আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে জাপানকে ছাড়িয়ে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে ভারত। বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির পূর্বাভাসে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ভারতের শক্তিশালী অবস্থান এবং জাপানের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের চিত্র উঠে এসেছে।
আইএমএফ জানিয়েছে, চলতি বছর নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) হিসাবে জাপান বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির অবস্থান ধরে রাখবে। তবে ২০২৭ সালে ভারতের জিডিপি ৪ দশমিক ৫২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি জাপানকে পেছনে ফেলে চতুর্থ স্থানে উঠে আসবে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ভারত ও যুক্তরাজ্য উভয়ের পেছনে পড়ে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম অর্থনীতিতে নেমে যেতে পারে জাপান। দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম শক্তিধর দেশ হিসেবে পরিচিত জাপানের জন্য এটি একটি উল্লেখযোগ্য অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নানা প্রতিকূলতা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং জ্বালানি সংকটের মধ্যেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে ভারত। দেশটির অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চলতি সপ্তাহে আইএমএফ ২০২৬ সালের জন্য ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭ দশমিক ০ শতাংশে উন্নীত করেছে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের এই প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেশটির অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
অন্যদিকে জাপান দীর্ঘদিন ধরে জনসংখ্যার বার্ধক্য, শ্রমশক্তির সংকোচন এবং বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। এসব কারণে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থবির হয়ে পড়েছে।
আইএমএফের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট ভারত তুলনামূলক শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান থেকে মোকাবিলা করেছে।
তিনি জানান, চলতি বছর ভারতের অর্থনীতির মৌলিক ভিত্তিগুলো বেশ মজবুত ছিল। শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, বিচক্ষণ রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং উল্লেখযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দেশটিকে চলমান অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দিতে সহায়তা করেছে।
কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের মতে, ভারতের প্রবৃদ্ধি যথেষ্ট শক্তিশালী। একই সঙ্গে দেশটির রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা এবং পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বৈশ্বিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
এর বিপরীতে ২০২৬ সালে জাপানের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়াতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ।
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং ব্যাপক মূল্যস্ফীতির কারণে দেশটির অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যাংক অব জাপান সুদের হার গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
দীর্ঘদিন ধরে মূল্যসংকোচনের সমস্যায় ভোগা জাপানে ২০২২ সালের বসন্তকাল থেকে ভোক্তাপণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি দেশটির মূল্যস্ফীতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে জাপানি মুদ্রা ইয়েনের দরপতন। গ্রীষ্মকালে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মূল্য গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। এর ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে গিয়ে দেশটির অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
একই সঙ্গে জাপানের ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যা এবং কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত কমে যাওয়াও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফের নতুন পূর্বাভাস বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারত ও জাপানের অবস্থান পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির ওপর ভর করে ভারত বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিগুলোর মধ্যে আরও ওপরে উঠে আসার পথে রয়েছে, অন্যদিকে জনমিতিক সংকট, দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির চাপে জাপানকে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

