বাংলাদেশে বর্ষাকাল আর বন্যা নতুন কোনো বাস্তবতা নয়। নদীবেষ্টিত এই দেশের ইতিহাস ও জীবনযাত্রার সঙ্গে বন্যার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তবে ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বন্যা শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে নয়, দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামোর সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। এ অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন কেবল জনজীবনের ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।
প্রতিবারের মতো এবারও বন্যার সবচেয়ে বড় আঘাত নেমে এসেছে মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারে পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও প্রাণহানির খবর এসেছে। কয়েক লাখ পরিবার পানিবন্দী হয়েছে, বহু মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিজমি, বসতবাড়ি এবং সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তবে এবারের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল রাজধানী ঢাকার অচলাবস্থা। কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণেই ধানমন্ডি, মিরপুর, মালিবাগ, মৌচাক, মতিঝিল, কারওয়ান বাজার থেকে শুরু করে পুরান ঢাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়। দীর্ঘ যানজটে আটকে পড়েন কর্মজীবী মানুষ, গণপরিবহন চলাচল ব্যাহত হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটে।
এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর শুধু হাওরাঞ্চল, নদীতীর বা পাহাড়ি এলাকার সমস্যা নয়। দেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কেন্দ্রও একই ধরনের ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে। ফলে বন্যার প্রভাব এখন উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, পরিবহন এবং নগর অর্থনীতির ওপরও সরাসরি পড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু বন্যা নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং এমন একটি সহনশীল অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা, যা দুর্যোগের ধাক্কা সামলে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সক্ষম হবে। এমন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বন্যায় কৃষক সর্বস্ব হারিয়ে না ফেলেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য না হন, একটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে এবং অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই রাজধানীর স্বাভাবিক কার্যক্রম থমকে না যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বন্যাকে শুধু একটি মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে। এখন এটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, অবকাঠামো নির্মাণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত চ্যালেঞ্জ। তাই দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি টেকসই ও সহনশীল অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক প্রস্তুতিকে সমান গুরুত্ব দেওয়াই সময়ের দাবি।
জুলাইয়ের বন্যা শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্র তুলে ধরেনি; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের নতুন বাস্তবতাও স্পষ্ট করেছে। এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একই সময়ে সিলেটে উজানের ঢল, পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমিধস, কক্সবাজারে অতিবৃষ্টি এবং ঢাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ নদীভাঙন, আকস্মিক বন্যা, অতিবৃষ্টি, নগর জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধস—এসবকে আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো একই জলবায়ুগত সংকটের বিভিন্ন রূপ।
তবে এই পরিস্থিতির জন্য শুধু প্রকৃতিকে দায়ী করলেই বাস্তব চিত্র পূর্ণ হয় না। দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে দেশের বহু নদী, খাল ও জলাভূমি ভরাট হয়েছে। শহরের প্রাকৃতিক জলাধার কমে গেছে, পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে বসতি, সংকুচিত হয়েছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এবং অনেক এলাকায় পরিকল্পনাহীনভাবে বিস্তৃত হয়েছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি বা উজান থেকে নেমে আসা ঢল স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশনের সুযোগ না পেয়ে জনবসতি, সড়ক, বাজার ও শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্যও এই পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সংস্থাটির হিসাবে, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর বিভিন্ন স্থানে পানি বিপৎসীমার ওপরে প্রবাহিত হয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া ভারতের মেঘালয়, ত্রিপুরা ও আসাম অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে উজানের ঢল আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট, বাংলাদেশের বন্যা এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের ফল নয়। আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকার প্রবাহ এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
বন্যার ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সাধারণত কত মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, কত ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে, কত কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিংবা কত ফসল নষ্ট হয়েছে—এসব পরিসংখ্যানই আলোচনায় আসে। কিন্তু এর বাইরেও এমন অনেক ক্ষতি রয়েছে, যা চোখে দেখা যায় না, অথচ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর তার প্রভাব অনেক বেশি।
একজন কৃষক যখন জমিতে বীজ বপন করেন, তখন তিনি শুধু একটি ফসল উৎপাদনের চেষ্টা করেন না; নিজের সঞ্চয়, শ্রম, ঋণ এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশাও সেই জমিতে বিনিয়োগ করেন। একইভাবে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পণ্য কিনতে ঋণ নেন, মাছচাষি পোনা ও খাদ্যে পুঁজি ব্যয় করেন, আর দিনমজুর বা রিকশাচালক প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করে পরিবারের জীবনযাত্রা চালান। বন্যা এলে শুধু তাদের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ভবিষ্যতের আয়ের উৎসও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
এই কারণেই বন্যার প্রকৃত ক্ষতি কেবল আর্থিক পরিমাণ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। এটি মানুষের উৎপাদনক্ষমতা কমিয়ে দেয়, সঞ্চয় নিঃশেষ করে, ঋণের চাপ বাড়ায় এবং দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার পথকে আরও কঠিন করে তোলে। অর্থনীতির ভাষায় এগুলোকে অদৃশ্য বা পরোক্ষ ক্ষতি বলা হয়—যার প্রতিফলন জাতীয় আয়ের হিসাব বা সরকারি পরিসংখ্যানে সব সময় স্পষ্টভাবে দেখা যায় না, কিন্তু যার প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিকে বহন করতে হয়।
গত দুই দশকে বাংলাদেশ ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নজির স্থাপন করেছে। তবে জুলাই ২০২৬-এর বন্যা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বর্তমান প্রবৃদ্ধির ভিত্তি কতটা জলবায়ু-সহনশীল? যদি কয়েক দিনের দুর্যোগেই কৃষি, পর্যটন, সরবরাহব্যবস্থা, নগর অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকা একযোগে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে উন্নয়নের বিদ্যমান কাঠামো নতুনভাবে মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
এই প্রশ্নের উত্তরই ভবিষ্যতের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পথরেখা নির্ধারণ করবে। উন্নয়নের গতি ধরে রাখার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম একটি স্থিতিস্থাপক অর্থনীতি গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন খাতের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বন্দর, পর্যটন ও নগর অর্থনীতি একটি সমন্বিত সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে সিলেটের হাওরাঞ্চল বা বান্দরবানের কোনো পাহাড়ি সড়কে সৃষ্ট বিপর্যয়ের প্রভাব খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকার বাজার, গাজীপুরের শিল্পকারখানা কিংবা চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে পৌঁছে যেতে পারে। এ কারণেই জুলাইয়ের বন্যাকে কেবল একটি আঞ্চলিক দুর্যোগ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলা একটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ধাক্কা হিসেবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
এই ধাক্কার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে কৃষি খাতে। ক্ষতির হিসাব সাধারণত প্লাবিত জমির পরিমাণ বা নষ্ট হওয়া ফসলের পরিমাণে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু কৃষি অর্থনীতির প্রকৃত ক্ষতি এর চেয়ে অনেক গভীর। একটি মৌসুমের ফসল হারিয়ে যাওয়ার অর্থ শুধু উৎপাদন কমে যাওয়া নয়; কৃষকের পুরো বিনিয়োগই ঝুঁকির মুখে পড়া। বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক, শ্রমিকের মজুরি এবং জমি প্রস্তুতের পেছনে যে অর্থ ব্যয় হয়, তার বড় অংশই আসে ঋণ থেকে। বন্যার পর ফসল নষ্ট হয়ে গেলেও সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায় কিন্তু থেকে যায়। আর সেখান থেকেই শুরু হয় দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের চক্র।
কৃষি খাতে ক্ষতির প্রভাব কখনোই শুধু কৃষকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একজন কৃষকের আয় কমে গেলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতিতে। স্থানীয় বাজারে কেনাকাটা কমে, কৃষিযন্ত্র ও কৃষি উপকরণের বিক্রি হ্রাস পায়, পরিবহন ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ে। অর্থনীতিতে এই ধারাবাহিক প্রভাবকে মাল্টিপ্লায়ার ইফেক্ট বলা হয়, যেখানে একটি খাতের সংকট ধীরে ধীরে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
এই বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট হাওরাঞ্চলে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার শুধু বন্যাপ্রবণ জেলা নয়; দেশের খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রেও এ অঞ্চলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। যদি এসব এলাকার কৃষকেরা ধারাবাহিকভাবে একাধিক মৌসুমে ক্ষতির মুখে পড়েন, তবে তার প্রভাব স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে না; জাতীয় খাদ্য সরবরাহ ও বাজার ব্যবস্থাও চাপে পড়বে। ফলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বন্যার প্রভাব কৃষির পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। প্লাবিত এলাকায় পুকুরের মাছ ভেসে যায়, হ্যাচারির কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর ক্ষতি হয়। এসব ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অনেক ক্ষেত্রেই কয়েক মাস সময় লাগে। এর ফলে বাজারে সরবরাহ কমে যায় এবং মাছ, মাংসসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।
দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি আবার কিছুটা ভিন্ন। চট্টগ্রাম, বান্দরবান ও কক্সবাজারে বন্যার পাশাপাশি ভূমিধসও বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। কোনো পাহাড়ি সড়ক ধসে গেলে শুধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় না; কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছাতে দেরি হয়, পর্যটন কার্যক্রম থমকে যায় এবং স্থানীয় ব্যবসা ক্ষতির মুখে পড়ে। বিশেষ করে কক্সবাজারে কয়েক দিনের প্রতিকূল আবহাওয়াই হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহনসেবা এবং সৈকতনির্ভর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আয়ে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। তবে এই ধরনের ক্ষতির অনেকটাই সরকারি পরিসংখ্যানে আলাদাভাবে প্রতিফলিত হয় না।
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের পরিস্থিতিও এই সংকটকে আরও জটিল করে তোলে। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি শুধু প্রাণহানির আশঙ্কাই বাড়ায় না, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা ও আশ্রয় ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে সরকারকে যেমন অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়, তেমনি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তার প্রয়োজনও বেড়ে যায়। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ এভাবেই মানবিক, অর্থনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা—তিনটি ক্ষেত্রেই নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।
তবে এবারের বন্যায় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চাপ দেখা গেছে সরবরাহব্যবস্থায়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম সড়কপথ। কোনো গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক বা আঞ্চলিক সড়ক প্লাবিত হলে কৃষিপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পরিবহন ব্যাহত হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, বাজারে পণ্য পৌঁছাতে বিলম্ব হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ ভোক্তাদের ওপর গিয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা–চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক করিডোরের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দেশের অধিকাংশ বৈদেশিক বাণিজ্য চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে এই করিডোরে সামান্য বিঘ্নও শিল্প উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি এবং রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য সময়মতো কাঁচামাল সরবরাহ এবং প্রস্তুত পণ্য বন্দরে পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এখন শুধু কম খরচে উৎপাদন নয়, নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
সরবরাহব্যবস্থার এই বিঘ্নের সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারমূল্যে। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে, পরিবহন ব্যয় বেড়ে গেলে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল দুর্বল হয়ে পড়লে চাল, শাকসবজি, মাছ, ডিমসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। তাই মূল্যস্ফীতি শুধু বাজার ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়; এটি জলবায়ুজনিত ঝুঁকিরও একটি অর্থনৈতিক প্রতিফলন। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দুর্যোগ-সহনশীল সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জুলাইয়ের বন্যা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা সামনে এনেছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি আকারে বড় হলেও এর ভিত্তি এখনো পর্যাপ্তভাবে জলবায়ু-সহনশীল নয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেমন বেড়েছে, তেমনি সেই প্রবৃদ্ধিকে টিকিয়ে রাখার সক্ষমতা একই গতিতে বাড়েনি। এই বৈষম্য দূর করা না গেলে ভবিষ্যতের প্রতিটি বড় বন্যাই শুধু মানুষের জীবন-জীবিকাই নয়, দেশের উন্নয়নের ধারাকেও বারবার বাধাগ্রস্ত করবে।
এ অভিজ্ঞতা আরও স্পষ্ট করেছে যে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন পরিকল্পনাকে আর আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় বন্যা, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও ভূমিধস উন্নয়ন পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সড়ক, বন্দর, শিল্পাঞ্চল, আবাসন, কৃষি কিংবা নগর উন্নয়ন—প্রতিটি খাতেই জলবায়ু ঝুঁকি মূল্যায়নকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। অন্যথায় আজকের উন্নয়ন ভবিষ্যতে নতুন সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ অবকাঠামো উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে নতুন প্রশ্ন হলো, নির্মিত অবকাঠামো ভবিষ্যতের জলবায়ুগত ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা প্রস্তুত? ঢাকার সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতা দেখিয়েছে, শুধু ড্রেন নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ, খাল পুনরুদ্ধার এবং বৃষ্টির পানি ধারণের সক্ষমতা বাড়ানোও সমান জরুরি। একইভাবে সড়ক নির্মাণের সময় নদী ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহের পথ বিবেচনায় না নিলে সেই অবকাঠামোই ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতায় জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোর গুরুত্ব আরও বেড়েছে। একটি সড়ক, সেতু বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার মূল্য শুধু নির্মাণ ব্যয়ে নয়; বরং ভবিষ্যতে সম্ভাব্য ক্ষতি কতটা কমাতে পারবে, সেটিই এখন বড় বিবেচ্য বিষয়। তাই জলবায়ু অভিযোজনে ব্যয়কে অতিরিক্ত খরচ নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুরক্ষার জন্য একটি প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত।
একই সঙ্গে কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য আর্থিক সুরক্ষা জোরদার করাও জরুরি। বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে বড় আর্থিক ঝুঁকি বহন করেন কৃষক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই। একটি বন্যায় ফসল বা ব্যবসার পুঁজি নষ্ট হলে তাদের সঞ্চয় শেষ হয়ে যায়, ঋণের বোঝা বাড়ে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সহায়তায় ফসল বীমা, আবহাওয়াভিত্তিক ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার তহবিল গড়ে তোলার বিষয়টি এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলছে, জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও প্রতিরোধমূলক বিনিয়োগই বেশি কার্যকর। নেদারল্যান্ডস বন্যা নিয়ন্ত্রণে নদীকে কৃত্রিমভাবে সংকুচিত করার পরিবর্তে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য অতিরিক্ত স্থান সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে কেনিয়া ও ফিলিপাইনে আবহাওয়াভিত্তিক কৃষি বীমা চালুর মাধ্যমে দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। এসব উদ্যোগ দেখায়, জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় পরিকল্পনা, প্রযুক্তি এবং আর্থিক সুরক্ষা—তিনটি বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হয়।
বাংলাদেশেও দীর্ঘমেয়াদি জলব্যবস্থাপনা ও অভিযোজনের লক্ষ্য নিয়ে ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে এই পরিকল্পনার প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এটি কতটা কার্যকরভাবে উন্নয়ন প্রকল্প, বাজেট বরাদ্দ এবং স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করা যায় তার ওপর। পরিকল্পনা কাগজে সীমাবদ্ধ থাকলে প্রত্যাশিত ফল অর্জন করা কঠিন হবে।
তবে অবকাঠামো বা নীতিমালার পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি পরিবর্তনটি প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গিতে। বাংলাদেশে বন্যাকে এখনো অনেকাংশে একটি তাৎক্ষণিক দুর্যোগ হিসেবে দেখা হয়, যেখানে প্রধান গুরুত্ব থাকে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসনে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান বাস্তবতায় বন্যা একটি পুনরাবৃত্ত অর্থনৈতিক ঝুঁকি, যা উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং বাজারব্যবস্থাকে নিয়মিতভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তাই উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতিটি স্তরে এই ঝুঁকিকে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জুলাইয়ের বন্যা হয়তো সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম থেকে সরে যাবে। পানি নেমে যাবে, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত হবে, ব্যবসা-বাণিজ্য আবার স্বাভাবিক গতিতে ফিরবে এবং মানুষও দৈনন্দিন জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে যাবে—এই অভিজ্ঞতা থেকে কি আমরা ভবিষ্যতের জন্য কার্যকর শিক্ষা নিতে পারব, নাকি আগামী বর্ষায় আবারও একই ধরনের সংকটের পুনরাবৃত্তি ঘটবে?
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ বন্যাকে পুরোপুরি থামিয়ে দেওয়া নয়। বরং এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যা দুর্যোগের ধাক্কা সামলেও দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে। এমন একটি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে কৃষকের একটি মৌসুমের ক্ষতি তাকে চরম আর্থিক সংকটে ফেলবে না, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে হবে না, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক বা মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়বে না এবং কয়েক ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে রাজধানীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থমকে যাবে না।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রকৃত সাফল্য কেবল উৎপাদন, আয় বা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে নয়; বরং সেই প্রবৃদ্ধি কতটা জলবায়ুজনিত ঝুঁকি সহ্য করে টিকে থাকতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বন্যা আবারও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হবে এমন এক অর্থনীতি, যা একই সঙ্গে উৎপাদনশীল, অভিযোজনক্ষম এবং জলবায়ু-সহনশীল।
লেখক: ড. মতিউর রহমান,গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।

