যখন কোনো দেশের ব্যাংকিং খাত রক্তাক্ত হয়, নীতিনির্ধারকদের প্রথম প্রবণতা হয় কারিগরি সমাধানের দিকে হাত বাড়ানো—কঠোর মূলধন পর্যাপ্ততার বিধি, ঋণ শ্রেণীকরণের কড়া মানদণ্ড, নতুন প্রভিশনিং প্রয়োজনীয়তা। এসব ব্যবস্থার প্রয়োজন অস্বীকার করার উপায় নেই।
কিন্তু উন্নয়নশীল বিশ্বের আর্থিক ব্যবস্থা নিয়ে তিন দশকের বেশি সময় গবেষণা এবং বিআইবিএমে ২০২৫ সালের মে মাসে প্রদত্ত ২২তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতার মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যাংকিং পরিমণ্ডলকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর আমি এমন একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি, যা এখনো সরকারি মহলের অনেকেই মানতে নারাজ: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সংকট মূলত কারিগরি নয়; এর শিকড়ে রয়েছে নৈতিকতা ও সুশাসনের বিপর্যয়।
সংখ্যাগুলো বিস্ময়কর। অনাদায়ি ঋণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে; ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে যেখানে মোট ঋণে অনাদায়ির হার ছিল ১৬.৯ শতাংশ, ডিসেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০.২ শতাংশে। এর প্রায় ৮০ শতাংশই রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর হিসাবে, যা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দুর্বল সুশাসনের মাত্রাই দেখিয়ে দেয়।
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকার প্রকাশিত শ্বেতপত্র অনুযায়ী, দুর্নীতির মাধ্যমে নষ্ট হওয়া মোট সম্পদ ২৪টি পদ্মা সেতু বা ১৪টি ঢাকা মেট্রোরেল নির্মাণের ব্যয়ের সমান। যাঁরা মনে করেন সমস্যা কেবল ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বা নিয়ন্ত্রক সূক্ষ্ম-সমন্বয়ের, এই সংখ্যাগুলো তাঁদের একটু থামতে বাধ্য করবে।
আমার গবেষণা সহযোগীদের সঙ্গে যৌথভাবে রচিত এবং বিআইবিএম প্রকাশিত গবেষণা সাময়িকী ‘ব্যাংক পরিক্রমা’র সাম্প্রতিক সংখ্যায় (খণ্ড ৫০, সংখ্যা ১, জুন ২০২৫) প্রকাশিত গবেষণায় আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, একাডেমিয়া, গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন অংশীজন গোষ্ঠীর ৬০০ জনকে প্রশ্ন পাঠিয়ে ২০৫ জনের পরিপূর্ণ উত্তর পেয়েছি (সাড়া দেওয়ার হার ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ)। উত্তরদাতাদের ২৮ শতাংশ নৈতিক ব্যর্থতার প্রধান কারণ হিসেবে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপকে চিহ্নিত করেছেন। ৭৫ শতাংশ মত দিয়েছেন, দলীয়-রাজনৈতিক চাপে সবচেয়ে বেশি আপস হয়েছে ঋণ অনুমোদন ও পুনঃ তফসিলীকরণে। একজন উত্তরদাতাও কারিগরি অদক্ষতাকে শীর্ষে রাখেননি। পচন রাজনৈতিক, পদ্ধতিগত নয়।
মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভেবে দেখুন। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত শিল্পগোষ্ঠীগুলো ব্যাংককে ব্যক্তিগত কোষাগারের মতো ব্যবহার করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টার নেতৃত্বাধীন বেক্সিমকো একা জনতা ব্যাংক থেকেই নিয়েছে প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ—ব্যাংকটির মোট মূলধনের প্রায় ৯৫০ শতাংশ। এর মধ্যে ১৯ হাজার কোটি টাকা ইতিমধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।
এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের ৮২ শতাংশের বেশি শেয়ার অধিগ্রহণ করে এবং ৭৪ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ঋণ বের করে নিয়েছে—ব্যাংকটির মোট ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় অর্ধেক। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত একই গ্রুপ ছয়টি ব্যাংক থেকে নিয়েছে ৯৫ হাজার ৩৩১ কোটি টাকার ঋণ, যা ২০২৪ সালে গোটা ব্যাংকিং খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৫ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এগুলো দুর্বল ক্রেডিট স্কোরিংয়ের লক্ষণ নয়; এগুলো এমন একটি ব্যবস্থার ফল, যেখানে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকেরা ব্যাংক ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার রক্ষাকবচগুলোকে একে একে অগ্রাহ্য করেছেন।
ইসলামি অর্থনীতির গবেষক হিসেবে আমাকে সবচেয়ে বেশি বিচলিত করে দেশের ইসলামি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষতি। ইসলামি ব্যাংকগুলো এমন কিছু নীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয়—সুদ (রিবা) নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ-সমর্থিত লেনদেনের আবশ্যকতা, চুক্তিগত স্বচ্ছতার অপরিহার্যতা—যেগুলো বাড়তি একটি নৈতিক শৃঙ্খলার স্তর জোগানোর কথা। অথচ এই সময়ে ইসলামি ব্যাংকগুলোও প্রচলিত ব্যাংকগুলোর মতোই দখল হয়ে গেছে। দেশের ১০টি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের মধ্যে চারটি—ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, সোশ্যাল ইসলামী ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করত এস আলম গ্রুপ।
একাধিক তদন্তের ফল অনুসারে, পরপর তিনজন বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ইসলামী ব্যাংক দখলে সহায়তা করেছেন। এক সাবেক অর্থমন্ত্রী প্রকাশ্যে ইসলামি ব্যাংকিংকে ‘প্রতারণা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। যে শরিয়াহ তত্ত্বাবধায়ক বোর্ডগুলোর এসব প্রতিষ্ঠানের বিবেক হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোকে হয় কিনে নেওয়া হয়েছে, নয়তো প্রান্তিক করে রাখা হয়েছে। আমাদের জরিপে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ উত্তরদাতা ইসলামি ব্যাংকে নৈতিক ব্যর্থতার প্রাথমিক চালিকা শক্তি হিসেবে রাজনৈতিক চাপ ও বেআইনি হস্তক্ষেপকেই দায়ী করেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও নীরব দর্শক ছিল না। পরপর কয়েকজন গভর্নর ঋণমান শিথিল করেছেন, পছন্দের ঋণগ্রহীতাদের সুবিধার জন্য সুদের হার ৯ শতাংশে বেঁধে দিয়েছেন, পরিদর্শন স্থগিত রেখেছেন এবং গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার সীমিত করেছেন। একজন গভর্নর এখন ৮ কোটি ১০ লাখ ডলারের রিজার্ভ চুরি মামলায় অভিযুক্ত। যে প্রতিষ্ঠানের জনস্বার্থ রক্ষার কথা ছিল, সেটিকেই ব্যবহার করা হয়েছে ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করতে।
এ কাগজে প্রকাশিত আমার আগের একটি লেখায় আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনাগত স্বায়ত্তশাসন শক্তিশালী করার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলাম। কারণ, একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় ব্যাংকই সেই ভিত্তি, যার ওপর আর্থিক শৃঙ্খলা দাঁড়িয়ে থাকে। তা না থাকলে প্রতিটি বিধি ততটুকুই কার্যকর হয়, যতটুকু সেটি প্রয়োগের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। আর সেই সদিচ্ছা, আমরা দেখেছি, কেনা যায়।
২০২৫ সালের ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন অর্ডিন্যান্স’ ছিল সঠিক পথে একটি পদক্ষেপ। এটি বাংলাদেশ ব্যাংককে সংকটাপন্ন প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপের ক্ষমতা দিয়েছে, রেজোল্যুশনের সময় অপরিহার্য সেবা চালু রাখতে ব্রিজ ব্যাংক চালু করেছে এবং প্রতারণায় জড়িত কর্মকর্তাদের ওপর ব্যক্তিগত দায়দায়িত্ব আরোপ করেছে। কিন্তু কেবল আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়।
আমাদের গবেষণায় ব্যবহৃত দ্বান্দ্বিক কাঠামোতে দেখা গেছে, বাংলাদেশে নিয়ন্ত্রক পরিবর্তন একটি পুনরাবৃত্ত নিদর্শন অনুসরণ করে: নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ থেকে সংকট, সংকট থেকে সংস্কার এবং সংস্কার ধীরে ধীরে পরবর্তী রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ক্ষয়ে যায়। এই চক্র ভাঙতে হলে সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর প্রয়োজন, যা ব্যাংককে জন–আস্থার অভিভাবক না ভেবে পৃষ্ঠপোষকতার হাতিয়ার হিসেবে দেখে এসেছে।
তিনটি সংস্কারে অগ্রাধিকার দেওয়া দরকার। প্রথমত, ব্যাংক পরিচালকদের জন্য ২ শতাংশ মালিকানার শর্ত বাতিল করতে হবে। এটি স্বজনপ্রীতি ও পরিবারতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের দরজা হয়ে উঠেছে; এটি যোগ্য পেশাজীবীদের পরিচালনা পর্ষদে আসা ঠেকিয়ে রাখছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রকৃত পরিচালনাগত স্বাধীনতা দিতে হবে এবং ঋণ, তদারকি ও প্রয়োগের ওপর রাজনৈতিক নির্দেশনা থেকে আইনিভাবে সুরক্ষিত রাখতে হবে। তৃতীয়ত, ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য প্রয়োজন প্রকৃত স্বাধীন ও সুদৃঢ় শরিয়াহ সুশাসন—কেবল নিয়ম রক্ষার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে নয়; বরং ইসলামি অর্থনীতির শব্দ নয়, এর মর্ম রক্ষা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার একটি কার্যকর প্রহরী হিসেবে।
আমি এ যুক্তি দিয়ে এসেছি, যথাযথভাবে পরিচালিত অর্থব্যবস্থা উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায্যতার একটি শক্তিশালী চালিকা হতে পারে। বাংলাদেশের আছে মেধা, উদ্যোক্তামনস্ক প্রাণশক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি, যা দিয়ে এর জনগণের যোগ্য একটি ব্যাংকিং খাত গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু সেটি ততক্ষণ পর্যন্ত হবে না, যতক্ষণ আমরা ভান করতে থাকব যে সমস্যাটা স্প্রেডশিটের ঘাটতি এবং যতক্ষণ আমরা ব্যবস্থার কেন্দ্রে থাকা নৈতিক শূন্যতার মুখোমুখি না দাঁড়াব।
নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতামালায় আমার আগে যে ২২ জন বিশিষ্ট বক্তা বক্তব্য রেখেছেন—বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ থেকে অধ্যাপক রেহমান সোবহান পর্যন্ত—তাঁরা দুই দশকের বেশি সময় ধরে এ কথাই বলে আসছেন। এখন সময় হয়েছে তা শোনার।
- এম কবির হাসান: প্রফেসর অব ফিন্যান্স এবং মফেট চেয়ার প্রফেসর, ইউনিভার্সিটি অব নিউ অরলিন্স, যুক্তরাষ্ট্র। তিনি ২২ মে ২০২৫ তারিখে ঢাকার বিআইবিএমে ব্যাংকিং নৈতিকতাবিষয়ক ২২তম নুরুল মতিন স্মারক বক্তৃতা প্রদান করেন। সূত্র: প্রথম আলো

