বিশেষ বিশ্লেষণ
দোকানের কাচের শোকেসে রাখা স্মার্টফোনটার দাম দেখে একটু থমকে দাঁড়ান ক্রেতা। পকেটে অত টাকা নেই, অথচ ফোনটা দরকার। কয়েক মিনিট পর তিনি বাক্সটা হাতে নিয়েই বের হয়ে আসেন, পুরো দাম না দিয়েই। মাঝখানে যে জিনিসটা কাজ করল, তার নাম কিস্তি বা ইএমআই। বাংলাদেশে এখন এটাই দৈনন্দিন বাস্তবতা। ফ্রিজ, সোফা, স্মার্টফোন থেকে শুরু করে রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি পর্যন্ত সবকিছুই এখন মাসে মাসে টাকা দিয়ে কেনা যায়। প্রশ্ন হলো, এই সুবিধা আসলে ক্রেতার পক্ষে যাচ্ছে, নাকি নিজের অজান্তেই তিনি বাড়তি দাম গুনছেন? উত্তরটা “হ্যাঁ” বা “না”-তে দেওয়া যায় না, কারণ এখানে জড়িয়ে আছে মূল্যস্ফীতি, সুদের হার আর সুযোগ-ব্যয়ের মতো তিনটি ভিন্ন হিসাব, যেগুলো একসঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই আসল ছবিটা স্পষ্ট হয়।
কিস্তির বাজার হঠাৎ এত বড় হলো কীভাবে
গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ক্রেডিট কার্ডের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে; দেড় লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ২৭-২৮ লাখে দাঁড়িয়েছে, যদিও ১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশে এখনো মাত্র দেড়-দুই শতাংশ মানুষের হাতে ক্রেডিট কার্ড আছে। এই সীমিত সংখ্যার কার্ডধারীদের ঘিরেই গড়ে উঠেছে এক বিশাল “নো-কস্ট ইএমআই” বাজার। ইলেকট্রনিকস ও ফার্নিচার বিক্রেতারা এখন ব্যাংকের সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে রাখছেন, যাতে ক্রেতা এক থেকে ছত্রিশ মাস পর্যন্ত কিস্তিতে দাম শোধ করতে পারেন। একটি আসবাবপত্র প্রতিষ্ঠানের বিপণন কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, ছয় মাসের শূন্য সুদের কিস্তি সুবিধা চালুর পর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন পুরো সেট আসবাব একসঙ্গে কিনতে সাহস পাচ্ছেন, যা আগে ধাপে ধাপে কিনতে হতো। আবার একাধিক ইলেকট্রনিকস বিক্রেতা বলছেন, বিশেষ করে বেতনভুক্ত মানুষদের কাছে একসঙ্গে পুরো টাকা না চেয়ে মাসিক কিস্তির প্রস্তাব দিলে বিক্রি সহজেই বেড়ে যায়। অর্থাৎ কিস্তি শুধু ক্রেতার সুবিধা নয়, এটি এখন বিক্রেতাদেরও প্রধান বিপণন কৌশল।
“শূন্য সুদ” কথাটা যতটা নিরীহ শোনায়, ব্যাপারটা ততটা সরল নয়
এখানেই প্রথম সতর্কতার জায়গা। কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান নিজের পকেট থেকে বিনা লাভে টাকা ধার দেয় না, এটা অর্থনীতির একটা মৌলিক সত্য। “শূন্য সুদ” বা “নো-কস্ট ইএমআই” আসলে দুইভাবে কাজ করে। এক, ব্যাংক ও বিক্রেতা মিলে সুদের খরচটা নিজেরা বহন করে, বিক্রি বাড়ানোর বিনিময়ে; এক্ষেত্রে ক্রেতার সত্যিই লাভ। দুই, সুদের খরচটা আসলে পণ্যের দামের ভেতরেই লুকিয়ে রাখা হয়, অর্থাৎ নগদ মূল্যেই কিছুটা বাড়তি যোগ করে তারপর সেটাকে “শূন্য সুদ”-এ ভাগ করে দেখানো হয়। আন্তর্জাতিক আর্থিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রসেসিং ফি ও অগ্রিম কিস্তির শর্ত যোগ করলে “০% অফার”-এর প্রকৃত কার্যকর সুদহার দাঁড়াতে পারে ১২ শতাংশের বেশি, যদিও কাগজে-কলমে তা শূন্য দেখানো হয়। বাংলাদেশেও ক্রেডিট কার্ডে দেরিতে বিল শোধ করলে কী হয়, তা স্পষ্ট বোঝা যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম থেকেই, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্রেডিট কার্ডের সর্বোচ্চ সুদহার ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে নির্ধারণ করেছে। অর্থাৎ কিস্তির সময়সীমা পার হয়ে গেলে বা এক কিস্তি মিস হলে, যে “শূন্য সুদের” পণ্যটি কেনা হয়েছিল, সেটাই রাতারাতি বছরে ২৫ শতাংশ সুদের ঋণে রূপ নিতে পারে। তাই কিস্তি চুক্তির শর্তগুলো না পড়ে সইয়ের আগে হাসিমুখে রাজি হয়ে যাওয়াটাই আসল ঝুঁকি, কিস্তি ব্যবস্থাটা নিজে নয়।
মূল্যস্ফীতি যখন হিসাবটা উল্টে দেয়
এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশে, যেখানে অনেকেই ভুল সিদ্ধান্ত নেন। ২০২৬ সালের জুন মাসে বাংলাদেশে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ, আর পুরো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের গড় মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে; যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি। অর্থনীতির “টাকার সময়মূল্য” নীতি বলে, আজকের এক টাকা আগামীকালের এক টাকার চেয়ে বেশি মূল্যবান, কারণ সেটা এখনই খাটিয়ে লাভ করা যায়। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে এই হিসাবটাই একজন ঋণগ্রহীতার পক্ষে চলে যায়। যদি কেউ আজ একটি ফ্রিজ কিনে ১২ মাসের নির্দিষ্ট কিস্তিতে শোধ করেন, তাহলে ষষ্ঠ বা দ্বাদশ মাসে যে টাকাটা তিনি পরিশোধ করছেন, প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে সেটা আজকের চেয়ে কম মূল্যবান, কারণ এই সময়ে বাজারদর প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি বেড়ে গেছে। সহজ কথায়, যদি কিস্তির সুদহার মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম হয়, তাহলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋণদাতার আসল ক্ষতি হচ্ছে আর ক্রেতার বাস্তব সুবিধা হচ্ছে, কেননা তিনি সস্তা হয়ে যাওয়া ভবিষ্যতের টাকায় দাম মেটাচ্ছেন। এটাই অর্থনীতিতে পরিচিত ফিশার নীতির মূল কথা – নামমাত্র সুদহার আর প্রকৃত সুদহারের মধ্যে ফারাক তৈরি করে দেয় মূল্যস্ফীতি নিজেই।
তবে এখানেই গল্পের শেষ নয়, কারণ সুযোগ-ব্যয়ের হিসাবটাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ধরা যাক, কারও হাতে নগদ টাকা আছে এবং তিনি পুরো দামটা একবারেই মিটিয়ে দিতে পারতেন। সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, নগদ টাকাটা যদি তিনি ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিটে (এফডিআর) রাখতেন, তাহলে কতটা লাভ হতো? ২০২৬ সালে বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এক বছর মেয়াদি এফডিআরে সুদহার সাধারণত সাড়ে ৯ থেকে সাড়ে ১১ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, কোনো কোনো ব্যাংকে তা ১২ শতাংশ পর্যন্তও উঠছে। অর্থাৎ, যদি কিস্তির প্রকৃত সুদহার (সব লুকানো খরচসহ) এফডিআরের এই হারের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে নগদ টাকায় পণ্য কিনে বাকি টাকাটা ব্যাংকে রেখে দেওয়াই লাভজনক। কিস্তির “সুবিধা” নেওয়া তখন আসলে লোকসান। উল্টো দিকে, যদি কিস্তির সুদহার সত্যিই শূন্য বা এফডিআরের হারের চেয়ে কম হয়, তাহলে নগদ টাকা এফডিআরে রেখে সেই সুদ আয় করার সঙ্গে সঙ্গে পণ্যটাও কিস্তিতে কিনে ফেলাই বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ দুই দিক থেকেই লাভ থাকছে।
তাহলে কখন কিস্তি ভালো, কখন খারাপ
এই পুরো হিসাব একসঙ্গে করলে একটা পরিষ্কার কাঠামো দাঁড়িয়ে যায়, যা দিয়ে যে কেউ নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই যাচাই করে নিতে পারেন। প্রথম প্রশ্ন হলো, কিস্তি পরিকল্পনার আসল কার্যকর সুদহার কত। শুধু বিজ্ঞাপনে “০%” দেখলেই চলবে না, প্রসেসিং ফি, অগ্রিম কিস্তি বা মূল্য বৃদ্ধি আছে কি না, তা চুক্তিপত্র থেকে যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, সেই কার্যকর সুদহার বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও এফডিআরের সুদহারের তুলনায় কম নাকি বেশি। কম হলে কিস্তি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক, বেশি হলে ক্ষতিকর। তৃতীয় প্রশ্ন হলো, পণ্যটি আয় বাড়াতে সাহায্য করছে নাকি নিছক ভোগের জিনিস। যেমন রান্নাঘরের যন্ত্রপাতি কিনে একজন উদ্যোক্তা যদি ব্যবসা বাড়াতে পারেন, তাহলে সেই কিস্তি তাঁর কার্যকরী মূলধন বাঁচিয়ে দিচ্ছে, যা নিছক বিলাসী কেনাকাটার চেয়ে অনেক বেশি যৌক্তিক। আর চতুর্থ এবং সবচেয়ে বাস্তব প্রশ্নটি হলো নিজের সামর্থ্য ও শৃঙ্খলা; একটি কিস্তি এক দিন দেরি হলেই বাংলাদেশে তা বছরে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ সুদের ফাঁদে পরিণত হতে পারে, তাই মাসিক আয়ের সঙ্গে কিস্তির অঙ্ক না মিললে ব্যাংক ও বিক্রেতা যতই লোভনীয় প্রস্তাব দিক, তা এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, কিস্তিতে পণ্য কেনা নিজে থেকে ভালো বা খারাপ কিছু নয়; এটি নিছক একটি আর্থিক হাতিয়ার, যার ফল নির্ভর করে ব্যবহারকারীর হিসাবি বিচক্ষণতার ওপর। উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে, যেখানে টাকার মূল্য প্রতি মাসেই কিছুটা কমছে, সেখানে প্রকৃত শূন্য বা স্বল্প সুদের কিস্তি অনেক ক্ষেত্রেই ক্রেতার পক্ষে কাজ করছে, বিশেষ করে যাঁরা নগদ টাকা অন্যত্র বিনিয়োগ করে বাড়তি আয় করতে পারেন। কিন্তু যেসব কিস্তিতে লুকানো মূল্যবৃদ্ধি আছে, বা যেগুলো সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে নেওয়া হচ্ছে, সেগুলো ধীরে ধীরে একটি দীর্ঘমেয়াদি ঋণচক্রে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রাখে। তাই পরের বার দোকানে দাঁড়িয়ে “মাত্র এত টাকা মাসে” শুনে উত্তেজিত হওয়ার আগে, একবার হলেও প্রকৃত সুদহার আর মূল্যস্ফীতির হিসাবটা মনে মনে কষে নেওয়া ভালো। সিদ্ধান্তটা তখন আবেগের নয়, অঙ্কের হবে।
রাকিবুল ইসলাম।
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)

