ধর্ষণ বর্তমান সময়ে খুবই পরিচিত একটি শব্দ। পুলিশের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত যে সব শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে বেশিরভাগ ধর্ষকের কোনো শাস্তি বা বিচার হয়নি।
সাত বছর বয়সী রামিসা ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাটি সম্পর্কে আশা করি সবাই শুনেছেন। এখানে আশ্চর্যের বিষয় কী জানেন? চাঞ্চল্যকর, প্রমাণিত ধর্ষণ ও স্বীকারোক্তির পরও রিমান্ডের আদেশ দেন মহামান্য আদালত, ফলে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। বিচারের দীর্ঘসূত্রতার সুবিধা পায় আসামি। লজ্জা ও বিচার না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় ভোগে ভুক্তভোগী। তাই রামিসার বাবাকে আক্ষেপ করে বলতে হয়, “আপনারা আমার মেয়ের বিচার করতে পারবেন না। তাই আমি বিচার চাই না।” রামিসার বাবার বিচার-প্রতি অনীহামূলক বক্তব্য গোটা বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। রামিসার বাবার এই বক্তব্য পুলিশ বিভাগ ও সরকারের জন্য বেশ লজ্জার। এ যেন একজন সদ্য সন্তানহারা বাবার হতাশা, দুঃখ ও ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধির পেছনে সামাজিক সচেতনতার অভাব, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তে দুর্বলতা এবং কিছু ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের হয়রানি দায়ে। সবগুলো কারণ সমন্বিত করলে দায় রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়।
অদ্ভুত বিষয় কী জানেন? আলোচিত এ ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনাটির চব্বিশ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার আগেই বাংলাদেশের ভিন্ন ভিন্ন তিন জায়গায় আরও তিনটি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তার মধ্যে তিন বছর বয়সী একটি শিশুও রয়েছে।
চারপাশের এত ধর্ষণের কথা শুনে এখন মনে হয়, মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়াটাই সবচেয়ে বড় অপরাধ। আমাদের সমাজে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে যদি ধর্ষণের শিকার হয়, তাহলে সমাজ সেই ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। মেয়েটি নাকি অশালীন পোশাক পরত, উশৃঙ্খল জীবনযাপন করত। এহেন নানাবিধ কথা বলে যেন ধর্ষিতাকেই দায়ী করার এক অপচেষ্টা করা হয়। এক্ষেত্রে সবার কাছে একটাই প্রশ্ন—যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নিই, ধর্ষণের মতো ঘটনার জন্য সেই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েটি দায়ী, তাহলে রামিসার মতো অগণিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যার জন্য দায়ী কে? যাদের জীবন এখনো শুরুই হয়নি, যারা এখনো সমাজ, দেশ, আইন, bad touch-good touch সম্পর্কে জানতে বা বুঝতেই শেখেনি, তারা কেন ধর্ষণের শিকার হচ্ছে?
জনগণ ও সেসব অনিরাপদ শিশুর হতভাগা মা-বাবা, যাদের ফুলের মতো নিষ্পাপ সন্তান সমাজের কিছু নরপিশাচের লালসার শিকার হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে আমি জানতে চাই, আর কত রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হতে হবে?
এক সময় মেয়েরা ঘরের বাইরে নিরাপদ ছিল না। কিন্তু এখন মেয়েরা ঘরে বা ঘরের বাইরে কোথাও নিরাপদ নয়। হোক সেটা স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা কিংবা আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব বা প্রতিবেশীর কাছে। বর্তমানে প্রতিটি মেয়ে প্রতিমুহূর্তে ঘরে ও বাইরে সব পরিবেশেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কবে আমাদের এই দেশ ও সমাজে মেয়েদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল গড়ে উঠবে?
তাহমিদ জেরিন নুর
শিক্ষার্থী
স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ, আইন বিভাগ, নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

