সারা সপ্তাহ সকালে অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙে। অফিস, পড়াশোনা কিংবা অন্য কাজের তাড়া থাকে। তাই ছুটির দিন এলেই অনেকের পরিকল্পনা থাকে একটু বেশি ঘুমানোর। কিন্তু মজার বিষয়, যেদিন অ্যালার্ম বন্ধ রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ, সেদিনও প্রায় প্রতিদিনের একই সময়ে ঘুম ভেঙে যায়। মনে হয়, শরীর বুঝি ছুটির দিনের খবরই জানে না! আসলে এর পেছনে কাজ করে শরীরের নিজস্ব সময় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস এবং পরিবেশের কিছু প্রভাব।
মানুষের শরীরে একটি অভ্যন্তরীণ সময় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা রয়েছে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এটি প্রায় ২৪ ঘণ্টার চক্রে শরীরের ঘুম, জেগে থাকা, হরমোন নিঃসরণ ও অন্যান্য শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রমের সময় নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। দিনের আলো ও রাতের অন্ধকার এই ব্যবস্থাকে সময়ের সঙ্গে মিলিয়ে চলতে সাহায্য করে। ফলে প্রতিদিন যদি প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস তৈরি হয়, শরীরও ধীরে ধীরে সেই সময়সূচিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে।
প্রতিদিন সকালে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে উঠতে উঠতে শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি সেই সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেয়। ফলে ছুটির দিনেও পরিচিত সময়ের কাছাকাছি শরীর জেগে ওঠার প্রস্তুতি নিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর অকুপেশনাল সেফটি অ্যান্ড হেলথের (এনআইওএসএইচ) তথ্য অনুযায়ী, নিয়মিত ঘুম থেকে ওঠার সময় শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ির কার্যক্রমের জন্য সহায়ক। তাই অ্যালার্ম না থাকলেও প্রতিদিনের অভ্যাসের কারণে নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম ভেঙে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ঘুম ও জাগরণের সময় নির্ধারণে আলোর প্রভাব বেশ গুরুত্বপূর্ণ। চোখে আলো পৌঁছালে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি দিনের সময় সম্পর্কে সংকেত পায়। বিশেষ করে সকালের উজ্জ্বল আলো শরীরকে জেগে ওঠার ছন্দের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। এ কারণে জানালা দিয়ে সকালে আলো ঘরে ঢুকলে অনেকের ঘুম স্বাভাবিকভাবেই ভেঙে যেতে পারে। সিডিসির এনআইওএসএইচের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সকালের আলো শরীরের ঘড়িকে তুলনামূলক আগে জেগে ওঠার সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে সন্ধ্যার উজ্জ্বল আলো ঘুমের সময় পিছিয়ে দিতে পারে।
কর্মদিবসে এক সময়ে ঘুম থেকে ওঠা আর ছুটির দিনে অনেক দেরি করে ওঠার অভ্যাস শরীরের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন আনতে পারে। যেমন, সপ্তাহের পাঁচ দিন সকালে ছয়টায় উঠলে ছুটির দিনে হঠাৎ ১০টায় ওঠার চেষ্টা করলে ঘুম ও জাগরণের সময়সূচিতে বড় পার্থক্য তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হার্ট, লাং অ্যান্ড ব্লাড ইনস্টিটিউটের পরামর্শ হলো, সপ্তাহের কর্মদিবস ও ছুটির দিনের ঘুমের সময়ের পার্থক্য যতটা সম্ভব সীমিত রাখা। সংস্থাটি সাধারণত এই পার্থক্য এক ঘণ্টার মধ্যে রাখার পরামর্শ দেয়।
তবে সপ্তাহজুড়ে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ছুটির দিনে কিছুটা বেশি ঘুমানো উপকারী হতে পারে। ঘুমবিষয়ক গবেষকদের একটি সম্মতিমূলক পর্যালোচনাতেও বলা হয়েছে, কর্মদিবসে ঘুমের ঘাটতি হলে ছুটির দিনে কিছুটা অতিরিক্ত ঘুম কাজে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি পুরোপুরি এলোমেলো না করে রাতে একটু আগে ঘুমাতে যাওয়া বা দিনের বেলায় বিশ্রাম নেওয়া ভালো বিকল্প হতে পারে।
প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে ওঠার সময় কাছাকাছি রাখার চেষ্টা করুন। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমের প্রয়োজন। তাই সপ্তাহজুড়ে ঘুমের সময় কমিয়ে রেখে শুধু ছুটির দিনে তা পুষিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা না করাই ভালো। ঘুমানোর আগে মোবাইল বা কম্পিউটারের উজ্জ্বল পর্দা ব্যবহার কমিয়ে আনুন। শোবার ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখুন। বিকেল বা সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা-কফি পান করাও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
তবে নিয়মিত খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাওয়া, এরপর আর ঘুমাতে না পারা কিংবা পর্যাপ্ত সময় ঘুমিয়েও দিনের বেলায় ক্লান্ত লাগার পেছনে শুধু অভ্যন্তরীণ ঘড়ি দায়ী নয়। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, ব্যথা, অতিরিক্ত ক্যাফেইন, অ্যালকোহল কিংবা ঘুমের পরিবেশও এর কারণ হতে পারে। সমস্যা নিয়মিত হলে এবং দৈনন্দিন কাজে প্রভাব ফেললে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

