বিশ্ববাণিজ্যের প্রচলিত সমুদ্রপথে অস্থিরতা বাড়ার মধ্যেই নতুন এক বাণিজ্যপথের দিকে নজর দিচ্ছে চীন। আর্কটিক মহাসাগরের বরফাচ্ছন্ন জলরাশি পেরিয়ে রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে যাওয়া উত্তর সাগরপথে প্রথমবারের মতো কনটেইনার সেবা চালু করেছে চীনা শিপিং কোম্পানি সি লিজেন্ড। চীন-ইউরোপ বাণিজ্যে এই পথ সময় ও দূরত্ব কমানোর সম্ভাবনা তৈরি করলেও পরিবেশগত বিপর্যয়, উচ্চ পরিচালন ব্যয়, রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মতো ঝুঁকিও সামনে এসেছে। সূত্র: গার্ডিয়ান
প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উত্তর সাগরপথ রাশিয়ার উত্তর উপকূল ধরে আর্কটিক সার্কেল অতিক্রম করেছে। বছরের উষ্ণ সময়েই মূলত এ পথে জাহাজ চলাচল সম্ভব। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গ্রীষ্মকালে আর্কটিকের সমুদ্রবরফ দ্রুত কমে যাওয়ায় নৌযান চলাচলের সময়সীমাও ধীরে ধীরে বাড়ছে।
সি লিজেন্ডের নিয়মিত সেবা চীনের নিংবো-ঝৌশান বন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো বন্দরে পৌঁছাতে প্রায় ১৮ দিন সময় নিচ্ছে। একই যাত্রায় সুয়েজ খাল ব্যবহার করলে সময় লাগে ৪০ দিনেরও বেশি। ফলে উত্তর সাগরপথ ব্যবহার করে চীন-ইউরোপ বাণিজ্যে সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপমাত্রা-সংবেদনশীল পণ্য পরিবহনে এ পথ বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, লিথিয়াম ব্যাটারি ও সৌরবিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট পণ্যের মতো পণ্যের বড় রপ্তানিকারক চীনের জন্য দ্রুত ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে এই রুট।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতও উত্তর সাগরপথে পণ্য পরিবহনের বিষয়ে আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে নিয়মিত বাণিজ্যিক সেবা চালুর ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত চীনই সবচেয়ে এগিয়ে।
আর্কটিক অঞ্চলে চীনের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং চীন ও রাশিয়ার মধ্যে আর্কটিক নৌপথ উন্নয়নের আহ্বান জানান এবং ‘পোলার সিল্ক রোড’ গড়ে তোলার ধারণা সামনে আনেন।
উত্তর সাগরপথের বড় অংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন। দেশটির রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক প্রতিষ্ঠান রোসাটম নেভিগেশন অনুমতি দেওয়া থেকে শুরু করে এ পথের জাহাজ চলাচল তদারক করে। বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলে চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় পারমাণবিক শক্তিচালিত আইসব্রেকারও সরবরাহ করে রাশিয়া।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ফলে আর্কটিক অঞ্চলেও বেইজিংয়ের প্রভাব ও প্রবেশাধিকার বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সি লিজেন্ডের দাবি, যাত্রাপথ ছোট হওয়ায় উত্তর সাগরপথ ব্যবহার করলে কার্বন নিঃসরণ প্রায় অর্ধেকে নামতে পারে। তবে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই হিসাবের সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলের পরিবেশগত ঝুঁকিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে হেভি ফুয়েল অয়েল বা ভারী জ্বালানি তেল ব্যবহারের বিষয়টি বড় উদ্বেগের কারণ। আর্কটিক অঞ্চলে তেল ছড়িয়ে পড়লে তা পরিষ্কার করা অত্যন্ত কঠিন। ঠান্ডা আবহাওয়ায় তেল দ্রুত ভাঙে না এবং বরফের মধ্যে আটকে গেলে তা অপসারণ প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।
আরেকটি বিপদের নাম ‘ব্ল্যাক কার্বন’। ভারী জ্বালানি তেল পোড়ানোর ফলে তৈরি এই কণা বরফের ওপর জমে সূর্যের আলো প্রতিফলনের ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এতে বরফ বেশি তাপ শোষণ করে, যা আর্কটিক অঞ্চলের উষ্ণায়ন এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন এই অঞ্চলে কোনো জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়লে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতেও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে বড় ধরনের তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।
উত্তর সাগরপথে রাশিয়ার তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগ রয়েছে। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহৃত এসব তেলবাহী জাহাজের অনেকগুলোর পর্যাপ্ত বীমা বা নিয়ন্ত্রক নজরদারি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা প্রায় ১০০টি জাহাজ উত্তর সাগরপথে চলাচল করেছে বলে বেলোনার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। চলতি বছর তুলনামূলক উষ্ণ গ্রীষ্মের কারণে এ ধরনের জাহাজ চলাচল আরও বাড়ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি রাশিয়ার এলএনজি পরিবহনকারী একটি জাহাজ স্বাভাবিক সময়ের আগেই এ পথে যাত্রা শুরু করেছে। গত সপ্তাহে রুশ তেলবাহী জাহাজের একটি বড় বহরকেও উত্তর সাগরপথের অস্বাভাবিক উত্তরের অংশ দিয়ে যেতে দেখা গেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে বছরের আরও দীর্ঘ সময় উত্তর সাগরপথ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের উপযোগী হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে উচ্চ পরিচালন ব্যয়, সীমিত নৌযান চলাচলের মৌসুম, কঠিন আবহাওয়া, উদ্ধারকাজের জটিলতা এবং রাশিয়ার ওপর নির্ভরতার কারণে পথটি এখনো বড় পরিসরে সুয়েজ খালের বিকল্প হয়ে উঠতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর সাগরপথ চীন-ইউরোপ বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ নতুন রুট হিসেবে জায়গা করে নিতে পারে। তবে এর পরিবেশগত ও রাজনৈতিক ঝুঁকি সামলে না উঠলে দ্রুতগতির এই বাণিজ্যপথই ভবিষ্যতে বড় ধরনের সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অর্থাৎ, আর্কটিকের বরফ গলে যে নতুন বাণিজ্যদ্বার খুলছে, তা বিশ্ববাণিজ্যের চিত্র বদলানোর সম্ভাবনা রাখে—কিন্তু আপাতত সুয়েজ বা হরমুজের পূর্ণাঙ্গ বিকল্প হওয়ার মতো অবস্থানে পৌঁছায়নি।

