ইসলামে মানুষের প্রত্যেক কাজের মূল্য ও মর্যাদা নির্ধারিত হয়েছে ন্যায়, পরিশ্রম ও সততার ভিত্তিতে। শ্রম শুধু জীবিকা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং এটি ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন মানুষ যখন সৎ উপায়ে, পরিশ্রমের মাধ্যমে জীবিকা উপার্জন করে, তখন সে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথেই এগিয়ে যায়। তাই ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ।
মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনের সুরা জুমুয়াহর ১০ আয়াতে এরশাদ করেন, ‘অতঃপর নামাজ সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো।’ এ আয়াতে মহান আল্লাহ ফরজ নামাজ আদায়ের পর রিজিকের সন্ধানে পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
হাদিস শরিফে বর্ণিত, ‘রাসুলে কারিম (সা.) এরশাদ করেন, ফরজ ইবাদতগুলোর পরেই হালাল উপার্জন করা একটি ফরজ ইবাদত।’ (তিরমিজি) ‘হালাল উপার্জনগুলোর মধ্যে তা সর্বোত্তম, যা কায়িক শ্রমের মাধ্যমে অর্জন করা হয়।’ (সহিহ মুসলিম)
অন্য হাদিসে বর্ণিত, ‘রাসুলে কারিম (সা.) এরশাদ করেন, নিজ হাতের শ্রমে উপার্জিত জীবিকার চেয়ে উত্তম আহার কেউ কখনও গ্রহণ করেনি।’ (সহিহ বুখারি) সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নবী মুহাম্মদ (সা.) শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষকে অত্যন্ত সম্মানের দৃষ্টিতে দেখতেন। কারণ, যারা মানুষের সুখের জন্য মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নিজেদের তিলে তিলে নিঃশেষ করে দেয়, তারা তো মহান আল্লাহর কাছেও মর্যাদার অধিকারী। ইসলাম সবসময় মানুষকে কর্মঠ ও পরিশ্রমী হতে উৎসাহিত করে।
মানবতার মুক্তির মহান অগ্রদূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই শ্রমের মর্যাদার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তিনি নিজ হাতে কাজ ও ব্যবসা করতেন। তিনি কখনও অন্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন না। একবার এক সাহাবিকে ভিক্ষা না করে নিজের শ্রমে উপার্জন করার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘কেউ যদি নিজের হাতে উপার্জন করে, তার চেয়ে উত্তম খাদ্য আর নেই।’ এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, নিজের পরিশ্রমের উপার্জন ইসলামে সর্বোত্তম বলে বিবেচিত।
ইসলামে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত, মহানবী (সা.) এরশাদ করেন, ‘শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করো।’ এটি শ্রমিকের প্রতি ইসলামের গভীর মানবিকতা ও ন্যায়বোধের পরিচায়ক। শ্রমিকদের প্রতি অবিচার, শোষণ বা বঞ্চনা ইসলাম কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। একজন শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার আদায় করা সমাজের প্রত্যেক মানুষের দায়িত্ব।
ইসলামের দৃষ্টিতে শ্রম মানুষের আত্মসম্মান ও স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি করে। একজন ব্যক্তি যখন নিজের শ্রমের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে, তখন তাকে কারও কাছে হাত পাততে হয় না। ইসলাম সবসময় ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত এবং মানুষকে আত্মনির্ভরশীল হতে উৎসাহিত করে। এতে ব্যক্তি যেমন সম্মানিত হয়, তেমনি সমাজ হয় শক্তিশালী ও উন্নত।
শ্রমের মাধ্যমে হালাল উপার্জন মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। হালাল উপার্জনের মাধ্যমে জীবন পরিচালনা করলে মানুষের দোয়া কবুল হয় এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও বরকত আসে। এর বিপরীতে অবৈধ বা হারাম উপায়ে অর্জিত সম্পদ মানুষের জীবনে অশান্তি ও দুর্ভোগ ডেকে আনে। তাই ইসলাম সবসময় হালাল উপার্জনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে।
ইসলামে শ্রমকে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যদি তা সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়। একজন ব্যক্তি যদি তার পরিবারের ভরণপোষণের জন্য বা সমাজের কল্যাণে কাজ করে, তাহলে তার এই শ্রমও ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়। এর মাধ্যমে সে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে পারে।
সব শেষে বলা যায়, ইসলামে শ্রমের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ এবং তা মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও আধ্যাত্মিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইসলাম মানুষকে পরিশ্রমী, সৎ ও দায়িত্বশীল হতে শিক্ষা দেয়। তাই আমাদের প্রত্যেকের উচিত ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী শ্রমকে সম্মান করা, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং নিজের জীবনে পরিশ্রমকে প্রাধান্য দেওয়া। এতে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই উপকৃত হবে এবং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ সম্ভব হবে। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।
- ড. মো. শাহজাহান কবীর: চেয়ারম্যান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সিভি/এম

