স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা দাঁড়াল না কেন্দ্রীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও নীতিনির্ধারকদের দখলদারি মানসিকতার কারণে। স্বাধীনতার পর আমরা নানা কিসিমের সরকার পেয়েছি—নির্বাচিত, অনির্বাচিত, সামরিক, আধা সামরিক। সবাই স্থানীয় শাসনকে নিজের কবজায় রাখতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছিল ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচন করে। এরপর অবস্থা এমন দাঁড়াল যে স্থানীয় সরকার সংস্থা ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে কোনো ফারাক থাকল না।
আশির দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যে উপজেলা পরিষদ গঠন করেছিলেন, সেটি ঠিকমতো কাজ করলে শাসনতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ হতে পারত। কিন্তু সেটা হয়নি। কেবল উপজেলা নয়; জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলো আইয়ুব খানের বেসিক ডেমোক্রেসির আদলেই রয়ে গেছে।
এই মুহূর্তে দেশে কার্যকর কোনো স্থানীয় সরকার সংস্থা নেই চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মতো দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। অন্তর্বর্তী সরকার এসে অন্য আরও অনেক কমিশনের মতো স্থানীয় সরকার সংস্কার নিয়েও একটি কমিশন গঠন করে; কিন্তু তারা ক্ষমতায় থাকতে সেই কমিশনের কোনো সুপারিশ বাস্তবায়ন করার প্রয়োজন মনে করেনি। সিটি করপোরেশনগুলোতে আমলাদের বসানো হয়েছিল দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন করতে।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি সরকার এসে আমলা প্রশাসকদের স্থলে দলীয় প্রশাসক বসাল। অজুহাত দেখানো হলো যে আমলাদের দিয়ে কাজ চলছিল না। তারা এমন ব্যক্তিদের দলীয় প্রশাসক পদে বসাল, যাঁরা বিগত নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পাননি এবং ভবিষ্যতে যাঁরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে মেয়র হিসেবে মনোনয়ন পেতে পারেন। একইভাবে ৬৪টি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদেও অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটাকে অনেকেই সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন হতে পারে আগামী শীত মৌসুমে। বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষার পর। সে ক্ষেত্রে দলীয় প্রশাসকেরা আট–নয় মাস সময় পাচ্ছেন এলাকায় নিজেদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক ভিত শক্তিশালী করতে।
অতীতে আমরা দেখেছি, ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যরাই সরকারের সুযোগ–সুবিধা বাড়ানোর আবদার করেন। কিন্তু নতুন বন্দোবস্তে আমরা দেখলাম, বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদেরই সেদিকে নজর বেশি। ৩০ মার্চ জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য আতিকুর রহমান মুজাহিদ নির্বাচনী এলাকায় বসার জায়গা চাইলেন। এরপর স্থানীয় সরকার বিভাগ ২১ এপ্রিল মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিভাগীয় কমিশনার ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য উপজেলা পরিষদে আলাদা সুসজ্জিত কক্ষ নির্মাণের নির্দেশনা দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয়।
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সংসদে এই তথ্য জানিয়ে বলেন, সংসদ সদস্যদের কক্ষ বরাদ্দের বিধান না থাকায় এর নাম হবে পরিদর্শন কক্ষ। পরিদর্শন কক্ষ হোক বা সংসদ সদস্যদের জন্য ‘আয়েশি কক্ষ’ হোক, এর খরচ জোগাতে হবে জনগণের করের অর্থে। তা–ও এমন এক সময়, যখন ইরান–যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে দেশে ভয়াবহ জ্বালানিসংকট চলছে। অর্থনীতির অবস্থাও ভালো নয়।
এনসিপির আরেক সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এই সিদ্ধান্তের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেছেন, ‘এলাকায় আমাদের বসার জায়গা করে দিয়েছেন, এ জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাই।’
একই সঙ্গে তিনি লজ্জা থেকে বাঁচার জন্য সংসদ সদস্যদের গাড়ির ব্যবস্থা করারও দাবি জানিয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিরোধী দলের অন্যান্য দাবির বিষয়ে অনড় থাকলেও এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমীভাবে নমনীয়তা দেখিয়েছেন। কিছু করার আশ্বাস দিয়েছেন। গাড়ি চাওয়া নিয়ে সমালোচনা হলে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, তাঁরা শুল্কমুক্ত গাড়ি চান না; চান সচিব, ডিসি ও ইউএনওদের মতো গাড়ি। অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তারা যে গাড়ির সুবিধা পান, সংসদ সদস্যদের জন্যও সেই সুবিধা দাবি করেন এই তরুণ সংসদ সদস্য।
এখন দেখা যাক একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্র থেকে কী কী সুবিধা পান। তিনি এলাকায় আসা–যাওয়ার জন্য মাসে ৭০ হাজার টাকা যাতায়াত ভাতা পেয়ে থাকেন। এখন রাষ্ট্র যদি সংসদ সদস্যদের গাড়ির ব্যবস্থা করে, তাহলে তাঁদের এই পরিবহন ভাতার কী হবে? সেটিও কি নেবেন তাঁরা। সে বিষয়টি স্পষ্ট হলো না।
আমাদের সংসদ সদস্যদের মূল কাজ যে দেশ ও জনগণের কল্যাণে আইন প্রণয়ন ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি আদায় করা, সে কথাটি তাঁরা ভুলে যান। তাঁরা অবশ্যই এলাকার ভোটারদের সমস্যা দেখবেন এবং তা সংসদেও তুলে ধরবেন, যাতে নির্বাহী বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু তাঁরা কোনোভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হবেন না, নামে–বেনামে ঠিকাদারির কাজ করবেন না।
উন্নয়নকাজ তদারক করা আর উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত থাকা এক কথা নয়। সংসদ সদস্যরা যখন উপজেলা পরিষদের পরিদর্শন কক্ষে অবস্থান করবেন, তখন সেখানকার কর্মকর্তারা কি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন? তাঁরা কি তাঁর নির্দেশনা অমান্য করতে পারবেন? সংসদ সদস্যের কাজ চালানোর জন্য এলাকায় নিজস্ব অফিস থাকতে পারে। কিন্তু উপজেলা পরিষদে বসার জায়গা পেয়ে যে তাঁরা প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপ করবেন না, তার নিশ্চয়তা কী?
স্থানীয় সরকার নিয়ে যাঁরা দীর্ঘদিন কাজ করেন, তাঁরা এই সিদ্ধান্তকে সংবিধানের পরিপন্থী বলে মনে করেন। সুজন সম্পাদক ও সাবেক নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, এই ধরনের সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে ধ্বংস করবে।
উপজেলা পরিষদে যদি সংসদ সদস্যদের বসার জায়গা দেওয়া হয়, তাহলে তাঁদের স্বতন্ত্র অবস্থান কোথায় থাকে? সংসদ সদস্যরা তো প্রশাসনের অংশ নন। স্থানীয় সরকার সংস্থার নির্বাচিত সদস্যরা নিজেদের প্রশাসনের অংশ ভাবতে পারেন। কেননা, তাঁরা সংশ্লিষ্ট সংস্থার জন্যই নির্বাচিত। সেখানে তাঁকে জবাবদিহি করতে হয়।
উপজেলা পরিষদে যদি সংসদ সদস্যদের আলাদা বসার জায়গাই তৈরি করা হয়, তাহলে স্থানীয় সরকার সংস্থার কী দরকার? আগে সংসদ সদস্যরা ঢাকা থেকে ডিসি, ইউএনও, এসপি, ওসিদের নির্দেশনা দিতেন। এখন বসার জায়গায় তাঁদের ডেকে নিয়ে নির্দেশনা দিতে পারবেন। এতে আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে আর কোনো ফারাক থাকবে না।
সংসদ সদস্যদের বসার জায়গার বিষয়ে আরেকটি প্রশ্ন আছে। বর্তমানে সংসদে ৩০০ আসনের জন্য ৩০০ সংসদ সদস্য আছেন। সংরক্ষিত নারী আসনে আরও ৫০ জন সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া চলছে। প্রতিটি আসনের একজন সদস্য বসার একটি জায়গা পেলে সংরক্ষিত আসনের সদস্যরা কোথায় বসবেন? এখানে কি তাঁদের প্রতি বৈষম্য করা হবে?
অনেক দেশে এমন এমপিও দেখা গেছে, যাঁরা সাধারণ পরিবহনে চলাফেরা করেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা জনগণের কাছাকাছি থাকেন। নির্বাচনের সময় সাধারণ পরিবহনে বা পায়ে হেঁটে ভোট খুঁজতে মানুষের দ্বারে দ্বারে যেতে পারলে নির্বাচিত হওয়ার পরে কেন নয়? আর এখন তো বড় অঙ্কের পরিবহন ভাতাও মিলছে, সেটিকেই তাঁরা কাজে লাগাতে পারেন। আর নিজ এলাকায় উন্নয়নের জন্য এমপিদের বরং উচিত স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করতে সংসদে কার্যকর ভূমিকা রাখা।
মতামত:সোহরাব হাসান, কবি ও লেখক-

