বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের ফলে শ্রমবাজারেও তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। ডিজিটাল প্রযুক্তি, মোবাইল ইন্টারনেট ও প্লাটফর্মভিত্তিক সেবার বিস্তারের ফলে গড়ে উঠেছে ‘গিগ ইকোনমি।’ এসব প্লাটফর্মে কর্মীরা স্থায়ী চাকরির বদলে নির্দিষ্ট কাজ বা প্রকল্পের ভিত্তিতে আয় করেন। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বৈশ্বিক শ্রমশক্তির প্রায় ২০-৩০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে গিগ কিংবা ফ্রিল্যান্স কাজের সঙ্গে যুক্ত।
দেশে গিগ ইকোনমির বিস্তার প্রধানত তিনটি ক্ষেত্রে দৃশ্যমান। সেগুলো হলো রাইড-শেয়ারিং ও ডেলিভারি সেবা, ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সিং এবং বিভিন্ন অনলাইনভিত্তিক সেবা প্রদান। শহরাঞ্চলে রাইড-শেয়ারিং সেবার সম্প্রসারণ বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। উবার, পাঠাও, ইনড্রাইভ ও সহজের মতো প্লাটফর্ম হাজারো চালককে গিগভিত্তিক আয়ের সুযোগ দিয়েছে। অন্যদিকে ফুডপান্ডা, পাঠাও ফুড ও হাংগ্রিনাকির মতো ফুড ডেলিভারি পরিষেবা প্লাটফর্মে যুক্ত হয়ে অনেক তরুণ জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সিং ক্ষেত্রেও বাংলাদেশীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আপওয়ার্ক, ফাইভার ও ফ্রিল্যান্সার ডটকমের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অনলাইন মার্কেটপ্লেসে কাজ করে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী তরুণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিকস ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট রাইটিং ও সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টসহ বিভিন্ন দক্ষতাভিত্তিক কাজের মাধ্যমে তারা বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে নিচ্ছেন।
ফলে গিগ ইকোনমি ধীরে ধীরে দেশের শ্রমবাজারে বিকল্প কাঠামো তৈরি করছে এবং ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরো গতিশীল করে তুলছে। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, অনলাইন শ্রম সরবরাহে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে এবং দেশে বর্তমানে প্রায় ছয়-আট লাখ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার কাজ করছেন। তারা বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আনছেন। এটি জিডিপিতে ১ দশমিক ৫০ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখতে সক্ষম।
তবে এ সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। অধিকাংশ গিগ কর্মীর আয় অনিয়মিত এবং অনেকেরই আনুষ্ঠানিক আয়ের নথি নেই। ফলে তারা সহজে ব্যাংক ঋণ বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিতে পারেন না। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা, পেনশন বা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার অভাবও এ খাতের একটি বড় সীমাবদ্ধতা। ফলে গিগ ইকোনমির বড় একটি অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের জন্য গিগ ইকোনমি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাংকগুলো এরই মধ্যে গিগ কর্মী ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বিশেষায়িত আর্থিক পণ্য ও সেবা চালু করেছে। এক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের অভিজ্ঞতা একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই) গিগ কর্মীদের ঋণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রথাগত নথির পরিবর্তে ‘বিকল্প ডেটা’ অর্থাৎ ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে। অ্যাক্সিস ব্যাংক ফিনটেক অংশীদারত্বের মাধ্যমে গিগ কর্মীদের জন্য দ্রুত ঋণ অনুমোদন এবং ক্ষুদ্র অর্থায়ন সুবিধা চালু করেছে। তাছাড়া ভারতের আইসিআইসিআই ব্যাংক গিগ কর্মীদের জন্য ‘গিগা’ নামে একটি সমন্বিত আর্থিক সেবা প্যাকেজ চালু করেছে। এ প্যাকেজে সঞ্চয়ী হিসাব, ক্ষুদ্র ঋণ, পেমেন্ট সুবিধা ও বীমা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাংলাদেশেও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও ডিজিটাল লেনদেন সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), এজেন্ট ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণের মাধ্যমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্বনিয়োজিত কর্মীদের জন্য পুনঃঅর্থায়ন স্কিম (রি-ফিন্যান্স স্কিম) এবং প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক সেবাকে উৎসাহ দিচ্ছে। বর্তমানে দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের নিবন্ধিত গ্রাহক সংখ্যা ২২ কোটিরও বেশি, যা গিগ কর্মীদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির একটি বিশাল সুযোগ তৈরি করছে। তাই গিগ কর্মীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ও নমনীয় আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
নানামুখী বাস্তবতায় বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো গিগ ইকোনমিকে একটি নতুন গ্রাহক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। প্রথমত, গিগ কর্মীদের জন্য বিশেষায়িত ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট চালু করা যেতে পারে, যেখানে অনিয়মিত আয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে নমনীয় লেনদেন ও সঞ্চয়ের সুবিধা থাকবে। দ্বিতীয়ত, রাইড-শেয়ারিং বা ফ্রিল্যান্সিং প্লাটফর্মের আয়তথ্য ব্যবহার করে বিকল্প ক্রেডিট মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালু করা গেলে গিগ কর্মীদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা অ্যানালিটিকস ব্যবহার করে প্লাটফর্ম রেটিং, লেনদেন ইতিহাস এবং আয় প্রবাহ বিশ্লেষণ করে একজন কর্মীর ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব। তৃতীয়ত, রাইড-শেয়ারিং বা ডেলিভারি কর্মীদের জন্য মোটরসাইকেল, সাইকেল বা স্মার্টফোন কেনার মতো কর্মসংস্থান সহায়ক সরঞ্জাম ক্রয়ে সহজ শর্তে ন্যানো লোন চালু করা যেতে পারে। পাশাপাশি স্বল্পমূল্যের মাইক্রো ইন্স্যুরেন্স বা দুর্ঘটনা বীমা চালু করা গেলে এ কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা কিছুটা নিশ্চিত হবে। চতুর্থত, ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সারদের আন্তর্জাতিক আয় দ্রুত ও স্বল্প খরচে দেশে আনার জন্য উন্নত ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে এবং রেমিট্যান্স অবকাঠামো তৈরি করা ব্যাংকগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হতে পারে।
সরকার এরই মধ্যে ফ্রিল্যান্সারদের আলাদা পরিচয়পত্র দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। সিদ্ধান্তটি এ খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়ার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এর সঙ্গে ব্যাংকিং সুবিধার সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি ফ্রিল্যান্সার ও গিগ কর্মীদের জন্য বিশেষ ক্রেডিট গাইডলাইন প্রণয়ন করে এবং ব্যাংক, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান ও ডিজিটাল প্লাটফর্মগুলোর মধ্যে অংশীদারত্ব গড়ে ওঠে, তবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে। ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে স্বল্পমূল্যের স্বাস্থ্যবীমা বা আয় সুরক্ষা স্কিম চালু করা গেলে তা গিগ কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গিগ ইকোনমির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে সরকার, ব্যাংক খাত ও প্রযুক্তি প্লাটফর্মগুলোর মধ্যে সমন্বিত ও নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশের তরুণ জনগোষ্ঠী, দ্রুত বিস্তৃত ডিজিটাল অবকাঠামো ও বৈশ্বিক অনলাইন শ্রমবাজারে ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ গিগ ইকোনমির জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। সঠিক কৌশল ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে ব্যাংক খাত যদি এ উদীয়মান শ্রমবাজারকে আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে পারে, তবে গিগ ইকোনমি ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে।
ইমতিয়াজ ইউ আহমেদ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মিডল্যান্ড ব্যাংক পিএলসি
সিভি/কেএইচ

