এমন কিছু যুদ্ধ আছে যা বিশ্বজুড়ে মানুষের কল্পনাকে আচ্ছন্ন করে রাখে- আবার কিছু যুদ্ধ নীরবে সেই ভাবনা থেকে হারিয়ে যায়। সুদান এখন দ্বিতীয়টির অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে সুদান এমন এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা ভিন্ন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে খবরের শিরোনাম হতো।
দেশটি ধীর গতিতে ভেঙে পড়ছে। ১৪ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। গোটা শহর জনশূন্য হয়ে গেছে। বাজারগুলো প্রায় অচল। হাসপাতালগুলো বন্ধ হয়ে গেছে অথবা বিদ্যুৎ, ওষুধ বা কর্মী ছাড়াই চলছে।
এর কোনোটিই নতুন নয়। নতুন হলো, কখন এবং কেন সুদান হঠাৎ আন্তর্জাতিক শিরোনামে আবার উঠে আসে।
মার্চ মাসে ঠিক এটাই ঘটেছিল, যখন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর সুদানের মুসলিম ব্রাদারহুডকে একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করার পরিকল্পনা ঘোষণা করে।
এর কারণটি ছিল সুস্পষ্ট: ওয়াশিংটন দলটির বিরুদ্ধে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের কাছ থেকে সমর্থন পাওয়ার অভিযোগ করেছিল।
সেই মুহূর্তটি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। দুর্ভিক্ষের সতর্কবার্তার কারণে, কিংবা বাজার ও বাস্তুচ্যুতদের শিবিরে বেসামরিক মানুষ নিহত হওয়ার কারণে সুদান বিশ্ববাসীর মনোযোগে ফিরে আসেনি। এটি ফিরে এসেছিল কারণ ইরানকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যে একে অন্তর্ভুক্ত করা যেত।
এটা কোনো কাকতালীয় ঘটনা ছিল না। এটি তুলে ধরেছে মনোযোগ কীভাবে কাজ করে। সুদান অদৃশ্য নয়; এটি শর্তসাপেক্ষে দৃশ্যমান।
ক্ষমতার ভারসাম্য
সুদানের যুদ্ধ মূলত একটি অভ্যন্তরীণ সংঘাত। এর মূলে রয়েছে একটি ব্যর্থ রাজনৈতিক রূপান্তর, একটি সামরিকীকৃত রাষ্ট্র এবং ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াইরত প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র বাহিনী।
কিন্তু বহিরাগত শক্তিগুলোর সুবিধাবাদী হস্তক্ষেপের কারণে এই প্রক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্বরান্বিত এবং আরও মারাত্মক করে তোলা হয়েছে, যারা সুদানের বিভাজনকে সমাধানযোগ্য কোনো ট্র্যাজেডি হিসেবে নয়, বরং শোষণের একটি ক্ষেত্র হিসেবে দেখে।
২০২৬ সালেও এর কোনো পরিবর্তন হয়নি। যা বদলেছে তা হলো, যুদ্ধটিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি।
একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এবং অন্যদিকে ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার সাথে সাথে সুদানকে ক্রমবর্ধমানভাবে নতুনভাবে চিত্রিত করা হচ্ছিল: একটি সংকটগ্রস্ত দেশ হিসেবে নয়, বরং এক বৃহত্তর সংঘাতের মধ্যকার একটি পরিসর হিসেবে।
সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আর কেবল স্থানীয় শক্তি ছিল না, বরং আঞ্চলিক প্রভাবের সম্প্রসারণে পরিণত হয়েছিল। সামরিক অগ্রগতি—বিশেষ করে ড্রোনের ব্যবহার—একটি বৃহত্তর সংঘাতে পক্ষাবলম্বনের সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল।
কিন্তু এই নতুন ব্যাখ্যা ব্যাখ্যার চেয়ে বেশি বিকৃত করে। সুদানের পক্ষগুলো সাধারণ অর্থে প্রক্সি নয়। তারা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক যুক্তির মধ্যে থেকেই কাজ করে, যা বছরের পর বছর ধরে চলা অভ্যন্তরীণ বিভাজনের ফলে গঠিত হয়েছে। বাহ্যিক সমর্থন ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে, কিন্তু তা যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করে না।
কিন্তু, সুদান যখন বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক আখ্যানের অংশ হয়ে যায়, তখন অগ্রাধিকারগুলো বদলে যায়। প্রশ্নটা আর যুদ্ধ শেষ করার উপায় থাকে না। বরং প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়, এর পরিণতিগুলো কীভাবে সামাল দেওয়া যায়।
এই পরিবর্তনের পরিণতি রয়েছে, কারণ যে যুদ্ধ পরিচালিত হয়, তার সমাধান খুব কমই হয়।
অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা
সুদানের ভূ-রাজনৈতিক পুনর্গঠন যদি সংকটের একটি দিক হয়, তবে এর অর্থনৈতিক পরিণতি হলো আরেকটি দিক— এবং তা আরও দ্রুতগতিতে বাড়ছে।
ইরান যুদ্ধ বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট সৃষ্টি করেছে। প্রধান নৌপথ, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে সৃষ্ট বিঘ্নের কারণে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে; বিশ্বের তেল সরবরাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রণালী দিয়েই চলাচল করে।
দুর্বল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এটি কোনো দূরবর্তী সমস্যা নয়। এটি একটি তাৎক্ষণিক বিষয়। আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় সুদান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
দেশে জ্বালানির দাম নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। সমান্তরাল বাজারে, এক সপ্তাহেরও কম সময়ে পেট্রোলের দাম প্রতি গ্যালন প্রায় ১৮,০০০ সুদানি পাউন্ড (৩০ ডলার) থেকে বেড়ে প্রায় ৩০,০০০-এ পৌঁছেছে। এটি কোনো সামান্য বৃদ্ধি নয়; এটি এমন এক ধাক্কা যা দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে।
জ্বালানি পরিবহনকে চালিত করে। পরিবহন খাদ্য সরবরাহকে চালিত করে। খাদ্য সরবরাহ বেঁচে থাকাকে নির্ধারণ করে। যখন পরিবহন খরচ বাড়ে, খাদ্যের দামও বাড়ে। পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল ধীর হয়ে যায় বা ভেঙে পড়ে। সুদানে, যেখানে বেঁচে থাকা এবং ক্ষুধার মধ্যে ব্যবধান এমনিতেই সামান্য, সেখানে এই চাপগুলো বিধ্বংসী।
ওমদুরমান ও ওয়াদ মাদানির মতো শহরগুলোতে কিছু ব্যবসায়ী পুরোপুরি বিক্রিবাটা বন্ধ করে দিয়েছেন, কারণ প্রতিদিন পরিবর্তনশীল বাজারে তারা পণ্যের দাম নির্ধারণ করতে পারছেন না। কয়েক দিনের মধ্যেই ৫০ কেজি চিনির বস্তার দাম হাজার হাজার পাউন্ড বেড়ে গেছে, অন্যদিকে নির্মাণ সামগ্রীর দাম ৫০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকটগুলো এভাবেই উদ্ভূত হয়—একক ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ধারাবাহিক ব্যর্থতার শৃঙ্খল হিসেবে।
সুদানে মুদ্রাস্ফীতি আগে থেকেই মারাত্মক ছিল। সর্বশেষ ধাক্কাগুলোর আগেও, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৬ সালের শুরুতেই তা ৫৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। এখন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আমদানি ব্যাহত হওয়ায় জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয় সরকারি পরিসংখ্যানের চেয়ে অনেক দ্রুতগতিতে বাড়ছে।
আর জ্বালানি তো গল্পের একটি অংশ মাত্র। ইরান যুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত বৈশ্বিক বিশৃঙ্খলা সার, জাহাজ চলাচল এবং সরবরাহ শৃঙ্খলকেও প্রভাবিত করেছে। ফার্মেসিগুলো পুনরায় মজুত করতে হিমশিম খাওয়ায় ঔষধপত্র পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। সাধারণ মানুষের জন্য এর অর্থ হলো, একটি সাধারণ সংক্রমণ বা দীর্ঘস্থায়ী রোগও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।
প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া
সুদানের বর্তমান পরিস্থিতির কেন্দ্রস্থলে একটি বৈপরীত্য রয়েছে। দেশটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে — এবং মানবিক দিক থেকে কম দৃশ্যমান হয়েছে।
এটি বৃহত্তর সংঘাত, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনার আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। একই সময়ে, খোদ সুদানকে ঘিরে আলোচনায় বেসামরিক নাগরিকদের প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের জায়গা নিচ্ছে নিরাপত্তা, জোট ও কৌশলগত অবস্থান সম্পর্কিত আখ্যান।
এটা শুধু অবহেলা নয়, এটি এক ধরনের বিকৃতি। সুদানকে দেখা হচ্ছে, কিন্তু তার নিজস্ব শর্তে নয়।
এর পরিণতি ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান। মানবিক চাহিদা বরাদ্দের চেয়ে ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। দেশটির অর্থনৈতিক পতন আরও গভীর হচ্ছে। একটি বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অভাবে সশস্ত্র শক্তিগুলো ক্ষমতা সুসংহত করছে।
তা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াগুলো খণ্ডিতই রয়ে গেছে — কৌশলগত না হয়ে বরং প্রতিক্রিয়াশীল, যা অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার চেয়ে বাহ্যিক উদ্বেগ দ্বারা বেশি প্রভাবিত।
এই পরিস্থিতি যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা পাল্টে দেওয়া ততই কঠিন হয়ে পড়বে। সুদানের মতো সংঘাতগুলো সীমাবদ্ধ থাকে না। এগুলো অঞ্চলগুলোর রূপ বদলে দেয়, সীমান্ত পেরিয়ে বাস্তুচ্যুতি ঘটায় এবং সহিংসতার এমন ব্যবস্থা গেড়ে বসে যা যেকোনো একক যুদ্ধের চেয়েও বেশিদিন টিকে থাকে।
এটাকে উপেক্ষা করলে পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা আসে না। এতে কেবল সেই মুহূর্তটি বিলম্বিত হয়, যখন এর মূল্য অনিবার্য হয়ে ওঠে।
আজ সুদানের ট্র্যাজেডি শুধু এর দুর্ভোগের ব্যাপকতাই নয়, বরং সেই দুর্ভোগকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, সেটাও। যুদ্ধটিকে এখন আর প্রধানত সুদানের সংকট হিসেবে বোঝা হয় না। এটিকে বাহ্যিক সংঘাত, বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়।
এই প্রক্রিয়ায় বাস্তব পরিস্থিতি বিকৃত হয়ে যায়। আর এটাই বিপদ: কারণ যে সংকটকে উপেক্ষা করা হয়, তা পুনরায় আবিষ্কৃত হতে পারে, কিন্তু যে সংকটকে ভুল বোঝা হয়, তার মোকাবিলা শুরু থেকেই ভুল উপায়ে করা হয়।
গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার জন্য সুদানকে অন্য কারও যুদ্ধে জড়ানোর প্রয়োজন নেই। এটি ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন হলো, এর পরিণতি সুদানের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আগেই বিশ্ব তা উপলব্ধি করতে ইচ্ছুক কি না।
- ওসামা আবুজাইদ: খার্তুম-ভিত্তিক একজন উন্নয়ন ও শাসনব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ গবেষক। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

