বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আসর নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলা। প্রতি চার বছর পর এক মাসের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের কোটি কোটি মানুষ একই আবেগে যুক্ত হয়। ভাষা, ধর্ম, জাতিগত পরিচয় কিংবা ভৌগোলিক দূরত্ব—সব বিভেদ যেন সাময়িকভাবে পেছনে চলে যায়। একটি গোল, একটি জয় বা একটি হারকে ঘিরে একই সঙ্গে উল্লাস ও হতাশা ভাগাভাগি করেন অসংখ্য মানুষ। এই সম্মিলিত অনুভূতিই বিশ্বকাপকে অন্য সব ক্রীড়া প্রতিযোগিতা থেকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।
তবে এই আবেগ যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন খেলার সৌন্দর্যের বদলে সামনে আসে সহিংসতার চিত্র। সমর্থনের সীমা অতিক্রম করে অন্ধ উন্মাদনায় রূপ নিলে তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
সম্প্রতি সিলেটের জকিগঞ্জে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনেছে। বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার সময় চিৎকার করাকে কেন্দ্র করে দুই চাচাতো ভাইয়ের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং তর্ক প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নেয়। একপর্যায়ে একজনের ছুরিকাঘাতে অন্যজন নিহত হন। একটি ফুটবল ম্যাচকে কেন্দ্র করে এমন মর্মান্তিক পরিণতি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নয়। এটি আমাদের সামাজিক আচরণ, আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা এবং খেলাধুলাকে ঘিরে সাংস্কৃতিক পরিপক্বতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দেয়।
এ ধরনের ঘটনা অবশ্য শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়। ফুটবল ইতিহাসে সমর্থকদের সহিংসতার বহু নজির রয়েছে। ১৯৮৫ সালে বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনালের আগে গ্যালারিতে সংঘর্ষে ৩৯ জন প্রাণ হারান। ইংল্যান্ডে দীর্ঘ সময় ধরে ‘ফুটবল হুলিগানিজম’ একটি বড় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়েছিল। একইভাবে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে বিভিন্ন ক্লাবের উগ্র সমর্থক গোষ্ঠীর সংঘর্ষেও বহু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
এসব উদাহরণ দেখায়, ফুটবল একদিকে যেমন মানুষকে একত্রিত করার শক্তি রাখে, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ ও অসহিষ্ণুতা সেই খেলাকেই সহিংসতার কারণ করে তুলতে পারে। তাই বিশ্বকাপের উচ্ছ্বাস উদযাপনের পাশাপাশি পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সংযম বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কেন একটি ফুটবল ম্যাচ মানুষের আবেগকে এত গভীরভাবে নাড়া দেয়?
একটি ফুটবল ম্যাচকে ঘিরে মানুষ কেন এতটা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মনোবিজ্ঞানের দিকে তাকাতে হয়। মনোবিজ্ঞানী হেনরি তাজফেল ও জন টার্নারের সামাজিক পরিচয় তত্ত্ব (Social Identity Theory) অনুযায়ী, মানুষ নিজের পরিচয় শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, বরং বিভিন্ন গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবেও গড়ে তোলে। সেই গোষ্ঠী হতে পারে একটি দেশ, একটি ধর্ম, একটি রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা একটি ফুটবল দল। ফলে প্রিয় দলের সাফল্য অনেক সমর্থকের কাছে নিজের অর্জনের মতো মনে হয়, আর পরাজয় ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বা অপমানের অনুভূতি তৈরি করতে পারে।
এই কারণেই মাঠে খেলছেন ২২ জন ফুটবলার, কিন্তু মাঠের বাইরে বসে থাকা একজন সমর্থকের কাছে ম্যাচটি শুধু একটি খেলা থাকে না। অনেক সময় সেটি তার বিশ্বাস, পরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রতীক হয়ে ওঠে।
মার্কিন গবেষক রবার্ট সিয়ালদিনির গবেষণায়ও এই প্রবণতার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তিনি দেখিয়েছেন, প্রিয় দল জয়ী হলে সমর্থকেরা সাধারণত বলেন, ‘আমরা জিতেছি’। কিন্তু একই দল পরাজিত হলে অনেকেই বলেন, ‘ওরা হেরে গেছে’। মনোবিজ্ঞানে এই আচরণকে Basking in Reflected Glory (BIRG) বলা হয়। অর্থাৎ, অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে আত্মতৃপ্তি বা আত্মমর্যাদা বাড়ানোর প্রবণতা। বিপরীতে দল হারলে মানসিকভাবে সেই সম্পর্ক থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতাকে বলা হয় Cutting Off Reflected Failure (CORF)। এই দুটি ধারণাই দেখায়, খেলাধুলার প্রতি মানুষের আকর্ষণ শুধু বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ব্যক্তিগত পরিচয় ও আবেগের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই আবেগের একটি স্বতন্ত্র রূপ রয়েছে। বিশ্বকাপে বাংলাদেশ অংশ না নেওয়ায় অনেক সমর্থক নিজেদের পছন্দ, স্বপ্ন ও পরিচয়ের প্রতিফলন খুঁজে পান বিভিন্ন বিদেশি দলের মধ্যে। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সমর্থনের সংস্কৃতি এখন পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোটবেলা থেকেই পরিবারের প্রভাবেই একটি নির্দিষ্ট দলের প্রতি সমর্থন তৈরি হয়। ফলে খেলার সঙ্গে পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত গর্বও জড়িয়ে পড়ে।
তবে বিশ্বকাপের প্রকৃত সৌন্দর্য কোনো একটি দলের শিরোপা জয়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে একই আবেগে যুক্ত করার ক্ষমতা। ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের মানুষ একটি গোলের আনন্দ বা একটি নাটকীয় মুহূর্ত একসঙ্গে উদযাপন করেন—এটাই ফুটবলের বৈশ্বিক আবেদন।
সিলেটের সাম্প্রতিক মর্মান্তিক ঘটনাটি মনে করিয়ে দেয়, খেলার প্রতি ভালোবাসা কখনোই সহিংসতার কারণ হতে পারে না। আবেগ যদি যুক্তিবোধকে ছাপিয়ে যায়, তাহলে একটি ম্যাচের আনন্দও মুহূর্তে ট্র্যাজেডিতে পরিণত হতে পারে। একটি গোলের উল্লাস যদি শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারকে শোকের মধ্যে ঠেলে দেয়, তবে সেই ম্যাচে প্রকৃত অর্থে কোনো পক্ষই জয়ী হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ।
খেলাকে ঘিরে মানুষের আবেগ গঠনে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। একসময় ফুটবল নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকত পাড়ার আড্ডা বা চায়ের দোকানে। এখন সেই আলোচনা স্থান পেয়েছে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। সেখানে মতবিনিময়ের পাশাপাশি তর্ক-বিতর্কও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এমন বিষয়বস্তুকেই বেশি মানুষের সামনে নিয়ে আসে। ফলে বিদ্রূপ, কটাক্ষ, অপমান কিংবা বিদ্বেষমূলক ভাষা অনেক সময় সুস্থ আলোচনাকে ছাপিয়ে যায়। এর প্রভাব শুধু ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বাস্তব সম্পর্কেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাংলাদেশের ক্রীড়া সংস্কৃতির দিকটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দর্শক হিসেবে ফুটবলের প্রতি মানুষের আগ্রহ ব্যাপক হলেও খেলাধুলায় অংশগ্রহণ এবং ক্রীড়া মূল্যবোধের চর্চা তুলনামূলকভাবে সীমিত। জয়-পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করা, প্রতিপক্ষকে সম্মান করা এবং নিয়ম মেনে প্রতিযোগিতা করার মতো স্পোর্টসম্যানশিপের শিক্ষা সমাজে আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। আবেগ থাকাই স্বাভাবিক, তবে সেই আবেগকে ইতিবাচকভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সামাজিক চর্চাও সমান জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানসিক চাপ, হতাশা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মানুষের আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে। খেলার মতো উচ্চ আবেগপূর্ণ পরিবেশে এই প্রভাব আরও তীব্র হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। অবশ্য অধিকাংশ মানুষ খেলাধুলা সুস্থ ও আনন্দময় পরিবেশেই উপভোগ করেন। তবে যাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে সামান্য উসকানিও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার কারণ হতে পারে। তাই বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আসরকে ঘিরে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, মানুষের আচরণ ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
আরও একটি বিষয় ভাবনার দাবি রাখে। যেসব বিদেশি দলকে ঘিরে বাংলাদেশে প্রবল সমর্থন দেখা যায়, সেই দলগুলোর খেলোয়াড়েরা ম্যাচ শেষে প্রায়ই একে অপরকে শুভেচ্ছা জানান, আলিঙ্গন করেন, জার্সি বিনিময় করেন এবং প্রতিপক্ষের প্রশংসা করেন। মাঠে তারা প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও মাঠের বাইরে পেশাদার সহকর্মী। অথচ অনেক সময় হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থাকা কিছু সমর্থকের আচরণে এমন ধারণা তৈরি হয়, যেন ভিন্ন দলকে সমর্থন করাই বিরোধের কারণ। এই বৈপরীত্য স্পষ্ট করে যে সমস্যার মূল ফুটবল নয়; বরং আমাদের আবেগ প্রকাশ ও নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিতে।
তাই সমাধানও সামাজিক পর্যায়েই খুঁজতে হবে। পরিবারে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে যে খেলাধুলার মূল উদ্দেশ্য আনন্দ, শত্রুতা নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া শিক্ষার পাশাপাশি স্পোর্টসম্যানশিপ, সহনশীলতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। গণমাধ্যমেরও উচিত উত্তেজনা বাড়ানোর পরিবর্তে ইতিবাচক ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখা। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা ও উসকানিমূলক বিষয়বস্তুর বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে কোনো অপরাধকে আবেগের অজুহাতে গ্রহণযোগ্য মনে না করা হয়।
বিশ্বকাপের প্রকৃত সৌন্দর্য কোনো একটি দলের শিরোপা জয়ে নয়; বরং বিশ্বের নানা প্রান্তের মানুষকে একই আনন্দে যুক্ত করার ক্ষমতায়। ফুটবল ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি ও জাতির মানুষকে এক মঞ্চে নিয়ে আসে। এটাই এই খেলার সবচেয়ে বড় শক্তি।
সিলেটের মর্মান্তিক ঘটনাটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, নিয়ন্ত্রণহীন আবেগ কখনোই খেলাধুলার চেতনাকে প্রতিনিধিত্ব করে না। একটি ম্যাচের উচ্ছ্বাস যদি শেষ পর্যন্ত একটি পরিবারকে শোকে ডুবিয়ে দেয়, তবে সেখানে প্রকৃত অর্থে কেউ বিজয়ী হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। বিশ্বকাপ শেষ হবে, নতুন চ্যাম্পিয়ন আসবে, নতুন তারকার আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু সমাজে যদি সহনশীলতা, আত্মসংযম ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের চর্চা জোরদার না হয়, তাহলে একই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
খেলার প্রকৃত সাফল্য তখনই অর্জিত হবে, যখন ভিন্ন দলের সমর্থকরাও পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় রেখে একসঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারবেন। প্রতিযোগিতা খেলাধুলার স্বাভাবিক অংশ, কিন্তু মানবিকতা ও সহনশীলতাই একটি সমাজকে সত্যিকার অর্থে এগিয়ে নিয়ে যায়। সূত্র: জাগো নিউজ

