ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের ইতিহাসে কিছু শিল্পীর অবদান কেবল তাঁদের নিজস্ব শিল্পচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁরা একটি বাদ্যযন্ত্র, একটি সংগীতধারা কিংবা একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদাই বদলে দিয়েছেন। উস্তাদ বিসমিল্লাহ খান ছিলেন তেমনই এক কিংবদন্তি। তাঁর সানাইয়ের সুর ভারতীয় উপমহাদেশের সংগীতপ্রেমীদের কাছে যেমন পরিচিত, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৯১৬ সালের ২১ মার্চ জন্ম নেওয়া এই শিল্পী সানাইকে মূলত লোকজ ও আনুষ্ঠানিক বাদ্যযন্ত্রের গণ্ডি থেকে তুলে এনে ভারতীয় উচ্চাঙ্গ সংগীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাদ্যযন্ত্রে পরিণত করেন। দীর্ঘ সাধনা, অসাধারণ প্রতিভা এবং সংগীতের প্রতি গভীর নিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি অর্জন করেন ‘উস্তাদ’ উপাধি। ২০০১ সালে ভারতরত্নে ভূষিত হয়ে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানপ্রাপ্ত সংগীতজ্ঞদের অন্যতম হয়ে ওঠেন।
বিসমিল্লাহ খানের জন্মনাম ছিল কামরুদ্দিন খান। সংগীতের পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর পরিবারের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সংগীত ও রাজদরবারের সংগীতচর্চার গভীর সম্পর্ক ছিল। শৈশবেই তিনি সানাইয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং তাঁর মামা আলি বক্স ‘ভিলায়েতু’-এর কাছে সানাই শেখা শুরু করেন।
বারাণসীর বিভিন্ন মন্দির ও ধর্মীয় পরিবেশে সানাই বাজিয়ে তিনি সংগীতের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা একাগ্র সাধনা ছিল তাঁর সংগীতজীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। গঙ্গার তীরে বসে রেওয়াজ করার সঙ্গে তাঁর সংগীতসাধনার স্মৃতি পরবর্তীকালে কিংবদন্তির অংশ হয়ে ওঠে।
বিসমিল্লাহ খানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল সানাইকে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রধান মঞ্চে প্রতিষ্ঠা করা। তাঁর আগে সানাই মূলত বিয়ে, ধর্মীয় অনুষ্ঠান কিংবা রাজদরবারের আনুষ্ঠানিকতার সঙ্গে বেশি পরিচিত ছিল। বিসমিল্লাহ খান প্রমাণ করেন, এই বাদ্যযন্ত্রেও রাগ, আলাপ, তান ও শাস্ত্রীয় সংগীতের সূক্ষ্ম আবেগ প্রকাশ করা সম্ভব।
তাঁর বাজনায় ছিল গভীর আবেগ, মাধুর্য ও আধ্যাত্মিকতার এক অনন্য সমন্বয়। সানাইয়ের করুণ ও কোমল সুরকে তিনি এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন যে শ্রোতারা বাদ্যযন্ত্রটির মধ্যে কণ্ঠসংগীতের আবেগও অনুভব করতে পারতেন।
১৯৩৭ সালে কলকাতায় সর্বভারতীয় সংগীত সম্মেলনে তাঁর পরিবেশনা তাঁকে বৃহত্তর সংগীতজগতে পরিচিত করে তোলে। এরপর আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গেও বিসমিল্লাহ খানের সানাইয়ের একটি স্মরণীয় সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা উদ্যাপনে তিনি দিল্লির লালকেল্লায় সানাই পরিবেশন করেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম প্রভাতে তাঁর সানাইয়ের সুর একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের অংশ হয়ে যায়।
পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় দিবস ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর সানাইয়ের সুরের এক বিশেষ প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি হয়।
বিসমিল্লাহ খান তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবনে ভারতের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সম্মান লাভ করেন। তিনি পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ, পদ্মবিভূষণ এবং সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন লাভ করেন।
তিনি ছিলেন এমন বিরল কয়েকজন ভারতীয়ের একজন, যাঁরা ভারতের চারটি সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মানেরই অধিকারী হয়েছেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাঁকে ভারতীয় সংস্কৃতির অন্যতম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করে।
বিসমিল্লাহ খানের জীবন ও শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক অবস্থান। তিনি মুসলিম পরিবারে জন্মালেও হিন্দু ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। বারাণসীর মন্দিরে সানাই বাজানো থেকে শুরু করে গঙ্গার প্রতি তাঁর গভীর টান—সবকিছুই ভারতীয় উপমহাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক অসাধারণ উদাহরণ।
তাঁর কাছে সংগীত বিভাজনের নয়, মিলনের ভাষা। ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে সংগীত কীভাবে মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করতে পারে, তাঁর জীবন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বিসমিল্লাহ খান শুধু ভারতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিনি সানাই পরিবেশন করেন এবং ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতকে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দেন। তাঁর বাদন পাশ্চাত্য সংগীতপ্রেমীদের কাছেও সানাইয়ের স্বাতন্ত্র্য তুলে ধরে।
তাঁকে নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, তাঁর পরিবেশনা সংরক্ষিত হয়েছে এবং সংগীতশিক্ষা ও গবেষণায় তাঁর বাদন আজও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বিসমিল্লাহ খান সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বার্ধক্য ও নানা শারীরিক সমস্যার মধ্যেও সানাই তাঁর জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি।
২০০৬ সালের ২১ আগস্ট, ৯০ বছর বয়সে বারাণসীতে তিনি মৃ*ত্যুবরণ করেন তিনি।তার প্রয়াণের দিনে আমাদের শ্রদ্ধা।

