দীর্ঘস্থায়ী বা ক্রনিক কোমর ব্যথা বিশ্বজুড়ে মানুষের শারীরিক অক্ষমতার অন্যতম প্রধান কারণ। এতদিন চিকিৎসকরা নিয়মিত সাঁতার কাটার পরামর্শ দিলেও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ছিল অনিশ্চিত। এবার প্রথমবারের মতো একটি র্যান্ডমাইজড কন্ট্রোল্ড ট্রায়াল (আরসিটি) প্রমাণ করেছে যে, নির্দিষ্ট একটি সাঁতার কর্মসূচি দীর্ঘস্থায়ী কোমর ব্যথায় ভোগা মানুষের অক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার ম্যাককুয়ারি ইউনিভার্সিটির গবেষকদের এই গবেষণাটি সম্প্রতি ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিন-এ প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটি কীভাবে পরিচালিত হয়
গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ড. ডেবোরা ওয়ারহাম। তার নেতৃত্বে ৭৬ জন প্রাপ্তবয়স্ক অংশগ্রহণকারীকে দুই দলে ভাগ করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ২৬ থেকে ৭৪ বছর এবং তাদের প্রত্যেকের কমপক্ষে ১২ সপ্তাহ ধরে কোমর ব্যথায় ভোগার ইতিহাস ছিল। প্রথম দলটি আট সপ্তাহের একটি ব্যক্তিভিত্তিক সাঁতার ও শিক্ষা কর্মসূচি পেয়েছেন, যেখানে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট চারটি টেলিহেলথ কনসালটেশনের মাধ্যমে তাদের সহায়তা করেছেন। লক্ষ্য ছিল আট সপ্তাহ শেষে সপ্তাহে তিনবার ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট করে সাঁতার কাটতে পারা। দ্বিতীয় বা নিয়ন্ত্রণ দলটি শুধু কোমর ব্যথা ব্যবস্থাপনা শিক্ষা পেয়েছেন, এর পাশাপাশি স্বাভাবিক চিকিৎসা ও কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন।
ফলাফল যা বলছে
আট সপ্তাহ পরে দেখা গেছে, সাঁতার কাটা দলের অংশগ্রহণকারীদের অক্ষমতার স্কোর গড়ে প্রায় ৫০% উন্নত হয়েছে। রোল্যান্ড মরিস ডিসঅ্যাবিলিটি কোয়েস্টনার (আরএমডিকিউ) নামের একটি বহুল ব্যবহৃত মানদণ্ডে সাঁতার কাটা দলের স্কোর নিয়ন্ত্রণ দলের চেয়ে গড়ে ২.৫ পয়েন্ট কম ছিল, যা প্রায় ৩০% পার্থক্য। ব্যথার তীব্রতাও কিছুটা কমেছে। ড. ওয়ারহাম বলেন, ‘আমরা দেখেছি, সাঁতার কাটা দলের অংশগ্রহণকারীরা তাদের ব্যাক পেন সামলানোর ব্যাপারে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী বোধ করেছেন।’ তবে একই সাথে তিনি সতর্ক করেছেন, এই ফলাফলটি শুধু আট সপ্তাহের কর্মসূচির সময়ের জন্যই প্রযোজ্য; দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ধীরে ধীরে কমে গেছে।
কেন সাঁতার কাজ করে
পানির প্লাবতা বা ‘বুয়েন্সি’ এই সাঁতার কর্মসূচির সফলতার মূল কারণ। মাটিতে ব্যায়াম করলে শরীরের ওপর উচ্চ প্রভাব পড়ে এবং জয়েন্টে চাপ তৈরি হয়। কিন্তু পানির প্লাবতা শরীরের ওজন কমিয়ে একটি ‘লো-ইমপ্যাক্ট’ পরিবেশ তৈরি করে, যা কোমর ব্যথায় ভোগা মানুষের জন্য আদর্শ। সাঁতারের সময় শরীরের নড়াচড়া সীমিত থাকে এবং মেরুদণ্ডের ওপর অক্ষীয় চাপ কম পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাঁতার শরীরের নমনীয়তা, শক্তি এবং সাধারণ অ্যারোবিক সক্ষমতা বাড়ায়। এছাড়া পানির প্লাবতা এমন কিছু নড়াচড়া করতে সাহায্য করে যা মাটিতে করলে ব্যথা হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্যে ইতিবাচক প্রভাব
দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় ভোগা মানুষ প্রায়শই মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতায় ভোগেন। গবেষণায় দেখা গেছে, সাঁতার কেবল শারীরিক ব্যথাই কমায় না, বরং মন ভালো রাখতেও সাহায্য করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন-এর তথ্য অনুসারে, নিয়মিত সাঁতার বিষণ্নতা ও উদ্বেগ কমাতে এবং সার্বিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সাহায্য করে। ফলে ব্যথার কারণে সৃষ্ট মানসিক কষ্টগুলোও লাঘব হয়। অংশগ্রহণকারীদের একজন জানিয়েছেন, নিয়মিত সাঁতারের পর চেয়ার থেকে ওঠা, হাঁটাচলা করা এবং ভালো ঘুম হওয়া অনেক সহজ হয়ে গেছে।
কতটা স্থায়ী এবং কাদের জন্য নয়
গবেষকরা অংশগ্রহণকারীদের পূর্ণ এক বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এতে দেখা গেছে, আট সপ্তাহের সাঁতার কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর সময়ের সাথে সাথে এর সুফল ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এর মানে হলো, সাঁতার দীর্ঘমেয়াদী স্থায়ী সমাধানের চেয়ে স্বল্পমেয়াদী চিকিৎসা পদ্ধতি হিসেবে বেশি কার্যকর। ড. ওয়ারহাম বলেন, ‘সাঁতারকে এখনই কোমর ব্যথার একমাত্র বা একক চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।’ তিনি আরও সতর্ক করেছেন, সাঁতার সবার জন্য নিরাপদ নাও হতে পারে। বিশেষ করে যারা সাঁতার জানেন না, যাদের ডায়রিয়া, মৃগীরোগ, হৃদরোগ বা ফুসফুসের জটিলতা রয়েছে এবং যারা ক্যান্সারের চিকিৎসাধীন, তাদের জন্য সাঁতার শুরু করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
কীভাবে শুরু করবেন
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের জন্য একজন ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে ব্যক্তিভিত্তিক উপযোগী ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের সাঁতারের সেশন নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা ধীরে ধীরে দূরত্ব ও তীব্রতায় বাড়ানো হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে নিজের সুবিধাজনক সময় ও গতিতে শুরু করে ধীরে ধীরে সাঁতারের সময় বাড়ানোই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তবে সবচেয়ে বড় কথা হলো, সাঁতার শুরু করার আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন, কারণ প্রতিটি মানুষের কোমর ব্যথার কারণ ও অবস্থা আলাদা।
**তথ্যসূত্র:** এই প্রতিবেদনটি ব্রিটিশ জার্নাল অব স্পোর্টস মেডিসিন-এ প্রকাশিত ‘Effectiveness of an individualised swimming and education programme for chronic low back pain (EduSwim): a randomised controlled trial’ গবেষণাপত্র, ম্যাককুয়ারি ইউনিভার্সিটির প্রেস রিলিজ এবং ভেরিওয়েল হেলথ-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

