একটি রাষ্ট্র কতটা সভ্য, মানবিক ও উন্নত—তার অন্যতম মানদণ্ড হলো সেই রাষ্ট্রে নারীরা কতটা নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের অসংখ্য নারী আজও পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন ও জনপরিসরে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন।
ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, ইভটিজিং, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য ও মানসিক নির্যাতনের মতো ঘটনা নিয়মিতই সামনে আসছে। এসব ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; বরং আমাদের সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিচারিক ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতারও প্রতিফলন।
বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, জনপরিসরে নারীদের একটি বড় অংশ নিজেদের নিরাপদ মনে করেন না। গণপরিবহনে অশোভন আচরণ, রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানি, কর্মক্ষেত্রে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামাজিকভাবে ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করার প্রবণতা নারীদের স্বাধীনভাবে চলাফেরা ও কাজ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে অনেক নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রেও অনিরাপদ বোধ করেন।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, নারীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা যে পরিবার, অনেক ক্ষেত্রেই সেটিও নিরাপদ নয়। পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং যৌতুক-সংক্রান্ত সহিংসতা এখনো সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিদ্যমান। অর্থাৎ নারীর নিরাপত্তাহীনতা কেবল জনপরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তরে বিস্তৃত।
এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ আইনের দুর্বল ও অসম প্রয়োগ। বাংলাদেশে নারীর সুরক্ষার জন্য একাধিক আইন রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (২০২০ সালের সংশোধনীসহ) অনুযায়ী ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। একই আইনে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং ধর্ষণের ফলে ভুক্তভোগীর মৃত্যু ঘটলে কঠোর শাস্তির বিধানও সংযোজিত হয়েছে। যৌতুক নিরোধ আইন, ২০১৮ যৌতুক দাবি, প্রদান ও গ্রহণকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০-এর মাধ্যমে নির্যাতিত নারী আদালতের কাছে সুরক্ষা আদেশ, বসবাসের অধিকার এবং অন্যান্য প্রতিকার চাইতে পারেন। পাশাপাশি পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ পর্নোগ্রাফি তৈরি, সংরক্ষণ, প্রকাশ, প্রচার ও বাণিজ্যকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন থাকলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয় না। অপরাধের তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, বিচারপ্রক্রিয়ার বিলম্ব, সাক্ষী সুরক্ষার দুর্বলতা এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কমিয়ে দেয়। ফলে অপরাধীরা অনেক সময় আইনের ভয় অনুভব করে না এবং ভুক্তভোগীরাও বিচার চাইতে নিরুৎসাহিত হন।
আইনের পাশাপাশি সামাজিক মানসিকতাও পরিবর্তন করা জরুরি। এখনও অনেক ক্ষেত্রে নারী নির্যাতনের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা কিংবা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়, অথচ অপরাধীর আচরণকে যথাযথভাবে বিচারের আওতায় আনা হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অন্যায় নয়, বরং অপরাধীদের পরোক্ষভাবে উৎসাহিত করে। নারীকে সম্মান করার শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত। ছেলে ও মেয়ে—উভয়কেই সমান মর্যাদা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে জনপরিসরে নিরাপত্তা জোরদার করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণপরিবহনে কার্যকর নজরদারি, পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা, দ্রুত অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা, জরুরি সহায়তা সেবা, নিরাপদ গণপরিবহন এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পকারখানায় নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বিদ্যমান নীতিমালা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি।
প্রতিবার কোনো আলোচিত ধর্ষণ, হত্যা বা নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ হয়, মানববন্ধন হয়, কঠোর শাস্তির দাবি ওঠে এবং দায়িত্বশীলদের আশ্বাসও শোনা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রতিবাদ স্তিমিত হয়ে যায়, বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের আগ্রহ কমে আসে। এতে ভুক্তভোগী ও তার পরিবার ন্যায়বিচার পেতে আরও অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা বিশেষ সুবিধা নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার এবং একটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাই শুধু নতুন আইন প্রণয়ন নয়, বিদ্যমান আইনের কার্যকর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, পরিবার এবং নাগরিক সমাজ—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
নারীরা আর কেবল আশ্বাস শুনতে চান না। তারা এমন একটি বাংলাদেশ চান, যেখানে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে নিরাপত্তার কথা ভেবে শঙ্কিত হতে হবে না; যেখানে কর্মস্থলে সম্মান নিয়ে কাজ করা যাবে; যেখানে পরিবার হবে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়; যেখানে অপরাধী শাস্তি পাবে এবং ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাবেন। একটি নিরাপদ, সমতাভিত্তিক ও মানবিক বাংলাদেশ গড়তে হলে নারীর নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।
তাহমিদ জেরির নূর
শিক্ষার্থী, স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষ, আইন
নটরডেম ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ
বি: দ্র: প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব; এর দায়ভার সিটিজেন্স ভয়েস কর্তৃপক্ষ বহন করে না এবং এটি পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নাও হতে পারে।

