সম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পশ্চিমা গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাংশ থেকে একটি পরিচিত সুর শোনা যাচ্ছে: দাবি করা হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের সংগ্রামে সাহায্য করার জন্য চীন হয় ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করছে অথবা সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
আখ্যানটি যতটা নাটকীয়, বাস্তবতা থেকে ততটাই বিচ্ছিন্ন। এটি একটি সুবিধাজনক ছাঁচে ফেলা যায়: বেইজিং হলো ছায়াময় সহায়তাকারী, তেহরান হলো ইচ্ছুক প্রতিনিধি এবং মধ্যপ্রাচ্য হলো বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার দাবা খেলার ছক।
কিন্তু এই ধরনের অনেক ছাঁচের মতোই এটিও নিজের ভারেই ভেঙে পড়ে। চীন ইরানকে অস্ত্র দিচ্ছে—এই অভিযোগটি কেবল অপ্রমাণিতই নয়; এটি বেইজিংয়ের ঘোষিত নীতি, বৈশ্বিক সংঘাতগুলোতে তার ধারাবাহিক আচরণ এবং কৌশলগত স্বার্থের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
এর কারণ বুঝতে হলে, ঠান্ডা যুদ্ধের দৃষ্টিভঙ্গি সরিয়ে রেখে বেইজিং আসলে কীভাবে কাজ করে তা খতিয়ে দেখতে হবে।
প্রথমত, চীনের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি—অহস্তক্ষেপ ও জোটনিরপেক্ষতা—বিবেচনা করুন। কয়েক দশক ধরে চীন সামরিক জোটে প্রবেশ করতে বা অন্য দেশের যুদ্ধে কোনো পক্ষ নিতে অস্বীকার করে আসছে।
এটা কোনো কথার কথা নয়। এটি একটি মূল নীতি যা কোরীয় উপদ্বীপ থেকে বলকান পর্যন্ত চীনা কূটনীতিকে পরিচালিত করেছে। ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষশক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘাতে কোনো এক পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহ করা হবে হস্তক্ষেপের এক চরম নিদর্শন—ঠিক সেই ধরনের জড়িয়ে পড়া দায়বদ্ধতা যা চীন চার দশক ধরে এড়িয়ে চলেছে। এই ধারণাটিই চীনের ১৯৮০-পরবর্তী পররাষ্ট্রনীতির ডিএনএ-র পরিপন্থী।
দ্বিতীয়ত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ মোকাবেলায় চীনের ভূমিকা দেখুন। পশ্চিমা দেশগুলো যেখানে অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য ও নিষেধাজ্ঞা সরবরাহ করেছে, সেখানে চীন ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধবিরতি ও শান্তিপূর্ণ আলোচনার আহ্বান জানিয়ে এসেছে। তীব্র চাপ এবং এমন জল্পনা-কল্পনা সত্ত্বেও বেইজিং মস্কোকে কোনো প্রাণঘাতী সহায়তা পাঠায়নি।
সংলাপের মডেল
বিষয়টি স্পষ্ট: চীন বিশ্বাস করে যে সংঘাত ও যুদ্ধের অবসান আলোচনার টেবিলে হওয়া উচিত, পরিস্থিতি আরও খারাপ করে নয়। ইরানই বা ভিন্ন হবে কেন?
২০২৩ সালে বেইজিং ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলাতে মধ্যস্থতা করেছিল, যেখানে ধ্বংসের পরিবর্তে সংলাপের মডেলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। তেহরানকে অস্ত্রসজ্জিত করা হলে সেই মডেলটি ভস্মীভূত হয়ে যাবে।
তৃতীয়ত, সার্বভৌম অধিকারের বিষয়টি রয়েছে। চীন ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষশক্তির মধ্যকার সংঘাতের কোনো পক্ষ নয়। একটি নিরপেক্ষ পক্ষ হিসেবে, চীন যেকোনো দেশের সাথে স্বাভাবিক ও আইনসম্মত ব্যবসা পরিচালনা করার অধিকার রাখে—যার মধ্যে তেল, বেসামরিক পণ্য এবং প্রযুক্তির বাণিজ্য অন্তর্ভুক্ত।
সাধারণ বাণিজ্যিক লেনদেনকে সামরিক সমর্থনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা একটি যৌক্তিক ভ্রান্তি; অনেকটা এই অভিযোগে অভিযুক্ত করার মতো যে, জার্মানি একটি বিবাদের উভয় পক্ষের কাছেই গাড়ি বিক্রি করে বলে যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। ইরানকে অস্ত্রসজ্জিত না করে তার সঙ্গে বাণিজ্য করার চীনের ক্ষমতাই হলো নিরপেক্ষতার প্রকৃত রূপ।
পশ্চিমা মহলে প্রায়শই যে পাল্টা যুক্তিটি তোলা হয়, তা তেল-ভিত্তিক। যুক্তিটি হলো, “চীন ইরানের অপরিশোধিত তেলের ওপর নির্ভরশীল, তাই বেইজিংকে তার সরবরাহ পথ রক্ষা করার জন্য শেষ পর্যন্ত তেহরানকে অস্ত্রসজ্জিত করতে হবে।”
এই তত্ত্বটি কল্পনাশক্তির চরম অভাব এবং চীনের জ্বালানি স্থিতিস্থাপকতা বুঝতে ব্যর্থতারই পরিচায়ক। গত এক দশকে বেইজিং তার জ্বালানি উৎসকে বৈচিত্র্যময় করতে সক্রিয়ভাবে কাজ করে আসছে।
এটি কৌশলগত তেলের মজুদ গড়ে তুলেছে; রাশিয়া, সৌদি আরব এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি স্বাক্ষর করেছে; এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেছে। চীন ইরানের তেলের কাছে জিম্মি নয়; এটি একাধিক বিকল্পসহ একটি বিচক্ষণ জ্বালানি ক্রেতা। একক উৎসের ওপর নির্ভরশীলতার দিন অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে।
এরপর আরও একটি উদ্ভট তত্ত্ব রয়েছে: যে, রেনমিনবিতে—তথাকথিত “পেট্রোইউয়ান”-এ—তেলের মূল্য পরিশোধের ইরানের আকাঙ্ক্ষাটি চীনকে তার সামরিক সংগ্রামে টেনে আনার একটি কৌশল। এটি ইরানের উদ্দেশ্য এবং চীনের মেজাজ—উভয়কেই ভুলভাবে বোঝা।
পেট্রোইউয়ান মূলত মার্কিন ডলারের আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি সুরক্ষা ব্যবস্থা—এটি একটি আর্থিক সুরক্ষা, কোনো সামরিক সাহায্যের আবেদন নয়। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন যুদ্ধজাহাজ বা ক্ষেপণাস্ত্র পাঠিয়ে এর জবাব দেয়নি। এর জবাবে তারা রেনমিনবিতে তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। এটি এমন কোনো দেশের আচরণ নয়, যাকে কোথাও “টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে”। এটি একটি পরিণত, সতর্ক পরাশক্তির আচরণ, যে অন্যের যুদ্ধে উস্কানি পেয়ে জড়াতে অস্বীকার করে।
কক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি
এতে আমরা একটি বৃহত্তর প্রসঙ্গে আসি: যদি অনেক বিশ্ব পর্যবেক্ষকের চোখে চীনকে ক্রমশই “পরিস্থিতির বিচক্ষণ ব্যক্তি” হিসেবে দেখা হয়—অর্থাৎ, যখন অন্যরা আগুন জ্বালানোর জন্য হাত বাড়াচ্ছে, তখন চীনই সংযমের আহ্বান জানাচ্ছে—তাহলে তার সেভাবেই আচরণ করা উচিত।
প্রকৃত প্রাপ্তবয়স্করা সামান্য উস্কানিতেও মাথা গরম করেন না। তাঁরা স্বল্পমেয়াদী ক্ষোভের জন্য দীর্ঘমেয়াদী কৌশল বিসর্জন দেন না। তাঁরা সিএনএন-এর কোনো শিরোনাম বা কোনো বেনামী গোয়েন্দা সংস্থার “মূল্যায়ন” দ্বারা নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারিত হতে দেন না।
চীনকে একটি হঠকারী ও সহজে উত্তেজিত শক্তি হিসেবে চিত্রিত করাটা একটি কল্পনা মাত্র। এটি অভিযোগকারীর নিজস্ব প্রতিক্রিয়ার প্রতিফলন, বেইজিংয়ের বর্ণনা নয়।
আর সেই অভিযোগগুলোর কথা বলতে গেলে—সেগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া উচিত? যখন সিএনএন-এর কোনো প্রতিবেদনে ঘোষণা করা হয় যে “মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা” ইঙ্গিত দিচ্ছে চীন ইরানকে অস্ত্র দিচ্ছে, তখন আমাদের সেটাকে বেদবাক্য হিসেবে মেনে নিতে বলা হয়। কিন্তু এই সেই একই গোয়েন্দা সংস্থা, যারা ইরাকে আমাদের “গণবিধ্বংসী অস্ত্র”-এর কাল্পনিক কাহিনী শুনিয়েছিল—যাদের ভুল তথ্য ছড়ানোর একটি নথিভুক্ত ইতিহাস রয়েছে।
কৃত্রিম সম্মতি এবং তথ্য ফাঁসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া বয়ানের এই যুগে, একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তার দাবি কোনো প্রমাণ নয়। এটি সংশয়ের একটি সূচনা মাত্র।
অবশেষে, রয়েছে চীনের নিজস্ব আনুষ্ঠানিক বিবৃতি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বারবার এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে, চীন সক্রিয় সংঘাতে জড়িত কোনো পক্ষকে প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহ করে না। একটি যুক্তিসঙ্গত বিশ্বে, একটি দেশের প্রকাশ্য ঘোষণা—বিশেষ করে যখন তা তার কার্যকলাপের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়—ন্যূনতম সম্মান পাওয়ার যোগ্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসকে সমর্থন করে সেগুলোকে এক কথায় খারিজ করে দেওয়া সাংবাদিকতা নয়; এটি এক ধরনের পক্ষাবলম্বন।
ষড়যন্ত্রের চেয়ে সত্যটা অনেক সহজ: ইরানকে অস্ত্র দেওয়ার কোনো ইচ্ছা চীনের নেই। এতে তাদের লাভ সামান্যই হবে, ঝুঁকি অনেক বেশি এবং তারা নিজেদের নীতিও লঙ্ঘন করবে। এই অভিযোগগুলো বেইজিংয়ের চেয়ে অভিযোগকারীদের সম্পর্কেই অনেক বেশি কিছু বলে—তাদের অনুমান, তাদের উদ্বেগ এবং প্রতিটি করমর্দনে বন্দুক দেখার অভ্যাস।
রাগের মাথায় চীন কী করতে পারে, তা আসল ঘটনা নয়। বরং আসল ঘটনা হলো, চীন আসলে কী করছে: বাণিজ্য করছে, আলোচনা চালাচ্ছে এবং এমন একটি যুদ্ধে জড়াতে অস্বীকার করছে যা তার নিজের নয়।
এটা কোনো বেপরোয়া ব্যক্তির আচরণ নয়। এটা একজন প্রাপ্তবয়স্কের আচরণ। এবং উপস্থিত প্রাপ্তবয়স্কদের, যখনই কেউ মিথ্যা অভিযোগ করে চিৎকার করে, তখনই অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে নিজেদের গাম্ভীর্য প্রমাণ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
- নেলসন ওং: চীনের সাংহাই-ভিত্তিক একটি অলাভজনক ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সাংহাই সেন্টার ফর রিমপ্যাক স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সভাপতি এবং মস্কো-ভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ভালদাই ডিসকাশন ক্লাবের একজন সক্রিয় সদস্য। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

