দেশের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফর, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য বাণিজ্য চুক্তিসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে কথা বলেছেন কূটনীতি বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে দেশের অন্যতম পরিচিত এই বিশ্লেষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। বর্তমানে তিনি সেন্টার ফর অল্টারনেটিভসের (ন্যাটস্ট্র্যাট) নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার টেয়লরস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং অধ্যাপক হিসেবেও যুক্ত আছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কূটনৈতিক বিষয়ে গবেষণা করে আসা ড. ইমতিয়াজ আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ এবং অফিস অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন।
আলোচনায় তিনি বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতি, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের অবস্থান এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। বিশেষ করে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অগ্রগতি, আঞ্চলিক কূটনৈতিক সমীকরণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের সম্ভাবনা নিয়ে তিনি মতামত দেন। দেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পরিবর্তিত বাস্তবতায় বাংলাদেশের করণীয় নিয়েও আলোচনা করেন এই কূটনীতি বিশ্লেষক।
প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পর তারেক রহমান ভারতে না গিয়ে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেছেন। এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থানে কী কী পরিবর্তন দেখেছেন বলে মনে করেন?
প্রথম সফর হিসেবে প্রধানমন্ত্রী চীনে যাবেন এমনটি বোঝা যাচ্ছিল। কারণ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে ভারতের ব্যাপারে বড় সমালোচনা আছে। কারণ দেশের মানুষের একটি বড় অংশ মনে করে, একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গেই ভারত তাদের সম্পর্ক বড় করেছিল। এ দেশের মানুষের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক গাঢ় হয়নি। সে হিসেবে ভারতের প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা এখনো মানুষের মনে রয়েছে। ফলে নির্বাচনের পর যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, কূটনীতি বিশ্লেষকরা অনুমান করছিলেন প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করবেন।
যেকোনো সফরের ক্ষেত্রে প্রাপ্তি সবসময়ই বড় বিষয়। অর্থাৎ আমি সফরে যাচ্ছি এবং সেখান থেকে আসলে কী নিয়ে আসছি এ হিসাবটা গুরুত্বপূর্ণ। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থটাই বড়। যদি এদিক বিবেচনা করি তাহলে প্রথমেই ভাবতে হয়েছে কোথায় গেলে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে। এদিকটা বিবেচনা করলে সহজেই বোঝা যায়, অনেক বড় আকারের বিনিয়োগ ভারতের পক্ষে এখন করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে চীনই আমাদের জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা।
চীন সফরের আগে মালয়েশিয়ায় সফরটির আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তৈরি পোশাক ও প্রবাসী আয়—এ দুটো খাতই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার সবচেয়ে বড় উৎস। তবে প্রবাসী আয়কেই সবচেয়ে টেকসই আয় খাত বলতে হয়। এ খাতে নানা সমস্যা রয়েছে এবং আমাদেরও ঘাটতি রয়েছে। তবে এ খাতের বাজারকে বহুমুখী করতেই হবে। আবার আমাদের অর্থনীতি বিবেচনায় এশীয় দেশগুলোর সঙ্গেও বাণিজ্য চুক্তি করা জরুরি। সে আঙ্গিকে মালয়েশিয়ার কাছে প্রথমে যাওয়াটা কৌশলগত বলেই ধরে নিতে হবে। এজন্য এ দুটো সফরকে সঠিক বলেই মনে করছি।
সফরে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সম্প্রতি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে এসেছে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বাংলাদেশ, ভারত ও চীন ভূমিকা রাখতে পারে। যদি এ বিষয়ে তিন পক্ষই ঐকমত্য গড়তে পারে তাহলে ভূরাজনৈতিক প্লেমেকার হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থানকে কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
বিষয়টা এখনো আমাদের পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। কারণ প্রস্তাবটা এসেছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের তরফে। প্রস্তাবটি নতুন নয় অবশ্য। চীনের তরফে এর আগেও এমন একটি প্রস্তাব ছিল। সেখানে বাংলাদেশ, ভারত, চীন ও মিয়ানমার—এ চার দেশই ছিল। তখন এটিকে বিসিআইএম বলা হতো। ওই জোটের বিষয়ে ভারত তেমন কোনো আগ্রহ দেখায়নি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে চীনের প্রেসিডেন্ট তার প্রস্তাবে কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন।
ভারত এ প্রস্তাবে আগ্রহ দেখায়নি। তাই শি জিনপিং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে নিয়ে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে। তারা আপাতত এ দুটো দেশকে ইকোনমিক করিডোরে অন্তর্ভুক্ত করবে। ভারত না এলেও তাদের জন্য পথ বন্ধ হয়নি। আপাতত আমাদের এ বিষয়টার প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রস্তাবনার ধরন, আমাদের লাভ ও সুযোগ-সুবিধা সবই পর্যালোচনা করতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তো আলোচনা এসেছেই। সমাধান হতে পারে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতও জানিয়েছেন, এর মাধ্যমে সমাধান হতে পারে।
চীনের সঙ্গে ইকোনমিক করিডোরে যুক্ত হলে আমাদের কী কী সুবিধা আসতে পারে বলে মনে করেন?
ইকোনমিক করিডোরের কিছু সুবিধা থাকেই। চীনের এ ইকোনমিক করিডোরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে আমরা আরো যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাব। প্রধানমন্ত্রী এরই মধ্যে মালয়েশিয়ায় সফর করেছেন। ওই দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, হালাল অর্থনীতি এমনকি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রসঙ্গেও আলাপ হয়েছে। আসিয়ানে মালয়েশিয়ার একটি দৃঢ় অবস্থানও রয়েছে। আবার ভবিষ্যতে যদি চীনের সঙ্গে ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিছুটা সমঝোতার মাধ্যমে কমিয়ে আনতে পারে তাহলে ভারত এখানে আসতে পারবে। চীন জানিয়েছে এ বিষয়ে তাদের আপত্তি থাকবে না। তখন করিডোরের অর্থনৈতিক কার্যক্রম আরো শক্তিশালী হবে।
ইকোনমিক করিডোরের মাধ্যমে আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়াটা আমাদের জন্য সবচেয়ে ইতিবাচক। বর্তমানে চীন-আসিয়ান অর্থনৈতিক সম্পর্ক ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। অন্য কোনো দেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এত বেশি হয়নি। তাই চীনের সঙ্গে থেকে বাংলাদেশ আসিয়ান অঞ্চলে নিজের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। সেটি অর্থনৈতিক কূটনীতি হিসেবে বড় সফলতাই হবে। আবার আসিয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কও এত বেশি না। চীনের সঙ্গেই বেশি। এজন্য চীনা করিডোরের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ওই বাজারে প্রবেশের সহজ সুযোগ পাবে। এমনটা হলে ভারতও অর্থনৈতিক স্বার্থে আর পিছিয়ে থাকতে চাইবে না। সেও আসিয়ানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক করার চেষ্টা চালাবে। ওই সময় এ করিডোরে তাদের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অর্থনৈতিক এ করিডোরে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহলের কৌশল কী হতে পারে?
সমঝোতায় যুক্ত হওয়ার আগে কূটনৈতিক চ্যানেলকে পেশাদারত্ব দেখাতে হবে। অর্থাৎ আমাদের কূটনৈতিক দরকষাকষির আগে ভূরাজনৈতিক প্রতিটি ঘটনাকে পর্যালোচনা করতে হবে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও কার্যক্রম নিয়ে গবেষণা বাড়াতেই হবে। কূটনীতিকে এ ধরনের গবেষণাধর্মী অবস্থানে নিয়ে যাওয়া জরুরি। আপাতদৃষ্টিতে এ করিডোরে যুক্ত হলে আমাদের লাভ বেশি হবে, এমনটাই মনে হচ্ছে। সেটা খালি চোখে দেখা। কিন্তু নিখুঁত বিশ্লেষণ ও গবেষণার মাধ্যমে যদি আমরা লাভের একটা আনুমানিক দৃশ্য তৈরি করতে পারি তাহলে এ ইকোনমিক করিডোর আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি গেমচেঞ্জার হয়ে উঠবে।
কূটনৈতিক চ্যানেলের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ একটি বড় অগ্রাধিকার। তবে এখনো আমরা আশানুরূপ বৈদেশিক বিনিয়োগ আনতে পারিনি। অর্থনৈতিক কূটনীতি পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি কোথায়?
এখানে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, অভ্যন্তরীণ বা বিদেশী—দুই ধরনের বিনিয়োগের ক্ষেত্রেই স্থিতিশীলতা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। বিনিয়োগ আকর্ষণের পূর্বশর্তই ভারসাম্য। এ ভারসাম্যের মধ্যে বাণিজ্যের নিরাপত্তা, সুযোগ-সুবিধা এবং সর্বোপরি অভ্যন্তরীণ স্থিতাবস্থা থাকতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করতে না পারলে দেশী বিনিয়োগকারীরাই আগ্রহ পাবেন না। বর্তমানে দেশে এমন অবস্থাই চলছে। কারণ দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যের বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশ নেই। ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারীরা স্বল্প সময়ের বাণিজ্য করছেন। কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য বড় লাভ এনে দেবে না। দেশী বিনিয়োগকারীরাই যদি অনাগ্রহী হন তাহলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও পিছিয়ে যাবেন—এমনটাই স্বাভাবিক।
তাই অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক পরিবেশ স্বাভাবিক রাখাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। না হলে দেশী বিনিয়োগকারীরাই বাইরে চলে যাবেন। এরই মধ্যে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এক ধনকুবের ভারতে বিনিয়োগ করেছেন। তিনি কেন এখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হলেন না? কারণ আমাদের কূটনৈতিক সেবা তাদের আশ্বস্ত করতে পারেনি। এ বিষয়ে তাদের কার্যক্রমও তেমন দৃশ্যমান নয়। বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও আমাদের কূটনৈতিক পর্যায়ে কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে কূটনৈতিক চ্যানেলও তার পূর্ণাঙ্গ পেশাদারত্বের প্রয়োগ করতে পারছে না।
বিগত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বর্তমানে নির্বাচিত সরকার রয়েছে। তার পরও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এ দিকগুলোতে মনোযোগ বাড়ানো দরকার। বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্য চুক্তিটি। এ চুক্তি বহাল থাকলে চীন কেন, অনেক দেশই বাংলাদেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যেতে পারে। বিনিয়োগ কিছু আসবে। তবে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসার পথ অনেকটাই সংকুচিত হয়ে যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের যে বাণিজ্য চুক্তি, সেটির ক্ষেত্রে আসলে এখন আমাদের করণীয় কী?
একটা বিষয় এখানে লক্ষ করা দরকার। চুক্তিটি হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। সেটিও নির্বাচনের তিনদিন আগে। অনেকটা তাড়াহুড়ো করে, আর এ বিষয়ে আমাদের কাছে স্পষ্ট তথ্য আসেনি এবং এখনো নেই। এ চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে আমাদের বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও রফতানি খাতে অনেক সমস্যা তৈরি হবে। আবার কিছু ইতিবাচক দিকও আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে সমস্যাগুলো অনেক ভারী। মনে রাখা দরকার, চুক্তিটি হয়েছে এমন এক সরকারের সময় যারা মূলত তত্ত্বাবধায়কের ভূমিকা পালন করেছে। নির্বাচিত সরকারের সময় চুক্তিটি হয়নি। পরবর্তী সময়ে দেখা গেছে, চুক্তিতে যে শুল্ক কাঠামো ছিল সেটি যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টই নাকচ করে দিয়েছেন।
এ অবস্থায় বাংলাদেশের আবার দরকষাকষি করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে করেছে সেভাবে করা যাবে না। ওই ধরনের কূটনৈতিক পদক্ষেপ থেকে আমাদের সরে আসতে হবে। এমন একপেশে চুক্তি থাকলে কোনো দেশই এখানে বিনিয়োগ বা বাণিজ্যে আগ্রহী হবে না।
এক্ষেত্রে কী আমাদের দরকষাকষির সুযোগ আছে বলে মনে করেন?
পৃথিবীর যেকোনো দেশে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সরকার বড় ধরনের কোনো চুক্তিতে যেতে পারে না। আমাদের সংবিধানে এ সুযোগ নেই। কোনো দেশের সংবিধানই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এমন চুক্তির সুযোগ দেয় না। চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলতে পারে। এর সম্ভাবনা সম্পর্কে অবহিত করা যেতে পারে। কিন্তু বড় চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচিত সরকারের জন্যই অপেক্ষা করতে হবে। চুক্তিটি সই হয়েছে নির্বাচনের তিনদিন আগে। ফলে এটি বাংলাদেশের আদালতে অভিযোগ আকারে উত্থাপন করা হলে বাতিল হয়ে যেতে পারে।
এখানে দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে শুল্ক কাঠামোর বিষয়টি নাকচ করে দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আলোচনার জন্য আমাদের বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে। চুক্তিটি ওই শুল্ক কাঠামোকে অগ্রাধিকার দিয়েই করা হয়েছিল। সেটি যুক্তরাষ্ট্রের আদালতই বাতিল করে দিয়েছে। এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে হলে কূটনৈতিক মহলকে সর্বোচ্চ পেশাদারত্ব দেখাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আবার আলোচনায় বসতে হবে।
নীতিনির্ধারকরা যদি তাদের নীতিনির্ধারণে এক পা দেশে আর অন্য পা বাইরে রাখেন তাহলে কূটনৈতিক সুযোগ আদায় হবে না। এজন্য বিশাল পেশাদারত্ব দেখাতে হবে। সমঝোতার ক্ষেত্রে আমরাই যেন সবদিকে সুবিধা পাই তা নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোচ্চ পেশাদারত্বের মাধ্যমেই আমরা আমেরিকাকে চুক্তি পুনর্বিবেচনা করার জন্য রাজি করাতে পারব। তাদের নতুন চুক্তিতে যাওয়ার বিষয়ে রাজি করাতে হবে। আমি মনে করি, সঠিক কৌশল অবলম্বন করলে এটি কঠিন কিছু নয়।
সরকার এরই মধ্যে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোর চেষ্টা করছে। এটি আমাদের কী সুবিধা দেবে?
এলডিসি উত্তরণ পেছানোর পেছনে সরকারের কিছু যুক্তি রয়েছে। অতীত সরকার এলডিসি উত্তরণের জন্য যে তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করেছিল তার প্রামাণিকতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে এটি আমাদের জন্য অর্থনৈতিক বিলাসিতা হয়ে উঠেছিল। মাত্র দু-তিনটি খাতের ওপর ভর করে আমাদের এলডিসি উত্তরণ এখনই সুফল এনে দিতে পারত না।
বরং উল্টোটা ঘটতে পারত। সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হবে। অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে বাণিজ্য ও উৎপাদন সক্ষমতা দিতে না পারলে আমরা কোনো সমাধানই পাব না। এ সময়ে আর্থিক খাতের একটি বড় সংস্কার জরুরি। বিনিয়োগ আকর্ষণ বাড়াতে হবে। ফলে এলডিসি উত্তরণ তিন বছর পেছানোটাকে পুরোপুরি নেতিবাচক বলা যাচ্ছে না।

