রভাবশালী স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের কথা বলে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদ বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, বেলুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে ভারতের পক্ষ থেকে মদদ দেওয়া হচ্ছে। তবে নয়াদিল্লি শুরু থেকেই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছে এবং একে ভিত্তিহীন বলে দাবি করছে।
সব মিলিয়ে, বেলুচিস্তানে সাম্প্রতিক এই অভিযান আবারও দেখিয়ে দিল—এই অঞ্চলটির সংকট কেবল নিরাপত্তাজনিত নয়, বরং এটি ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির জটিল এক সমন্বয়। সহিংসতা থামানোর পাশাপাশি এই সংকটের রাজনৈতিক সমাধান খোঁজা না গেলে বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই এমন রক্তাক্ত অধ্যায়ের সাক্ষী হয়ে থাকবে।

