মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আবারও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহের দাম ২৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯১.১৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর আগের লেনদেনেও দাম জুলাইয়ের শেষ দিকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহের দাম ৪২ সেন্ট বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৮৫.০৪ ডলারে লেনদেন হয়েছে। দিনের শুরুতে এর দাম আরও বেশি বেড়ে ১ শতাংশের বেশি ঊর্ধ্বমুখী হয়ে প্রতি ব্যারেল ৮৫.৩৭ ডলারে পৌঁছেছিল।
তেলের বাজারে এই ঊর্ধ্বগতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিকে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা কমার পরিবর্তে আরও বাড়তে থাকায় জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান বন্ধ এবং যুদ্ধবিরতির বিষয়ে কোনো সমঝোতা সফল না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। তেহরান আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়াতে রাজি না হওয়ায় নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্বের জ্বালানি বাজারে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্ব অনেক বেশি। এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু উৎপাদন নয়, তেল পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে বাস্তবে সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি না হলেও ভবিষ্যতে সংকটের আশঙ্কা তেলের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে।
বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতেও ঠিক এমনটাই দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের বিষয়টি বিবেচনায় নিচ্ছেন। এর প্রভাব পড়ছে অপরিশোধিত তেলের দামে।
তেলের দাম বাড়ার বিষয়টি শুধু আন্তর্জাতিক বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। দীর্ঘ সময় ধরে দাম বেশি থাকলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। কারণ অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানি আমদানিতে বেশি অর্থ ব্যয় হলে পরিবহন থেকে শুরু করে শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে খরচ বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের এই ওঠানামা তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বেড়ে যেতে পারে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পরিবহন ব্যয়, পণ্য উৎপাদন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচেও পড়তে পারে।
তবে তেলের বাজারের পরবর্তী গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির ওপর। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা কমে এলে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগও কিছুটা প্রশমিত হতে পারে। বিপরীতে সংঘাত আরও বাড়লে তেলের বাজারে নতুন করে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের দিকে নজর রাখছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদেরা। কারণ যুদ্ধ ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা যত দীর্ঘ হবে, জ্বালানি বাজারে তার প্রভাবও তত গভীর হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
সূত্র: আল জাজিরা

