মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন চাপ তৈরি করেছে। অনেক দেশকে জ্বালানিতে ভর্তুকি বাড়ানো, রেশনিং চালু করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে। তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতিগুলো বাড়তি ব্যয়ের চাপে পড়েছে। বাংলাদেশও সেই বৈশ্বিক প্রভাবের বাইরে নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর বিশ্বের নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য এখন প্রায় সব দেশের অগ্রাধিকার। এ কারণে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তির উন্নয়ন দ্রুত এগোচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামভিত্তিক ফিশন প্রযুক্তির পাশাপাশি সমুদ্রের পানির ডিউটেরিয়াম ব্যবহার করে ফিউশন প্রযুক্তিও ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় জ্বালানি উৎস হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থাসম্পন্ন আধুনিক পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর নির্মাণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ছোট আকারের মডিউলার রিঅ্যাক্টর এবং আরও ক্ষুদ্র ক্ষমতার রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তির উন্নয়নও দ্রুত এগোচ্ছে। সাধারণভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বা তার কম ক্ষমতার রিঅ্যাক্টরকে ছোট মডিউলার রিঅ্যাক্টর হিসেবে ধরা হয়। অন্যদিকে ১ থেকে ১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রিঅ্যাক্টরগুলোকে ক্ষুদ্র ক্ষমতার রিঅ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এসব রিঅ্যাক্টর কারখানায় মডিউলার পদ্ধতিতে তৈরি করে দ্রুত স্থাপন করা সম্ভব। শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদন, সমুদ্রের নোনাপানি বিশুদ্ধকরণ এবং শিল্পকারখানায় তাপ সরবরাহেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেক দেশ কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিকল্প হিসেবেও ছোট পারমাণবিক রিঅ্যাক্টরকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার নতুন নয়। দীর্ঘ সময় সাবমেরিনে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে ছোট আকারের রিঅ্যাক্টর বহু বছর ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে ক্ষুদ্র ক্ষমতার রিঅ্যাক্টরগুলোকে দূরবর্তী দ্বীপাঞ্চল, খনি এলাকা, সামরিক ঘাঁটি, গবেষণা কেন্দ্র এবং বড় ডাটা সেন্টারের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যকর সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মতো দেশগুলো এ প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। প্রযুক্তি খাতের বড় প্রতিষ্ঠান মেটা, গুগল ও মাইক্রোসফটও তাদের ডাটা সেন্টারের স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন প্রজন্মের পারমাণবিক প্রযুক্তিতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।
এই বৈশ্বিক পরিবর্তনের মধ্যেই বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প। সেখানে রাশিয়ার তৈরি প্রজন্ম-৩+ শ্রেণির দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াট।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি স্থাপনের পর পুরো কমিশনিং প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হয়। সাধারণত ফুয়েল স্থাপন কার্যক্রম শেষ হতে দেড় থেকে দুই মাস সময় লাগে। এরপর খুব কম শক্তিতে নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া চালু করা হয়, যাকে রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি বলা হয়। এই ধাপে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা বিস্তারিতভাবে পরীক্ষা করা হয়।
পরবর্তী পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের সঙ্গে যুক্ত করে বিভিন্ন শক্তি স্তরে পরিচালনা করা হয়। দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষামূলক পরিচালনার মাধ্যমে যন্ত্রপাতি ও সঞ্চালন ব্যবস্থার সক্ষমতা যাচাই করা হয়। সব পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হলে এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন মিললে পূর্ণ সক্ষমতায় বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। পুরো কমিশনিং প্রক্রিয়া শেষ হতে প্রায় এক বছর সময় লাগতে পারে।
একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হওয়ার পর সাধারণত ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। প্রায় ১৮ মাস পরপর জ্বালানি পরিবর্তন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুই মাসের মতো রিঅ্যাক্টর বন্ধ রাখা হয়। এরপর আবার দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়। সাধারণভাবে একটি রিঅ্যাক্টরের কার্যক্ষমতা প্রায় ৬০ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে বেজলোড প্লান্ট বলা হয়। অর্থাৎ এটি দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীলভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা গুরুতর প্রযুক্তিগত সমস্যা ছাড়া এমন কেন্দ্র সচরাচর বন্ধ করতে হয় না। কারণ একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকলে সমপরিমাণ বিদ্যুৎ অন্য উৎস থেকে উৎপাদনে অনেক বেশি ব্যয় হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক প্রযুক্তির সফল ব্যবহারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কঠোর নিরাপত্তা সংস্কৃতি নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিদেশি নির্ভরতা কমাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল গড়ে তোলাও জরুরি। নিরাপদ ও আধুনিক পারমাণবিক প্রযুক্তির সফল বাস্তবায়ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জাতীয় সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে পারে।

