নিম্নলিখিতটি লেখক গুইন ড্যানিয়েলের কল্পনায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পক্ষ থেকে তাঁর ইসরায়েলি প্রতিপক্ষ বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে লেখা একটি কাল্পনিক চিঠি।
প্রিয় প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু,
যুক্তরাজ্যে ইহুদি সম্প্রদায়ের আরও সদস্যদের ওপর সাম্প্রতিক হামলায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও বিচলিত। এই হামলাগুলো সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং এর বিরুদ্ধে কঠোরতম ভাষায় প্রতিবাদ ও নিন্দা জানাতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমার দায়িত্ব হলো আমাদের সকল নাগরিককে নিরাপদ রাখা, কিন্তু আমি নিজের জন্য যে সীমা নির্ধারণ করেছি, তার মধ্যে থেকে আমি ব্যর্থ হচ্ছি।
আমরা আমাদের ইহুদি সম্প্রদায়গুলোর জন্য অতিরিক্ত পুলিশি সুরক্ষা প্রদান করেছি, কিন্তু এই সম্প্রদায়গুলোর সদস্যরা সরকারকে বলছেন যে, এটি সহায়ক হলেও যথেষ্ট নয়। তাঁরা আমাদের কাছে এই ইহুদি-বিদ্বেষী হামলার আকস্মিক বৃদ্ধির মূল কারণগুলো সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।
তাই আমি ঠিক সেটাই করছি। আমি আমাদের এযাবৎকালের নীতি ও কৌশলগুলো পর্যালোচনা করছি এবং খতিয়ে দেখছি যে, আমাদের পদক্ষেপগুলো আদৌ সহায়ক হয়েছে কি না—নাকি সেগুলো ইহুদি নাগরিকদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।
দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের অনেক নীতিই মারাত্মক ভুল ছিল এবং প্রকৃতপক্ষে তা ব্রিটেনের ইহুদিদের আরও বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে, পাশাপাশি জনসংখ্যার অন্যান্য অংশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। আমাদের একটি ভুল হলো, আপনাদের সরকারের কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে হওয়া প্রতিবাদ দমন করতে গিয়ে বিপুল শক্তি ব্যয় করা।
আমরা এই ধারণাকে উৎসাহিত করেছি যে, ফিলিস্তিনি, আরব ও মুসলিমদের ওপর ইসরায়েলি গণহত্যার প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলগুলোই ইহুদি-বিদ্বেষের প্রধান উৎস। আমরা এখন প্রধান রাব্বিসহ ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে এগুলো নিষিদ্ধ বা সীমিত করার জন্য নতুন করে দাবি পাচ্ছি।
আমাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ ছাড়াই এগুলোকে “ঘৃণা মিছিল” আখ্যা দেওয়া হয়েছে। আমরা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সন্ত্রাসী হিসেবে নিষিদ্ধ করেছি। আমরা এই সুস্পষ্ট প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছি: এই বিক্ষোভকারীরা আসলে কিসের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছে?
আরো গভীরে অনুসন্ধান
আমরা—বেশিরভাগ মূলধারার গণমাধ্যমের সঙ্গে একযোগে—ধারাবাহিকভাবে এই ইঙ্গিত দিয়ে এসেছি যে, যে অপরাধগুলোর নিন্দা করা হচ্ছে, তার চেয়ে এই প্রতিবাদগুলোই একটি বড় সমস্যা; যে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের পরিবার ও বন্ধুরা গাজায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এবং যারা ন্যায়বিচার চান ও গণহত্যার বিরোধিতা করেন, তারাই কোনো না কোনোভাবে সমস্যা।
এই বিষয়টি বাদ দিলেও যে প্রতিবাদকারীদের মধ্যে অনেকেই ইহুদি, যাদের মধ্যে পূর্ণ ধর্মীয় পোশাকে সজ্জিত কিছু কট্টর-গোঁড়া ইহুদিও রয়েছেন (যাদেরকে গালিগালাজ না করে ধারাবাহিকভাবে অভিবাদন জানানো হচ্ছে), আমরা কি সত্যিই এমন ভান করার সুযোগ দিতে পারি যে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে সপ্তাহ পর সপ্তাহ ধরে রাস্তায় নেমে আসা হাজার হাজার নাগরিক মূলত ইহুদি-বিদ্বেষ দ্বারা উদ্বুদ্ধ?
অবশেষে আমি আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে এবং আমার পূর্বধারণাগুলো পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য হয়েছি। যুক্তরাজ্যে ইহুদি-বিদ্বেষী ঘটনার হার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা কমিউনিটি সিকিউরিটি ট্রাস্ট (সিএসটি)-এর প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত প্রমাণ আমার চোখের সামনেই রয়েছে। তাদের প্রতিবেদনগুলো ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনে সহিংসতা বৃদ্ধির সময় এবং তার পরে “ইহুদি-বিদ্বেষ”-এর সুস্পষ্ট উল্লম্ফনের দিকে ইঙ্গিত করে।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে এবং ২০২১ সালের মে মাসে ব্যাপক বৃদ্ধি দেখা গিয়েছিল; উভয় সময়েই ইসরায়েল গাজায় বোমাবর্ষণ করে শত শত ফিলিস্তিনিকে হত্যা করছিল।
স্পষ্টতই, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে, যখন দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর আপনার সরকার গাজায় বোমা হামলা শুরু করে, তখন থেকে এই হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে, যার ফলে আমরা আজ এই শোচনীয় পরিস্থিতিতে পড়েছি। যদিও সিএসটি এই কথা বলবে না, যুক্তরাজ্যে ইহুদিদের নিরাপত্তা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে।
ইসরায়েলের যুদ্ধাপরাধের জন্য যুক্তরাজ্যের ইহুদি নাগরিকদের দায়ী করা উচিত নয়—এ বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য থাকা সত্ত্বেও আমার সরকার এবং পূর্ববর্তী সরকার এই যোগসূত্রটি জোরদার করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
আন্তর্জাতিক হলোকস্ট স্মরণ জোটের (আইএইচআরএ) ইহুদি-বিদ্বেষের সংজ্ঞা, যা আপনার সরকার সকল দেশ ও জাতিসংঘকে গ্রহণ করার জন্য উৎসাহের সঙ্গে আহ্বান জানিয়েছে, তা ইচ্ছাকৃতভাবে ইহুদি-বিদ্বেষকে ইসরায়েল ও জায়নবাদের সমালোচনার সঙ্গে যুক্ত করে। অক্টোবর ২০২৫-এ, আমার সরকারের অধীনে, এনএইচএস ইংল্যান্ড আইএইচআরএ-র সংজ্ঞাটি গ্রহণ করে, যা স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ ও ভয়ের সৃষ্টি করে। এটি যুক্তরাজ্যের ইহুদিদের আরও নিরাপদ করতে কিছুই করেনি।
জায়নবাদ-বিরোধিতা এবং ইসরায়েলের সমালোচনাকে ইহুদি-বিদ্বেষ হিসেবে গণ্য করার পাশাপাশি—ঠিক যেমনটা আপনার সরকার চেয়েছিল—আমরা আরও একটি মৌলিক ভুল করেছি। ইসরায়েলের প্রতি আমাদের সমর্থন ঘোষণা করে, যেকোনো সমালোচনাকে লঘু করে এবং আত্মরক্ষার জন্য আপনার জাতির “অধিকার” দাবি করে, আমরা এমনভাবে কাজ করেছি যেন আমরা ব্রিটেনের ইহুদিদের সাহায্য করছি।
উস্কানিমূলক বাগাড়ম্বর
২০২২ সালে ‘দ্য জিউইশ ক্রনিকল’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে—যা এখন ফিরে তাকালে আমি লজ্জিত হই—আমি কীভাবে ইহুদি-বিদ্বেষকে ‘মূলসুদ্ধ’ উপড়ে ফেলব তা দেখানোর প্রবল ইচ্ছায় ঘোষণা করেছিলাম যে, ইসরায়েল কোনো বর্ণবাদী রাষ্ট্র নয়। একজন প্রাক্তন মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে আমি জানতাম যে, সমস্ত প্রমাণ এর বিপরীতটাই বলে—কিন্তু আমি ইসরায়েলের ভূয়সী প্রশংসা করে ইহুদি সম্প্রদায়ের একটি নির্দিষ্ট অংশের মন জয় করতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু এর জন্য আমরা অবশ্যই কোনো ধন্যবাদ পাই না। যখনই আমরা অতি মৃদুভাবে ইসরায়েলের সমালোচনা করি, আপনাদের সরকার বরাবরই আমাদের ইহুদি-বিদ্বেষী বলে অভিযুক্ত করে।
এই উস্কানিমূলক কথাবার্তা বাড়িয়ে তোলা এবং তারপর এর পরিণতির জন্য আমাদের দোষারোপ করা আপনার সুবিধাই দেয়। গোল্ডার্স গ্রিন হামলার পর, আপনার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত “ইংল্যান্ডের ইহুদিদের সুরক্ষার জন্য ব্রিটিশ সরকারের কাছে পদক্ষেপের দাবি ও প্রত্যাশা” জানিয়েছিল, অন্যদিকে ইসরায়েলি প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ ঘোষণা করেছিলেন: “আমাদের ইহুদি বোন ও ভাইদের যখন হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তখন আমরা ইসরায়েলে চুপ থাকব না।”
আপনি সম্ভবত সন্তুষ্ট হয়েছিলেন যখন, যুক্তরাজ্যে তাদের নিরাপত্তাহীনতার পরিস্থিতি তৈরি করার পর, কিছু ইহুদি নাগরিক ঘোষণা করেছিল যে, তারা ইসরায়েলে বসবাস করলে বেশি নিরাপদ বোধ করবে।
প্রধানত খ্রিস্টান ইউরোপে ইহুদি-বিদ্বেষের শিকড় দীর্ঘ ও গভীর এবং কেউই এর অন্যথা বলে না। কিন্তু বিশ্বজুড়ে “আমাদের ইহুদি ভাই ও বোনদের” প্রতি আপনার ধার্মিক উদ্বেগ থাকা সত্ত্বেও এবং যারা ইহুদিদের ওপর হামলা করে তারা যে তাদের নিজেদের অপরাধের জন্য দায়ী—এই সুস্পষ্ট সত্যটি জানা সত্ত্বেও, এটা বোঝা কঠিন নয় যে, আপনার সরকারের কর্মকাণ্ড কত বেপরোয়াভাবে প্রবাসী ইহুদিদের বিপন্ন করছে।
সুতরাং আমাদের দোষারোপ না করে, এই ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য আপনার সরকার কী দায়িত্ব নেবে?
ইসরায়েলকে তুষ্ট করার, তার বহুবিধ বাড়াবাড়ির ব্যাপারে নরম হওয়ার, তার কর্মকাণ্ড ও রাজনৈতিক কাঠামোর ক্ষেত্রে “গণহত্যা” বা “বর্ণবৈষম্য” শব্দগুলো ব্যবহার করতে অস্বীকার করার এবং আপনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)-এর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের বিষয়ে টালবাহানা করার জন্য আমার (এবং অন্যান্য পশ্চিমা নেতাদের) প্রচেষ্টার চূড়ান্ত ফলকে প্রবাসে থাকা ইহুদিদের ওপর এর প্রভাবের প্রতি কোনো পরোয়া না করে, বিচারহীনভাবে ফিলিস্তিনি, আরব ও মুসলিমদের জীবন ধ্বংস করে চলার জন্য উৎসাহ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।
পদক্ষেপ গ্রহণ করা
একই সঙ্গে, ইহুদি-বিদ্বেষের মতো ফিলিস্তিন-বিদ্বেষ, আরব-বিদ্বেষ বা মুসলিম-বিদ্বেষের তীব্র নিন্দা করতে ব্যর্থ হওয়ায় আমরা এই ধারণা দিয়েছি যে, আমরা নাগরিকদের একটি গোষ্ঠীকে অন্য গোষ্ঠীর চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিই।
তা সত্ত্বেও, আমাকে গোল্ডার্স গ্রিনে একদল ইহুদিকে ইসরায়েলি পতাকা নাড়তে এবং “বিশ্বাসঘাতক” বা “কিয়ার স্টারমার, ইহুদি-বিদ্বেষী” বলে স্লোগান দিতে দেখতে হয়েছে, অথচ আপনাদের রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা নিষ্ক্রিয়তার জন্য আমাকে তিরস্কার করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন।
আমি এখন বুঝতে পারছি, আমাকে বোকা বানানো হয়েছে। তাই, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি কিছু পদক্ষেপ নিতে চাই—এবং আমার সরকারের মেয়াদের অনেক আগেই যদি আমি এই পদক্ষেপগুলো নিতাম, তাহলে ইহুদিদের প্রতি যে চরম বৈরিতা আমরা এখন দেখছি, তার কিছুটা হয়তো এড়ানো যেত।
আমি নিশ্চিত করব যে, আপনি যদি আবার এই ভূমিতে পা রাখেন, আমরা আইসিসি-র নির্দেশ মেনে আপনাকে গ্রেপ্তার করে হেগের হাতে তুলে দেব।
২) আমি আপনার সরকারের সঙ্গে সকল সামরিক সহযোগিতা স্থগিত করব, যার মধ্যে সকল অস্ত্রশস্ত্র ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ক্রয়-বিক্রয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৩) আমি অবিলম্বে ২০১৯ সালে ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত বাণিজ্য চুক্তিটি স্থগিত করব, যেখানে বলা হয়েছে যে, গণতান্ত্রিক নীতি ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এর একটি অপরিহার্য উপাদান। ইসরায়েল নির্লজ্জভাবে এই বিধানটি লঙ্ঘন করছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা এই পদক্ষেপগুলো নিচ্ছি, কারণ আমি অবশেষে বুঝতে পেরেছি যে, ইসরায়েলের আচরণ ব্রিটেনের ইহুদিদের জীবনকে কতটা বিপন্ন করে, যাদের রক্ষা করার পরম দায়িত্ব আমার রয়েছে।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর আপনার বিষাক্ত প্রভাব আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমাদের সরকার এবং পশ্চিমা বিশ্বের অন্যান্যদের দ্বারা ইসরায়েলকে দেওয়া দায়মুক্তি আপনাকে আরও সহিংসতা ও আগ্রাসন চালাতে কেবল উৎসাহিত করেছে এবং আমাদের নাগরিকদের ন্যায্য ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে—যার কিছু অংশ দুঃখজনকভাবে আমাদের ইহুদি সম্প্রদায়ের দিকেও সরে গেছে।
আপনার বিশ্বস্ত,
কিয়ার স্টারমার
- গুইন ড্যানিয়েল: যুক্তরাজ্যের একজন মনোচিকিৎসক, প্রশিক্ষক এবং লেখিকা। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

