দেশের শাসন কাঠামোর ধরনই মূলত নির্ধারণ করে আমলাতন্ত্র কীভাবে কাজ করবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল হলে বা রাষ্ট্রে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বাড়লে প্রশাসনও ধীরে ধীরে সেই প্রবণতার সঙ্গে মানিয়ে নেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আরও কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রবণতার একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনকালকে উল্লেখ করেন। সেই সময় প্রশাসন, বিশেষ করে জনপ্রশাসন, শাসন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে বলে আলোচনা রয়েছে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রকে নতুনভাবে গড়ে তোলার একটি সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সেই সুযোগ কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়নি বলে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। বরং প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে রদবদলকে ঘিরে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়।
নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে অতীত রাজনৈতিক বঞ্চনার বিষয়কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—এমন অভিযোগও ওঠে। পাশাপাশি কিছু পর্যবেক্ষকের মতে, এই সরকারও এক ধরনের আমলাতান্ত্রিক চাপের মধ্যে ছিল। ফলে আমলাতন্ত্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা ছিল, তার বড় অংশই বাস্তবায়িত হয়নি।
এ অবস্থায় পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর আবারও প্রশাসন সংস্কারের দায়িত্ব আসে। এর ধারাবাহিকতায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার প্রশাসন পুনর্বিন্যাসের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা যায়। তবে এ ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীতের অতিমাত্রায় দলীয়করণের কারণে প্রশাসনের ভেতরে মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক পুনর্বিন্যাস এখন সহজ কাজ নয়।
তবুও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কঠিন হলেও এই সংস্কার প্রক্রিয়া থামিয়ে রাখা যাবে না। কারণ দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা মাথাভারী প্রশাসনিক কাঠামো রাতারাতি বদলে ফেলা বাস্তবসম্মত নয়। তাই ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়ে একটি জনবান্ধব ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলাই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
রাষ্ট্র পরিচালনায় দক্ষ, নিরপেক্ষ ও জনমুখী প্রশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নীতি নির্ধারণ করে, আর প্রশাসন সেই নীতিকে বাস্তবায়ন করে। প্রশাসন দুর্বল বা পক্ষপাতদুষ্ট হলে নীতির বাস্তবায়ন ব্যাহত হয় এবং তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। দেশে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক সংস্কারের আলোচনা চলমান। বর্তমান সরকারও মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র গঠনের কথা বলছে। তবে এই পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় শর্ত হিসেবে উঠে আসছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসনে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে পেশাদার দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর ফলে অনেক যোগ্য কর্মকর্তা পিছিয়ে পড়েছেন, আবার অনেকে সম্পর্কের কারণে এগিয়ে গেছেন। এই সংস্কৃতি প্রশাসনের দক্ষতা কমিয়েছে এবং একই সঙ্গে সৎ ও মেধাবী কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করেছে।
বর্তমানে প্রশাসনের পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা চললেও পুরনো কাঠামো বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যোগ্য কর্মকর্তা নির্বাচনেও জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অতীতের মূল্যায়ন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও কার্যকর জবাবদিহি না থাকায় আজকের দিনে কেবল নথিভিত্তিক তথ্য দেখে দক্ষ নেতৃত্ব নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে, কারও অভিজ্ঞতা থাকলেও আস্থা নিয়ে প্রশ্ন আছে, কারও ভাবমূর্তি ভালো হলেও প্রশাসনিক দক্ষতা সীমিত, আবার কেউ দক্ষ হলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ পাননি। এই বাস্তবতায় শীর্ষ পদে সঠিক ব্যক্তি নির্বাচন একটি জটিল প্রক্রিয়া হয়ে উঠেছে।
এ পরিস্থিতিতে মেধাভিত্তিক প্রশাসন গঠনের ধারণা কেবল পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে সঠিক ব্যক্তিকে সঠিক স্থানে বসানো, কর্মদক্ষতার মূল্যায়ন, সৎ কর্মকর্তাদের সুরক্ষা, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিবেশ।
যদি পদোন্নতি কর্মফলের বদলে প্রভাবের ওপর নির্ভর করে, তবে মেধাভিত্তিক প্রশাসন গঠনের লক্ষ্য কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করাও জরুরি, কারণ দুর্নীতির প্রভাবমুক্ত প্রশাসন ছাড়া জনবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সুস্পষ্ট মানদণ্ড এবং কার্যকর জবাবদিহির মাধ্যমেই শক্তিশালী প্রশাসন গড়ে ওঠে। সিঙ্গাপুরের প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রায়ই এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে উঠে আসে, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসন একটি অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। বাংলাদেশেও এমন সমন্বয় প্রয়োজন। তবে তা অবশ্যই গণতান্ত্রিক জবাবদিহির কাঠামোর ভেতরে এবং জনস্বার্থকে কেন্দ্র করে হতে হবে।
সব মিলিয়ে বর্তমান সময়ে সরকারের সামনে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একদিকে দলীয়করণ ও অদক্ষতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পুরনো প্রশাসনিক সংস্কৃতি পরিবর্তন করা, অন্যদিকে রাষ্ট্রের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখা। হঠাৎ বা প্রতিশোধমূলক রদবদল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।
তাই সংস্কার প্রক্রিয়া হতে হবে ধাপে ধাপে, পরিকল্পিতভাবে এবং সুস্পষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনকে নাগরিক সেবাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুনর্গঠন করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমলাতন্ত্রের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব অনেকাংশেই নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ওপর। জনগণের প্রত্যাশা একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। আর সেই রাষ্ট্র গঠনে যেমন শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক আমলাতন্ত্র।
তাই শেষ পর্যন্ত প্রত্যাশা একটাই—রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রশাসনের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে উঠুক। যাতে করে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসন কাঠামো বা তার সহযোগী আমলাতন্ত্র জনগণের সামনে আবার ফিরে না আসে।

