মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি আর বাড়তে থাকা সরকারি ঋণের চাপের মধ্যেই আজ সোমবার থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে শুরু হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভা। সংকটগুলো সামাল দেওয়া, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির গতি ধরে রাখা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ কমানোর পথ খোঁজাই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে সম্মেলন চলবে আগামী ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত। ১৯১টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, অর্থমন্ত্রী, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তাসহ ১৫ হাজারের বেশি মানুষের অংশ নেওয়ার কথা। তিন বছর পর আবারও ওয়াশিংটনের বাইরে এই বার্ষিক সভা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম, প্রবৃদ্ধির গতি, সরকারি ঋণের বোঝা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট। এর সঙ্গে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির প্রসঙ্গও থাকবে।
এবারের বৈঠকের কেন্দ্রে রয়েছে জ্বালানি সংকট। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অনিশ্চয়তায় ফেলেছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তাই এর প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতে আটকে থাকছে না। জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, বিদ্যুৎ, শিল্প ও কৃষির উৎপাদন খরচ বাড়ে। সেই চাপ গিয়ে পড়ে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি সামলানো এবং প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা নীতিনির্ধারকদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা রয়টার্সকে বলেছেন, একসঙ্গে একাধিক ঝুঁকি বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। তাঁর মতে, ডিজেলের উচ্চমূল্য, সারের দাম বৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য সুপার এল নিনোর প্রভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। বিশ্বব্যাংক আপাতত তাদের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে কোনো পরিবর্তন আনছে না, তবে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে। বাঙ্গার পরামর্শ, জলবায়ুর প্রভাবের পাশাপাশি জ্বালানি, সার ও ঋণের খরচ একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে সামনের মাসগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে হবে। জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা উদ্যোগও আলোচনায় আছে। রয়টার্স জানিয়েছে, জি-৭ দেশগুলো জরুরি মজুত থেকে তেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে। তবে শিল্প খাতের কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, ব্যবহারযোগ্য মজুত কমে এলে বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে।
জ্বালানি ও খাদ্যের দামবৃদ্ধির প্রভাব কত দিন থাকবে, তা নিয়েও উদ্বেগ আছে। আইএমএফের গবেষণা বলছে, খাদ্য ও জ্বালানির দাম হঠাৎ বাড়লে মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা দীর্ঘ সময় উঁচুতে থেকে যেতে পারে। এতে দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়ে, আর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ঝুঁকিতে পড়ে। আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্ক থাকার ওপর জোর দিয়েছেন। সংস্থাটি ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ শতাংশের কাছাকাছি রেখেছে। তবে যুদ্ধ ও অন্যান্য ঝুঁকির কারণে বিভিন্ন দেশের পূর্বাভাসে বদল আসতে পারে।
এখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সামনে এক কঠিন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। সুদের হার উঁচুতে রাখলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমতে পারে, কিন্তু ঋণের খরচ বেড়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাধাগ্রস্ত হয়। আবার সুদের হার দ্রুত কমালে মূল্যস্ফীতি নতুন করে মাথা তুলতে পারে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগের গতি ধরে রাখা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর মধ্যে ভারসাম্য খোঁজাই হতে পারে বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা।
বিশ্ব অর্থনীতির আরেক বড় দুশ্চিন্তা সরকারি ঋণ। আইএমএফের মূল্যায়নে বৈশ্বিক সরকারি ঋণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমান ধারা চলতে থাকলে ২০৩০ সালের আগেই এই ঋণ বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। ঋণ বাড়ায় সরকারগুলোর বাজেটের বড় অংশ চলে যাচ্ছে সুদ পরিশোধে। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা আরও কঠিন। অনেক দেশকে পুরোনো ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে, তা-ও উচ্চ সুদে। আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বেশি থাকলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক নিরাপদ ও লাভজনক বাজারে অর্থ সরিয়ে নেন। এতে উন্নয়নশীল দেশের মুদ্রার বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও বিনিয়োগের ওপর চাপ বাড়ে। ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর উপায় তাই আলোচনায় বড় জায়গা পেতে পারে।
ঋণসংকটে থাকা স্বল্প আয়ের দেশগুলোর সামনে চ্যালেঞ্জ দ্বিগুণ। তাদের রাজস্ব আয় সীমিত, অথচ সুদ মেটাতে আয়ের বড় অংশ চলে যায়। এতে দারিদ্র্য কমানো ও উন্নয়ন কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোভিড মহামারির সময় দরিদ্র দেশগুলোর ঋণ পরিশোধ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। এবার একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। ঋণদাতা দেশগুলোর নিজস্ব আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও রাজনৈতিক চাপ এতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির শর্ত নিয়েও বিতর্ক চলছে। কম সংখ্যক কিন্তু গভীর সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে কিছু স্বল্প আয়ের দেশ উদ্বিগ্ন। তাদের আশঙ্কা, সংস্কারের অংশ হিসেবে কর বাড়ানো ও সরকারি ব্যয় কমানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হলে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়বে। ঋণ শোধের সক্ষমতা ফেরানোর পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা বজায় রাখা কীভাবে সম্ভব, সে প্রশ্নও আলোচনায় আসতে পারে।
সংকটের পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উপায়ও এবারের আলোচনায় জায়গা পেয়েছে। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কীভাবে কম খরচে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করতে ও বিদ্যমান কাজের মান বাড়াতে পারে, তা নিয়ে কথা হবে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সূচি অনুযায়ী, আজ সোমবার সকাল ১০টা থেকে ১১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত ‘স্মল এআই: মোর অ্যান্ড বেটার জবস’ শীর্ষক একটি আলোচনা হবে। এতে অংশ নেবেন অজয় বাঙ্গা, উদ্ভাবক ও বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা। একই দিন দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত বাঙ্গা ও সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। প্রযুক্তির সুফল পেতে হলে অবশ্য দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার এবং নতুন কাজের সুযোগ বাড়ানোর দিকেও সমান নজর দিতে হবে।
ভূরাজনৈতিক সংঘাতের সঙ্গে অর্থব্যবস্থার সম্পর্কও এবার আলোচনায় থাকবে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত এবং বিভিন্ন দেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি সরবরাহ ও বিনিয়োগের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। এ পরিস্থিতি দেখিয়েছে, নিরাপত্তা সংকট এখন আর শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক বিষয় নয়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে পণ্যের দামে, সরবরাহব্যবস্থায়, সরকারি ব্যয়ে এবং মানুষের জীবনযাত্রায়। বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রসঙ্গও উঠতে পারে। তবে বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকলে সম্মিলিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও এই বৈঠকের তাৎপর্য কম নয়। জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা, মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং ঋণ পরিশোধের খরচ, এসব চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানি খরচ বাড়ে। একই সঙ্গে খাদ্য, পরিবহন ও উৎপাদনের খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক সুদের হার বেশি থাকলে বিদেশি ঋণ নেওয়া এবং পুরোনো ঋণ শোধ করা আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তাই রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করা, বিনিয়োগ টানা এবং সামাজিক সুরক্ষা বজায় রাখার মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের নীতিগত অবস্থান, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস এবং উন্নয়নশীল দেশের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনাতেও ছাপ ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে ব্যাংককের এই সভায় মূল প্রশ্ন একটাই: একসঙ্গে আসা যুদ্ধ, জ্বালানি, মূল্যস্ফীতি ও ঋণের সংকট মোকাবিলায় কী ধরনের নীতি নেওয়া হবে। জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল রাখা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণের বোঝা সামলানো এবং উন্নয়নশীল দেশের অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোয় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে অনেক দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ।

