শহরের ব্যস্ত সড়কে প্রতিদিনই দেখা যায় একই দৃশ্য। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা সাইকেল বা মোটরসাইকেল, পিঠে নির্দিষ্ট কোম্পানির রঙের ব্যাগ, হাতে স্মার্টফোন। অর্ডারের সংকেত এলেই ছুটতে হয় এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। রোদ, বৃষ্টি কিংবা যানজট—কোনোটিই থামাতে পারে না এই কর্মীদের।
কিন্তু এই কর্মীদের পরিচয় কী? তারা কি কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মী, নাকি স্বাধীনভাবে কাজ করা ব্যক্তি—এই প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে প্রচলিত শ্রম আইনের সঙ্গে বাস্তবতার একটি বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। একজন ডেলিভারি কর্মী বা রাইডার কোম্পানির অ্যাপ ব্যবহার করেন, নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কাজ করেন এবং প্রতিষ্ঠানের সেবার অংশ হিসেবে গ্রাহকের কাছে পণ্য পৌঁছে দেন। কিন্তু আইনি কাঠামোয় দীর্ঘদিন তাদের অবস্থান স্পষ্ট ছিল না।
অনেক প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠান তাদের সঙ্গে ‘পার্টনার’ বা ‘রাইডার’ হিসেবে সম্পর্কের কথা বলেছে। এর ফলে তারা প্রচলিত অর্থে কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত হবেন কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে বিতর্ক।
পুরোনো শ্রম আইনে নতুন বাস্তবতার চ্যালেঞ্জ:
বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ প্রণয়নের সময় দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশ ছিল প্রচলিত শিল্প ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। যেখানে ছিল নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা, কর্মস্থল এবং চাকরির আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের কর্মসংস্থান। রাইড শেয়ারিং, খাবার ও পণ্য সরবরাহকারী প্ল্যাটফর্মগুলোতে কাজ করা মানুষের সংখ্যা বাড়লেও তাদের শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কাজের ধরন প্রচলিত চাকরির কাঠামো থেকে ভিন্ন হওয়ায় তাদের অধিকার নির্ধারণে নতুন নীতিমালা ও ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত যুক্তি দেয়, তারা সরাসরি কর্মসংস্থান তৈরি করে না; বরং প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহক ও সেবাদাতার মধ্যে সংযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর বক্তব্য, যদি কোনো ব্যক্তি একটি প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট অ্যাপ, নিয়ম, মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা ও কর্মপদ্ধতির ওপর নির্ভর করে কাজ করেন, তাহলে তার শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কারণ বাস্তবে অনেক রাইডার বা ডেলিভারি কর্মীর আয় নির্ভর করে প্ল্যাটফর্মের নিয়ম, অ্যালগরিদম ও কাজের সুযোগের ওপর। কোনো কারণে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে গেলে তাদের আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে শ্রম আইনে প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে নতুন এই স্বীকৃতি কীভাবে কার্যকর হবে, তাদের অধিকার ও দায়িত্ব কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব বিষয় এখনো স্পষ্ট ব্যাখ্যার অপেক্ষায় রয়েছে। শ্রম বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু পরিচয় পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন হবে এমন একটি কাঠামো, যেখানে কর্মীদের আয়, নিরাপত্তা, দুর্ঘটনাজনিত সুরক্ষা এবং ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা যায়।
ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের ধরনও বদলাচ্ছে। এখন বড় প্রশ্ন হলো—প্রযুক্তির এই নতুন কর্মক্ষেত্রে যারা শ্রম দিচ্ছেন, তাদের অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে। কারণ একটি ব্যাগ, একটি অ্যাপ কিংবা একটি পরিচয়পত্র নয়—একজন কর্মীর প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ করে তার শ্রম ও সেই শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া অধিকার।
সিদ্ধান্ত নেয় অ্যালগরিদম, ঝুঁকি বহন করেন রাইডাররা:
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এখানে নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় দৃশ্যমান কোনো ব্যক্তির হাতে থাকে না। একজন রাইডার বা ডেলিভারি কর্মীর কাজের গতি, আয় এবং সুযোগ অনেকটাই নির্ভর করে একটি অদৃশ্য প্রযুক্তি ব্যবস্থার ওপর, যাকে বলা হয় অ্যালগরিদম।
এই অ্যালগরিদম নির্ধারণ করে কোন কর্মী কত বেশি অর্ডার পাবেন, কত দ্রুত কাজ সম্পন্ন করছেন, গ্রাহকের কাছ থেকে কেমন মূল্যায়ন পাচ্ছেন এবং তার পারফরম্যান্স কেমন। অর্থাৎ প্রচলিত কর্মক্ষেত্রে যে দায়িত্ব একজন ব্যবস্থাপক বা তদারককারী পালন করেন, অনেক ক্ষেত্রে সেই ভূমিকা পালন করে প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থা। রেটিং কমে গেলে কমতে পারে কাজের সুযোগ। অর্ডার কমলে কমে আয়। আবার নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ না হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মীর অ্যাকাউন্ট সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়ার ঘটনাও দেখা যায়।
শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত চাকরির ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হলে কর্মী সাধারণত নিয়োগকর্তার কাছে অভিযোগ জানাতে পারেন। কিন্তু অ্যালগরিদমনির্ভর ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে। ফলে কর্মীদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ ও প্রতিকার পাওয়ার পথ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজের বাস্তবতা বোঝাতে শ্রম গবেষকদের অনেকেই একটি বিষয় তুলে ধরেন—এই ব্যবস্থায় ঝুঁকির বড় অংশ বহন করেন কর্মীরাই। খাদ্য বা পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে পণ্যের মান, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা বা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে রাইডারের ভূমিকা সীমিত। কিন্তু গ্রাহকের অসন্তোষের প্রভাব অনেক সময় এসে পড়ে তার ওপর। শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর পর্যবেক্ষণ, অনেক কর্মী নিজেদের আয় ধরে রাখতে বাধ্য হয়ে এমন পরিস্থিতির মধ্যেও কাজ চালিয়ে যান, যেখানে তাদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক শ্রম নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্ন গবেষণা হয়েছে। Oxford Internet Institute পরিচালিত Fairwork গবেষণায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের কাজের পরিবেশ, ন্যায্য মজুরি, নিরাপত্তা ও অধিকার মূল্যায়ন করা হয়।
তাদের বাংলাদেশের মূল্যায়নগুলোতে দেখা গেছে, অনেক প্ল্যাটফর্ম কর্মীর ক্ষেত্রে ন্যায্য আয়, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মপরিবেশ নিয়ে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গবেষণায় বিশেষ করে কর্মীদের প্রকৃত আয় হিসাবের ক্ষেত্রে জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য খরচ বাদ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে অর্থাৎ একজন রাইডার যে অর্থ আয় করেন, তার একটি অংশ আবার কাজের খরচ হিসেবেই চলে যায়। ফলে হাতে থাকা প্রকৃত আয় অনেক কমে যেতে পারে।
প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দ্রুত সেবা বিস্তারের সুযোগ দিয়েছে। একই সঙ্গে তৈরি করেছে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও। তবে এই নতুন কর্মব্যবস্থায় কর্মীদের অধিকার, দায়িত্ব এবং নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এ নিয়ে বিতর্ক এখনো চলমান।
একদিকে প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে শ্রম সম্পর্কের নতুন প্রশ্ন। তাই বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতের শ্রমনীতি নির্ধারণে শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা নয়, কর্মীদের নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকারকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাজ করা মানুষের হাতে হয়তো একটি অ্যাপ থাকে, কিন্তু সেই অ্যাপের সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে তার পুরো জীবিকার ওপর।
শ্রম আইনে নতুন স্বীকৃতি, তবে অধিকার নিয়ে রয়ে গেছে বড় প্রশ্ন:
দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর দেশের শ্রম আইনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মীদের বিষয়ে প্রথম বড় পরিবর্তন আসে গত নভেম্বরে। শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে আনা সংশোধনীতে প্রথমবারের মতো গিগ অর্থনীতির কর্মীদের আইনি কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর গঠিত শ্রম সংস্কার কমিশন গত বছরের এপ্রিলে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এরপর নভেম্বরে আসে শ্রম আইনের সংশোধনী অধ্যাদেশ। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে সেটি পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপ নেয়। এতে শ্রম আইনে প্রায় ৯০টি সংশোধনী আনা হয়েছে।
শ্রম আইন সংশোধনের পেছনে দেশের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থায় (আইএলও) বাংলাদেশের শ্রম অধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা, ইউরোপের বাজারে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত নতুন নীতিমালা এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব—সবকিছুই এ প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রেখেছে।
গিগ কর্মীদের জন্য খুলল সংগঠনের পথ:
নতুন সংশোধনীর অন্যতম আলোচিত দিক হলো, শ্রম আইনের ১৭৫ ধারায় ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির সুযোগ তৈরি হওয়া। এর ফলে রাইড শেয়ারিং, খাবার সরবরাহ বা বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কাজ করা কর্মীরা এখন সংগঠিত হওয়ার আইনি সুযোগ পাচ্ছেন।
এটি গিগ অর্থনীতির কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ এতদিন তারা প্রচলিত শ্রমিক শ্রেণির বাইরে অবস্থান করায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। তবে শ্রম সংস্কারের এই উদ্যোগের একটি ইতিবাচক দিক হলো—কমিশনের সুপারিশ থেকে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়াটি তুলনামূলক দ্রুত সম্পন্ন হয়েছে। দেশের আইন সংস্কারের ইতিহাসে এমন দ্রুত বাস্তবায়ন খুব বেশি দেখা যায়নি।
তবে মূল প্রশ্ন রয়ে গেছে শ্রমিক পরিচয় নিয়ে:
আইনের এই পরিবর্তন নতুন সুযোগ তৈরি করলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই রয়েছে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা। কারণ গিগ কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার দেওয়া হলেও শ্রমিকের মূল সংজ্ঞায় তাদের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। আর শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি, ক্ষতিপূরণ, গ্র্যাচুইটির মতো মৌলিক অধিকারগুলোর। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যদি একজন প্ল্যাটফর্ম কর্মী সংগঠন করার অধিকার পান, তাহলে তার দাবির বিপরীতে দায়বদ্ধ পক্ষ কে হবে?
শ্রম অধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, সংগঠনের অধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষার জন্য নিয়োগ সম্পর্কের বিষয়টি স্পষ্ট করা প্রয়োজন অর্থাৎ নতুন আইন কর্মীদের কথা বলার সুযোগ তৈরি করেছে, কিন্তু সেই কথার জবাবদিহির কাঠামো এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি।
শ্রম আইনের নতুন পরিবর্তনে গৃহকর্মীদের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘদিন অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকা এই কর্মীদের জন্য দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ ও সংগঠনের অধিকারের স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে নারী গৃহকর্মীদের জন্য এটি একটি বড় পরিবর্তন। তবে এখানেও কিছু মৌলিক প্রশ্ন রয়ে গেছে। ন্যূনতম মজুরি, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা অন্যান্য শ্রম সুবিধার বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ কাঠামো তৈরি হয়নি।
আইনের দরজা খুলেছে, কিন্তু পূর্ণ অধিকার এখনো দূরে:
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কর্মী ও গৃহকর্মীদের আইনি স্বীকৃতি শ্রম সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বীকৃতির পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত বাস্তব অধিকার নিশ্চিত করা কারণ শুধু আইনে নাম যুক্ত হওয়া নয়, একজন কর্মী তার শ্রমের বিনিময়ে কতটা নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি ও সামাজিক সুরক্ষা পাচ্ছেন—সেটিই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শ্রম আইনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, এই অধ্যায়কে কতটা পূর্ণাঙ্গ অধিকার কাঠামোয় রূপ দেওয়া যায়।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মসংস্থানের বিষয়টি শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। কারণ দেশের রাস্তায় কাজ করা অনেক রাইডারই যুক্ত আছেন এমন বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, যাদের কার্যক্রম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত।
ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম ফুডপান্ডার মূল প্রতিষ্ঠান জার্মানির বার্লিনভিত্তিক ডেলিভারি হিরো এবং রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান উবারের সদর দপ্তর যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোতে। ফলে ঢাকার একজন রাইডারের শ্রম বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতির অংশ। এই কারণে আন্তর্জাতিকভাবে গিগ কর্মীদের অধিকার নিয়ে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিভিন্ন দেশে শ্রম অধিকারের নতুন কাঠামো:
যুক্তরাজ্যে আদালতের এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে উবার চালকদের ‘ওয়ার্কার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এর ফলে তারা ন্যূনতম মজুরি ও ছুটির সুবিধার মতো কিছু শ্রম অধিকার পাওয়ার সুযোগ পান। অস্ট্রেলিয়াতেও গিগ অর্থনীতির কর্মীদের জন্য বিশেষ আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাদের কর্মীসদৃশ অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে ন্যায্য পারিশ্রমিকের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
ভারত ২০২০ সালে সামাজিক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনি কাঠামোয় গিগ ও প্ল্যাটফর্ম কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করে। সেখানে তাদের জন্য কল্যাণমূলক ব্যবস্থার সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব দেশের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল কর্মীদের আয়, সামাজিক নিরাপত্তা ও শ্রম সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত করা। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সংস্কারে গিগ কর্মীদের সংগঠন করার অধিকার স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে এখনো প্রশ্ন রয়েছে—তাদের মজুরি, কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত হবে।
শ্রম অধিকার বিশ্লেষকদের মতে, সংগঠন করার অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি শ্রম অধিকারের একটি অংশ মাত্র। একজন কর্মীর প্রকৃত নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন ন্যায্য আয়, দুর্ঘটনা সুরক্ষা, স্বাস্থ্য সুবিধা এবং ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা। কারণ কোনো কর্মী দাবি জানাতে পারলেও যদি সেই দাবির বিপরীতে দায়বদ্ধ পক্ষ নির্ধারিত না থাকে, তাহলে আইনি সুরক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক দেশ সংগঠনের অধিকারের পাশাপাশি কর্মীদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়েছে।
গিগ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ কম কেন?
প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজের আরেকটি বড় প্রশ্ন হলো—এই খাতে নারীর অংশগ্রহণ এত কম কেন? তাত্ত্বিকভাবে দেখলে, ডেলিভারি বা রাইডিংয়ের কাজে উচ্চ শিক্ষাগত যোগ্যতা বা নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রের প্রয়োজন নেই। একটি বাহন ও স্মার্টফোন থাকলেই এই কাজে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। নারীদের অংশগ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় যানবাহনের মালিকানা, নিরাপত্তা, রাতের সময়ে চলাচলের ঝুঁকি, জনপরিসরে সুযোগ-সুবিধার ঘাটতি এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। ফলে শুধু কাজের সুযোগ তৈরি করলেই নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সহায়ক অবকাঠামো। গিগ অর্থনীতিতে নারীর কম উপস্থিতি শুধু এই খাতের সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক নগর ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক কাঠামোর প্রতিফলন।
আইনের আগেই সংগঠিত হচ্ছিল রাইডারদের প্রতিরোধ:
শ্রম অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে কর্মীরা সবসময় আইনি স্বীকৃতির অপেক্ষায় থাকেননি। ২০২১ সালে ঢাকায় ফুড ডেলিভারি কর্মীদের প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখা যায়। কমিশন, আয় ও কাজের শর্ত নিয়ে অসন্তোষ থেকে তারা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করেন।
অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন গ্রুপেও রাইডারদের মধ্যে যোগাযোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। যদিও তা আনুষ্ঠানিক ট্রেড ইউনিয়ন ছিল না, তবে কর্মীদের সম্মিলিত দাবির একটি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, কিছু প্ল্যাটফর্ম কর্মী সরাসরি গ্রাহকের সঙ্গে যোগাযোগ করে কাজ নেওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছেন। এর মাধ্যমে তারা প্ল্যাটফর্মের কমিশন কাঠামোর বাইরে বিকল্প আয় ব্যবস্থার চেষ্টা করছেন। গবেষকদের কেউ কেউ এটিকে প্ল্যাটফর্ম ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার বিরুদ্ধে কর্মীদের নিজস্ব দরকষাকষির কৌশল হিসেবে দেখছেন।
গিগ কর্মীদের ট্রেড ইউনিয়ন করার আইনি সুযোগ তৈরি হওয়ার পর নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশে প্রথম নিবন্ধিত গিগ ইউনিয়ন কবে তৈরি হবে, তার নেতৃত্ব কারা দেবেন এবং কর্মীদের প্রথম দাবিগুলো কী হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে শুধু আইনের ওপর নয়, বরং কর্মীদের সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা, প্ল্যাটফর্ম প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা এবং সরকারের বাস্তবায়ন কাঠামোর ওপর। কারণ আইন দরজা খুলে দিয়েছে। কিন্তু সেই দরজা দিয়ে কর্মীরা কতটা এগিয়ে যেতে পারবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
স্বীকৃতির পরের লড়াই: নামের পর এবার প্রয়োজন অধিকার
ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রও বড় হয়েছে। খাবার সরবরাহ, রাইড শেয়ারিং কিংবা অনলাইন সেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা এখন শহুরে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই খাতের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের সংখ্যা, তাদের আয় এবং অর্থনীতিতে অবদান নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা থাকলেও একটি বিষয় স্পষ্ট—তারা এখন আর অদৃশ্য নন।
দীর্ঘদিন পর শ্রম আইনের কাঠামোয় গিগ কর্মীদের নাম যুক্ত হয়েছে। যে পরিচয় এতদিন আইনি আলোচনার বাইরে ছিল, সেটি এখন স্বীকৃতির অংশ। শ্রম ইতিহাসে এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। তবে এই স্বীকৃতির পরও বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে। শুধু পরিচয় নিশ্চিত করলেই কি একজন কর্মীর পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত হয়?
কারণ শ্রমিকের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নির্ধারিত হয় মজুরি, কর্মঘণ্টা, ছুটি, দুর্ঘটনা সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো অধিকারের মাধ্যমে। গিগ কর্মীদের নাম এখন আইনের পাতায় রয়েছে। কিন্তু তাদের বাস্তব সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত হবে, সেটিই হবে পরবর্তী বড় পরীক্ষা।
কারণ শ্রম আইনে স্বীকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রথম ধাপ। তবে সেই স্বীকৃতিকে কার্যকর অধিকারে রূপ দেওয়াই হবে আসল চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল অর্থনীতির এই কর্মীরা এখন আইনের আলোচনায় এসেছেন। আগামী দিনের প্রশ্ন—তারা কি শুধু পরিচয় পাবেন, নাকি পাবেন পূর্ণ শ্রম অধিকারও?

