বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে নতুন আইন ও নীতির আলোচনায় এক ধরনের অস্বস্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ব্যাংক রেজোলিউশন আইনের একটি ধারা ঘিরে প্রশ্ন উঠছে—বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মে জড়িতদের জন্য কি আবারও ফিরতে সহজ পথ তৈরি করা হচ্ছে? বিষয়টি শুধু আইনি নয়, নৈতিকতার ক্ষেত্রেও বড় বিতর্ক তৈরি করেছে।
আলোচনায় উঠে আসছে এক ধরনের বৈপরীত্য। যেখানে ছোট অপরাধীরা কঠোর শাস্তির মুখে পড়ে, সেখানে বড় পরিসরের অর্থ লুটের সঙ্গে জড়িতদের জন্য ‘সমঝোতার’ সুযোগ তৈরি হলে তা বিচারব্যবস্থার ন্যায্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলে। এতে সাধারণ মানুষের মনে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, বড় অপরাধ করলে শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার সুযোগ থেকেই যায়।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত থাকেন ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীরা। ব্যাংকের সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবহারের ফলে শেষ পর্যন্ত সেই বোঝা পড়ে সাধারণ জনগণের ওপরই। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় তাদের উপস্থিতি বা মতামতের প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
তবে নীতিনির্ধারকদের যুক্তিও একেবারে অমূলক নয়। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ আদায়ে জটিলতা, অর্থ পাচারের টাকা ফেরত আনার সীমাবদ্ধতা, ধীরগতির বিচার প্রক্রিয়া এবং দুর্বল ব্যাংকিং কাঠামো—এসব কারণে বিকল্প পথ খোঁজার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনে বলা হয়েছে, সংকটে পড়া ব্যাংকের সাবেক মালিকরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করে আবার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবেন—যার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রের দেওয়া অর্থের একটি অংশ আগাম পরিশোধ এবং বাকি অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সুদসহ ফেরত দেওয়া।
সমর্থকদের মতে, এই পদ্ধতি অন্তত কিছু অর্থ পুনরুদ্ধারের সুযোগ তৈরি করে। কারণ বাস্তবতায় অনেক ক্ষেত্রেই পুরো অর্থ ফেরত আনা কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু সমালোচকরা বলছেন, এতে একটি ঝুঁকিপূর্ণ বার্তা দেওয়া হচ্ছে—যদি কেউ বড় পরিসরে অনিয়ম করতে পারে এবং সময় পার করতে পারে, তাহলে শেষ পর্যন্ত তার সঙ্গে সমঝোতার পথ খোলা থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যাংক খাতে বড় ধরনের অনিয়ম কখনো এককভাবে ঘটে না। এর পেছনে থাকে ব্যবস্থাপনা, পরিচালনা পর্ষদ, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিভিন্ন স্তরের সম্পৃক্ততা। এই কাঠামোগত দুর্বলতা দূর না করলে শুধুমাত্র আইন পরিবর্তন করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
অনেকের মতে, বিকল্প হিসেবে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যেত—যেমন জড়িতদের স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা, সম্পদ জব্দ করা এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আইনের আওতায় আনা। এতে শুধু দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত হতো না, ভবিষ্যতের জন্যও একটি শক্ত বার্তা যেত যে ব্যাংক খাত ব্যক্তিগত সুবিধার জায়গা নয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সাধারণত কঠোর সংস্কারই কার্যকর হয়। ব্যর্থ মালিক ও ব্যবস্থাপনাকে সরিয়ে দেওয়া, শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতি বহন করতে দেওয়া এবং আইনি প্রক্রিয়ায় অর্থ পুনরুদ্ধার—এসবই বেশি প্রচলিত পথ। সেখানে অনিয়মকারীদের পুনরায় একই অবস্থানে ফিরিয়ে আনার উদাহরণ খুবই সীমিত।
সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে—ব্যাংক খাতে আস্থা পুনর্গঠনে কি আপসের নীতি কার্যকর হবে, নাকি এতে ভবিষ্যতের ঝুঁকি আরও বাড়বে? অর্থনীতিবিদদের মতে, এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করছে জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা যায় এবং নীতির প্রয়োগ কতটা স্বচ্ছ থাকে তার ওপর।
লেখক:মাহতাব উদ্দিন আহমেদ, বিল্ডকন কনসালটেন্সিজ লিমিটেড ও বিল্ডনেশন লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা।

