বাংলাদেশের যেকোনো সাধারণ শ্রেণিকক্ষে ঢুকে যদি শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করা হয়, বড় হয়ে তারা কী হতে চায়—তাহলে উত্তরগুলো অনেকটাই পরিচিত শোনাবে। কেউ ডাক্তার হতে চায়, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ আবার বিসিএস ক্যাডার। আবার অনেকের সহজ উত্তর—বিদেশে চলে যাওয়া। এই শেষ উত্তরটি অনেক সময় স্বপ্ন নয়, বরং বাস্তবতা থেকে তৈরি হওয়া এক ধরনের বেঁচে থাকার কৌশল। এখান থেকেই উঠে আসে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি—আমরা কীভাবে এমন একটি দেশ গড়ে তুলব, যেখানে মেধাবীরা নিজ দেশে থেকে দেশের উন্নয়নে কাজ করতে আগ্রহী হবে?
প্রতি বছর ২১ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন দিবস (World Creativity and Innovation Day)। এই দিবসটি মানব উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য নির্ধারিত। অনেক দেশে এই দিনকে কেন্দ্র করে নীতিনির্ধারণী আলোচনা, উদ্ভাবনী সম্মেলন কিংবা বাজেট পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয় কিন্তু বাংলাদেশে এই দিবসটি খুব একটা আলোচনায় আসে না বললেই চলে। অথচ এখনই সময় বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়ার।
কারণ বাংলাদেশ বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পথে। এই উত্তরণ আমাদের বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ৭০ শতাংশের শুল্ক সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। যদি সঠিক পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে এই পরিবর্তন উন্নয়নের সিঁড়ি না হয়ে বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে। সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও, বাস্তবতা হলো—প্রস্তুতি ছাড়া এগোলে ঝুঁকি থেকেই যায়।
বিশ্বজুড়ে এই দিবসের সূচনা হয়েছিল ২০০২ সালে কানাডার সৃজনশীলতা আন্দোলনকর্মী মার্সি সিগাল-এর উদ্যোগে। পরে ২০১৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে এটি বৈশ্বিক স্বীকৃতি পায়। ২১ এপ্রিল তারিখটি ইচ্ছাকৃতভাবে ২২ এপ্রিলের ‘আর্থ ডে’-এর ঠিক আগেই রাখা হয়েছে। এর বার্তা পরিষ্কার—একটি টেকসই পৃথিবী গড়তে হলে আগে প্রয়োজন সৃজনশীল চিন্তা। জাতিসংঘের এক হিসাব অনুযায়ী, বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শিল্প খাত বছরে প্রায় ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার আয় করে, যা বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৩.১ শতাংশ।
ভারতের প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি শশী থারুর বলেছেন, দেশটি বৈশ্বিক উদ্ভাবনের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। এটি কোনো কল্পনা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী নীতির ফল। ভারতে বর্তমানে ১,৮০০-এর বেশি গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার রয়েছে। এগুলো এমন অফশোর ইউনিট, যেখানে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো সফটওয়্যার, ডেটা অ্যানালিটিকস, পণ্য উন্নয়ন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার মতো কাজ পরিচালনা করে। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, দক্ষ মানবসম্পদ এবং স্থিতিশীল নীতিমালা।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি অবশ্য একেবারেই আলাদা নয়। আমাদের দেশেও রয়েছে দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তি খাতের বড় সম্ভাবনা। প্রায় ১০ লাখ ফ্রিল্যান্সারের মধ্যে প্রায় ৬.৫ লাখই তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করছেন, যারা বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আয় নিয়ে আসছেন। দেশের বাইরে থাকা অনেক বাংলাদেশিও দেশের প্রতি গভীরভাবে সংযুক্ত। সঠিক নীতিমালা থাকলে তাদের জ্ঞান, নেটওয়ার্ক এবং পুঁজি দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারে। ডায়াসপোরা সম্পৃক্ততার মাধ্যমে ইকুইটি, সহ-প্রতিষ্ঠার সুযোগ, কর সুবিধা কিংবা দূর থেকে কাজের সুযোগ তৈরি করা গেলে ‘ব্রেইন ড্রেইন’ রূপ নিতে পারে ‘ব্রেইন গেইন’-এ।
গ্লোবাল ইনোভেশন ইনডেক্স ২০২৫ অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৩৯ দেশের মধ্যে ১০৬তম অবস্থানে রয়েছে। স্কোর ২১, যা আগের বছরের ১৯.১ থেকে কিছুটা উন্নত হলেও বাস্তব চিত্রে বড় পরিবর্তন আসেনি। আমরা ইনপুটের তুলনায় আউটপুটে ভালো করছি—এই এক ধরনের বৈপরীত্যই আমাদের বাস্তবতা। উদাহরণ হিসেবে বিকাশ, পাঠাও, আইফার্মার কিংবা ১০ মিনিট স্কুল দেখায় যে সীমিত অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশি উদ্ভাবন কতটা শক্তিশালী হতে পারে। বিকাশ কোনো বিশ্বমানের গবেষণাগার ছাড়াই কোটি কোটি ব্যবহারকারী অর্জন করেছে।
তবে কেবল ব্যক্তিগত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় ছিল জিডিপির মাত্র ০.০৩ শতাংশ। একই সময়ে ভিয়েতনাম ০.৫৪ শতাংশ, ভারত ০.৭০ শতাংশ এবং চীন ২.৫৫ শতাংশ ব্যয় করেছে। আমাদের বাজেটেও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ অত্যন্ত সীমিত, যা দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন।
প্রথমত, গবেষণা ও উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সরকারি বাজেট এবং কর কাঠামোকে গবেষণা সহায়ক করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও a2i-এর ফিনটেক স্যান্ডবক্সের মতো উদ্যোগকে কৃষি প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য প্রযুক্তি এবং জ্বালানি প্রযুক্তিতেও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। বহু উচ্চশিক্ষিত তরুণ চাকরি না পাওয়ায় প্রমাণ হয়, শিক্ষা ও বাজার চাহিদার মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। তাই পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা সায়েন্স, সিস্টেম থিংকিং এবং বাস্তবভিত্তিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়কে কেবল ডিগ্রি উৎপাদনের প্রতিষ্ঠান নয়, শিল্পখাতের সঙ্গে বাস্তব সংযোগ তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, উদ্ভাবনকে রাজধানীকেন্দ্রিক সীমাবদ্ধতা থেকে বের করে আনতে হবে। বর্তমানে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহী ও খুলনার মতো শহরে অবকাঠামো ও প্রণোদনা নিশ্চিত করলে নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি হবে।
চতুর্থত, গ্লোবাল ক্যাপাবিলিটি সেন্টার আকর্ষণের সুযোগ নিতে হবে। ভারতের মতো দীর্ঘ পরিকল্পনা না থাকলেও বাংলাদেশে তরুণ জনশক্তি ও কম খরচের সুবিধা রয়েছে, যা কাজে লাগানো সম্ভব।
পঞ্চমত, দেশে থাকা ও কাজ করাকে আরও আকর্ষণীয় করতে হবে। স্টার্টআপে ইকুইটি সংস্কৃতি, স্টক অপশন, প্রতিযোগিতামূলক বেতন এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে মেধা বাইরে চলে যাবে।
এলডিসি উত্তরণের পথে বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। পুরোনো বাণিজ্য সুবিধা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে, প্রযুক্তি দ্রুত কাজের ধরন বদলে দিচ্ছে, আর সবচেয়ে মেধাবী তরুণরা ভাবছে—তাদের ভবিষ্যৎ কোথায় বেশি নিরাপদ। এই বাস্তবতায় উদ্ভাবন আর বিলাসিতা নয়, বরং টিকে থাকার শর্ত।
বিশ্বের সফল উদ্ভাবনী অর্থনীতিগুলো কেবল প্রতিভার কারণে এগোয়নি, বরং তারা এমন ব্যবস্থা তৈরি করেছে যেখানে সৃজনশীলতা বিকশিত হয়, ব্যর্থতা শেখার অংশ হয়ে ওঠে এবং ধারণা বিনিয়োগে পরিণত হয়। বাংলাদেশে প্রতিভা আছে, কিন্তু সেই প্রতিভাকে ধারণ করার মতো শক্তিশালী কাঠামো এখনো গড়ে ওঠেনি।
তাই প্রশ্নটা এখন আর শুধু বিশ্ব সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন দিবস পালন করা নয়—প্রশ্ন হলো, আমরা কি সত্যিই সেই ভবিষ্যৎ তৈরি করতে প্রস্তুত, নাকি সময় শেষ হওয়ার আগেই পিছিয়ে পড়ব?

