ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবহারের পরিমাণও বাংলাদেশে দ্রুত বাড়ছে। মানুষ এখন আগের তুলনায় বেশি ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসা, অনলাইন কেনাকাটা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার জন্য আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুবিধা ব্যবহার করছেন।
তবে এই লেনদেনের চিত্রে দেখা যাচ্ছে একটি বড় পার্থক্য। দেশের বাইরে অর্থ ব্যয়ের পরিমাণ বাড়লেও বিদেশ থেকে বাংলাদেশে আসা অর্থের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশে ইস্যু করা ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে দেশের বাইরে প্রায় ৯৮৫ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। একই সময়ে বিদেশী কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশে লেনদেন হয়েছে মাত্র ২৩৪ কোটি টাকা।
অর্থাৎ আন্তর্জাতিক কার্ডের মাধ্যমে দেশে যত অর্থ এসেছে, তার তুলনায় দেশের বাইরে চলে গেছে প্রায় ৪ দশমিক ২ গুণ বেশি অর্থ।
কেন বাড়ছে বিদেশে কার্ডের ব্যবহার?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। করোনা মহামারির পর আন্তর্জাতিক ভ্রমণ আবার স্বাভাবিক হওয়ায় বিদেশে যাতায়াত বেড়েছে। পাশাপাশি উচ্চশিক্ষা, চিকিৎসা এবং ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিদেশে অর্থ ব্যয়ের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ ছাড়া আন্তর্জাতিক অনলাইন বাজার থেকে পণ্য কেনা, সফটওয়্যার ব্যবহার, অনলাইন বিজ্ঞাপন, বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার মূল্য পরিশোধেও এখন কার্ডের ব্যবহার বাড়ছে।
আগে এসব লেনদেনের অনেক অংশ অন্য মাধ্যমে সম্পন্ন হলেও বর্তমানে আন্তর্জাতিক কার্ড সহজ ও দ্রুত হওয়ায় এর ব্যবহার জনপ্রিয় হচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা এবং পর্যটন খাত থেকে আয় এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে না পৌঁছানোয় বিদেশী নাগরিকদের কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে দেশে আসা অর্থ তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে।
জুলাইয়ে কোন কার্ডে কত খরচ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাসে দেশীয় কার্ড ব্যবহার করে মোট ১৭ লাখ ৪৪ হাজার ৩০টি আন্তর্জাতিক লেনদেন হয়েছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ক্রেডিট কার্ডে। এই কার্ডের মাধ্যমে ৮ লাখ ৩০ হাজার ৮৬টি লেনদেনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫২৬ কোটি টাকা।
ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে হয়েছে ৭ লাখ ৯০ হাজার ১২৩টি লেনদেন। এর বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪০১ কোটি টাকা।এ ছাড়া প্রিপেইড কার্ড ব্যবহার করে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮২১টি লেনদেনের মাধ্যমে দেশের বাইরে গেছে প্রায় ৫৮ কোটি টাকা।
সব মিলিয়ে জুলাই মাসে দেশীয় কার্ড ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যয় হয়েছে ৯৮৫ কোটি টাকা।অন্যদিকে বিদেশী কার্ডধারীরা বাংলাদেশে ব্যয় করেছেন ২৩৪ কোটি টাকা।
কোন কোন দেশে বেশি যাচ্ছে অর্থ?
দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক কার্ডে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে।
মোট আন্তর্জাতিক ব্যয়ের ১৫ দশমিক ৮১ শতাংশ গেছে যুক্তরাষ্ট্রে।এরপর রয়েছে যুক্তরাজ্য, যেখানে ব্যয় হয়েছে ১১ দশমিক ৩৬ শতাংশ।
এ ছাড়া থাইল্যান্ডে ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, ভারতে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ, চীনে ৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় ৫ দশমিক ৭২ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে।
অন্যান্য দেশের মধ্যে আয়ারল্যান্ডে ৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ, সৌদি আরবে ৫ শতাংশ, নেদারল্যান্ডসে ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ, কানাডায় ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ৩ দশমিক ২৯ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে।বাকি ১৬ দশমিক ৬১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে বিশ্বের অন্যান্য দেশে।
দেশে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ কোথায়?
অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক কার্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে অর্থপ্রবাহ বাড়ানোর সুযোগ এখনো সীমিত। তবে কিছু খাতে উন্নয়ন করলে এই প্রবাহ বাড়ানো সম্ভব।
বিশেষ করে পর্যটন খাতকে আরও আকর্ষণীয় করা গেলে বিদেশী পর্যটকদের ব্যয় থেকে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসতে পারে।
বাংলাদেশে বিদেশী পর্যটকদের সংখ্যা বাড়াতে অবকাঠামো উন্নয়ন, ভ্রমণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক প্রচারণার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
একই সঙ্গে ফ্রিল্যান্সার, অনলাইন সেবা প্রদানকারী এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাজ করা পেশাজীবীদের আয় সহজে দেশে আনার সুযোগ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ বর্তমানে অনেক বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক বাজারে সেবা দিলেও সেই আয় দেশে আনার প্রক্রিয়ায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
পাঁচ বছরে কার্ড ব্যবহারে বড় পরিবর্তন
বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে কার্ড ব্যবহারের বিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে ইস্যু করা কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে ৯৭ শতাংশ।
২০২১ সালের আগস্টে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৫ লাখ ৯৩ হাজার ৪৭৯টি।২০২৬ সালের জুনে এসে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ কোটি ২৪ লাখ ১৪ হাজার ৪৯৭টিতে।একই সময়ে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
২০২১ সালের আগস্টে কার্ড লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৭৭৮ কোটি টাকা। ২০২৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজার ৪৮০ কোটি টাকায়।
বাড়ছে ডিজিটাল অর্থনীতি, তবে নজর দিতে হবে ভারসাম্যে
আন্তর্জাতিক কার্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি মূলত দেশের মানুষের বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও বেশি যুক্ত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বিদেশ ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অনলাইন সেবার ক্ষেত্রে এটি মানুষের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
তবে একই সঙ্গে দেশের বাইরে অর্থপ্রবাহ এবং দেশে অর্থ আগমনের মধ্যে যে বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে, সেটিও অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে আন্তর্জাতিক লেনদেনের সুবিধা বাড়ানো, অন্যদিকে পর্যটন, সেবা রপ্তানি ও বৈদেশিক আয়ের নতুন উৎস তৈরি করা।
কারণ শুধু বিদেশে ব্যয়ের সুযোগ বাড়লেই হবে না, দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহের পথও সমানভাবে শক্তিশালী করতে হবে।

