
- বাংলা সাহিত্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এমন এক লেখক, যাঁর কাছে সাহিত্য ছিল মানুষের জীবনের খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে মানুষকে দেখার এক গভীর চেষ্টা। সমাজের প্রান্তে থাকা মানুষ, নিঃশব্দে কষ্ট সহ্য করা নারী, প্রেমে পরাজিত যুবক, স্বপ্নভঙ্গ হওয়া মানুষ কিংবা সামাজিক বিধিনিষেধে আটকে থাকা জীবন—তাঁর গল্প-উপন্যাসে তারা কেউই নিছক চরিত্র নয়; তারা যেন আমাদের চারপাশেরই মানুষ। তাই শরৎচন্দ্রকে পড়লে শুধু একটি সময়কে জানা হয় না, মানুষের হৃদয়ের অন্ধকার-আলোও চিনে নেওয়া যায়।
১৮৭৬ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর হুগলি জেলার দেবানন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। তাঁর শৈশবের একটি বড় অংশ কেটেছে ভাগলপুরে। পারিবারিক আর্থিক অনটন তাঁর জীবনকে শুরু থেকেই কঠিন করে তুলেছিল। নিয়মিত শিক্ষাজীবনও শেষ করতে পারেননি তিনি। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা তাঁর সাহিত্যিক বিকাশকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। মানুষের জীবন, অভিজ্ঞতা ও সমাজকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করাই হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
তরুণ বয়সেই তিনি জীবিকার সন্ধানে নানা জায়গায় ঘুরেছেন। পরে কর্মসূত্রে দীর্ঘ সময় বার্মায় অবস্থান করেন। এই বিচিত্র জীবন-অভিজ্ঞতা তাঁর লেখাকে সমৃদ্ধ করে। তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবন, তাদের স্বপ্ন, সংকট, সম্পর্ক এবং সামাজিক অসহায়তা। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যকে করে তুলেছিল এতটা জীবন্ত।
শরৎচন্দ্রের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় কারণ তাঁর ভাষা। তিনি এমনভাবে লিখতেন, যেন পাঠকের সঙ্গে বসে গল্প করছেন। জটিল অলংকার বা দুর্বোধ্য শব্দের ভারে তাঁর গদ্য কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ে না। সহজ, স্বচ্ছ ও আবেগঘন ভাষায় তিনি মানুষের মনের এমন সব অনুভূতি প্রকাশ করেছেন, যেগুলো অনেক সময় মানুষ নিজের কাছেও স্পষ্ট করে বলতে পারে না।
তাঁর উপন্যাসের নারী চরিত্রগুলো বাংলা সাহিত্যে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ‘দেবদাস’-এর পার্বতী ও চন্দ্রমুখী, ‘চরিত্রহীন’-এর কিরণময়ী, ‘শ্রীকান্ত’-এর রাজলক্ষ্মী ও কমললতা, ‘গৃহদাহ’-এর অচলা কিংবা ‘পথের দাবী’-র ভারতী—তাঁরা প্রত্যেকেই নিজস্ব ব্যক্তিত্ব, আকাঙ্ক্ষা ও যন্ত্রণায় স্বতন্ত্র। শরৎচন্দ্র নারীদের শুধু পুরুষ চরিত্রের পার্শ্বচরিত্র হিসেবে দেখেননি; তাঁদের নিজস্ব ইচ্ছা, বুদ্ধি, প্রেম ও আত্মমর্যাদার জায়গা দিয়েছেন।
এই কারণেই তাঁর সাহিত্য একদিকে গভীরভাবে আবেগপ্রবণ, অন্যদিকে সমাজের প্রচলিত নৈতিকতার প্রতি প্রশ্নমুখর। বাল্যবিবাহ, বিধবার জীবন, নারীর প্রতি সামাজিক অবিচার, জাতপাত, কুসংস্কার এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নানা অসঙ্গতি তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে। তিনি বক্তৃতা দিয়ে সমাজসংস্কার করেননি; মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের দুঃখ ও অপমানকে গল্পের ভেতর এমনভাবে তুলে ধরেছেন যে পাঠক নিজেই প্রশ্ন করতে বাধ্য হয়েছে।
‘দেবদাস’ তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাসগুলোর একটি। দেবদাসের প্রেমের ব্যর্থতা শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এর ভেতরে রয়েছে সামাজিক শ্রেণিবিভাজন, পারিবারিক অহংকার এবং সিদ্ধান্তহীন এক মানুষের আত্মবিনাশের কাহিনি। একইভাবে ‘শ্রীকান্ত’ শুধু একজন ব্যক্তির ভ্রমণকাহিনি নয়; এটি জীবন, প্রেম, সমাজ ও মানুষের বৈচিত্র্যকে দেখার এক দীর্ঘ অভিযাত্রা।
‘পথের দাবী’ শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের আরেক ভিন্ন দিক উন্মোচন করে। ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী রাজনীতি ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে লেখা এই উপন্যাস তৎকালীন সময়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং ব্রিটিশ সরকার বইটি নিষিদ্ধ করেছিল। ফলে শরৎচন্দ্র কেবল প্রেম ও পারিবারিক জীবনের কথাশিল্পী নন, রাজনৈতিক চেতনারও একজন শক্তিশালী সাহিত্যিক হয়ে ওঠেন।
তাঁর সাহিত্য জনপ্রিয় হলেও তিনি কেবল জনপ্রিয় লেখক হিসেবে সীমাবদ্ধ নন। তাঁর শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের জীবনকে অসাধারণ মানবিকতায় তুলে ধরা। তিনি মানুষের দুর্বলতাকে যেমন দেখেছেন, তেমনি দেখেছেন তার ভালোবাসার ক্ষমতা, আত্মত্যাগ, প্রতিবাদ এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। তাঁর চরিত্ররা নিখুঁত নয়, তারা ভুল করে, ভেঙে পড়ে, কখনো অন্যায় করে, কখনো নিজের বিরুদ্ধেই দাঁড়ায়। আর এই অসম্পূর্ণতার কারণেই তারা এতটা বাস্তব।
১৯৩৮ সালের ১৬ জানুয়ারি কলকাতায় মৃ*ত্যুবরণ করেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
আজ বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্রের জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধা।
