আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আবারও শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে। মার্কিন ডলারের দরপতন, অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাস এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। এর ফলে টানা তিন কার্যদিবস ধরে দাম বাড়তে বাড়তে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।
বাজার সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৬ বুধবার লেনদেন চলাকালে আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক স্বর্ণের দাম ২ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৭৫ দশমিক ৫৩ ডলারে পৌঁছায়। এটি ৭ জুলাই-এর পর সর্বোচ্চ মূল্য। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বর্ণের ভবিষ্যৎ চুক্তির দাম ২ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ২৩৫ দশমিক ৩০ ডলারে লেনদেন হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী সুদের হার নির্ধারণের আগে বিনিয়োগকারীরা দেশটির কর্মসংস্থান পরিস্থিতির দিকে গভীর নজর রাখছেন। একই সঙ্গে মার্কিন ডলারের দুর্বলতা এবং অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ায় মূল্যস্ফীতি নিয়ে আশঙ্কা কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। এসব কারণে অনেক বিনিয়োগকারী তুলনামূলক নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, স্বর্ণের প্রতি বিনিয়োগকারীদের ঝোঁকও তত বৃদ্ধি পায়। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই স্বর্ণকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি, মূল্যস্ফীতি এবং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতিও সেই প্রবণতাকেই আরও স্পষ্ট করেছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়াও স্বর্ণের বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানি ব্যয় কমলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে—এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ডলারের মান কমে যাওয়ায় অন্যান্য মুদ্রাধারীদের জন্য স্বর্ণ কেনা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়ে পড়েছে, ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞ কেলভিন ওয়াংয়ের মতে, জ্বালানি তেলের বাজার বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। তেলের দামের পরিবর্তন শুধু উৎপাদন ব্যয় নয়, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রানীতি এবং বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে তেলের দামের ওঠানামা এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন স্বর্ণের বাজারেও সরাসরি প্রতিফলিত হচ্ছে।
শুধু স্বর্ণ নয়, অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও একই ধরনের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দাম ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে প্রতি আউন্স ৬১ দশমিক ৭৬ ডলারে পৌঁছেছে। প্লাটিনামের দাম ২ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৭৭৯ দশমিক ২৫ ডলারে উঠেছে। একই হারে বেড়ে প্যালাডিয়ামের দাম দাঁড়িয়েছে প্রতি আউন্স ১ হাজার ৩৮৯ দশমিক ১৫ ডলার, যা গত দুই মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান প্রতিবেদন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরবর্তী সুদের হার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর আগামী কয়েক সপ্তাহে স্বর্ণের বাজারের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে। যদি ডলারের দুর্বলতা অব্যাহত থাকে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বজায় থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, শক্তিশালী অর্থনৈতিক তথ্য বা সুদের হার নিয়ে ভিন্নধর্মী সিদ্ধান্ত এলে বাজারে নতুন ভারসাম্যও তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে মূল্যবান ধাতুর বাজার আবারও বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। বিশেষ করে স্বর্ণের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক বাজারের পরিবর্তিত বাস্তবতায় নিরাপদ বিনিয়োগের চাহিদা এখনো শক্ত অবস্থানেই রয়েছে।

