বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি তৈরি পোশাক শিল্প। দীর্ঘদিন ধরে দেশের রফতানি আয়ের বড় অংশ এসেছে এই খাত থেকে। লাখো মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা এই শিল্প এখন এক কঠিন সময় পার করছে। রফতানি কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার কারণে পোশাক খাতের সামনে তৈরি হয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ।
শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সংকট কোনো একক সমস্যার ফল নয়। জ্বালানি সংকট, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা, কাঁচামাল আমদানিতে জটিলতা, শ্রম পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক বাজারের চাপ—সবকিছু মিলেই তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি। এখন প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর নীতিগত সংস্কার।
বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাত থেকে আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭০ কোটি ডলার। আগের অর্থবছরের তুলনায় এই আয় কমেছে ১ দশমিক ৬৪ শতাংশ। ২০২৫ অর্থবছরে এ খাতের রফতানি আয় ছিল ৩ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, এই পতন শুধু একটি সংখ্যার পরিবর্তন নয়। এর প্রভাব পড়ছে শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা, কর্মসংস্থান এবং উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতার ওপর।
বন্ধ হচ্ছে কারখানা, কমছে কর্মসংস্থান:
পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে কারখানা বন্ধ ও শ্রমিকদের কর্মহীন হয়ে পড়া। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ১৫ মাসে ১১৩টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় ৯৬ হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।
একই সময়ে ১২৮টি নতুন কারখানা চালু হলেও এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থানের সুযোগ তুলনামূলক কম থাকায় আগের ক্ষতি পুরোপুরি পূরণ হয়নি। ফলে ২২ হাজারের বেশি মানুষ জীবিকার সংকটে পড়েছেন। এছাড়া ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত আরও ৩০টির বেশি কারখানা উৎপাদন বন্ধ করেছে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু ছয় মাসে বন্ধ হয়েছে ২৭টি পোশাক কারখানা।
শিল্প মালিকদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ, অর্ডার কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।
পোশাক শিল্পের বর্তমান সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে জ্বালানি সংকট। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি শিল্প উৎপাদনের বড় প্রতিবন্ধক হয়ে রয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানা তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে গড়ে ওঠা অনেক শিল্প ইউনিটও গ্যাস সংযোগের অভাবে উৎপাদনে যেতে পারছে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ ও লোডশেডিং। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে খরচ এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়ে তৈরি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। শুধু পোশাক কারখানাই নয়, এর প্রভাব পড়ছে সুতা, কাপড়, ডায়িং এবং অন্যান্য সহায়ক শিল্পেও। ফলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে।
শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, কাস্টমস প্রক্রিয়ার জটিলতা, বন্ড সুবিধা পেতে দীর্ঘসূত্রতা এবং এইচএস কোড সংক্রান্ত সমস্যার কারণে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে যেখানে দ্রুত পণ্য সরবরাহ গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে এসব জটিলতা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
পোশাক শিল্পের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে ব্যাংক খাতের অস্থিরতা ও তারল্য সংকট। বিশেষ করে একীভূত হওয়া ব্যাংকগুলোর গ্রাহক হিসেবে থাকা অনেক পোশাক কারখানা অর্থ সংকটে পড়েছে। পর্যাপ্ত তারল্য না থাকায় সময়মতো ঋণপত্র (এলসি) খোলা যাচ্ছে না। ফলে কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব হচ্ছে, উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং ক্রেতার নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্পের রফতানি সক্ষমতা ও ব্যবসার ধারাবাহিকতার ওপর।
সরকারের ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিল:
সংকটে থাকা পোশাক শিল্পকে সহায়তা দিতে সরকারের ঘোষিত ২০ হাজার কোটি টাকার তহবিলকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন শিল্পসংশ্লিষ্টরা। এই অর্থ বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানা চালু করা এবং ঝুঁকিতে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে সহায়তা করতে পারে। তবে এই তহবিল যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে এবং অপব্যবহার না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আর্থিক সহায়তা দিয়ে পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধান সম্ভব নয়। উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত না করলে সাময়িক সহায়তা স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।
শিল্প খাতকে টেকসই করতে হলে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। শুধু আমদানিনির্ভর এলএনজির ওপর নির্ভর না করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য প্রয়োজন সহায়ক নীতি ও বিনিয়োগ। বিশেষ করে শিল্প কারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সহজ অর্থায়ন, প্রণোদনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ খাতে জ্বালানি ব্যয় কমানো সম্ভব।
প্রয়োজন সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ:
পোশাক শিল্পকে ঘুরে দাঁড় করাতে আগামী পাঁচ থেকে ১০ বছরের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক জাতীয় পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই পরিকল্পনায় শিল্প মালিক, শ্রমিক প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, পরিবহন খাতের প্রতিনিধি এবং নীতিনির্ধারকদের যুক্ত করে একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পে অস্থিরতা তৈরি হয়—এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে কঠিন এক সময় পার করছে। রফতানি কমছে, কারখানা বন্ধ হচ্ছে, উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। তবে সঠিক নীতি, সময়োপযোগী সংস্কার এবং সরকার, উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের সমন্বিত উদ্যোগ থাকলে এই শিল্প আবারও শক্ত অবস্থানে ফিরতে পারে। কারণ পোশাক শিল্পের পুনরুদ্ধার শুধু একটি খাতের সাফল্যের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের রফতানি আয়, কর্মসংস্থান এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান।
- আশিকুর রহমান তুহিন: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, টেড গ্রুপ ও সাবেক পরিচালক, বিজিএমইএ।

