২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যেতে এবং কেনাকাটা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার এই বক্তব্য তখন অনেকের সমালোচনার মুখে পড়ে। অনেকে অভিযোগ করেছিলেন, এমন সংকটের সময়ে তিনি ভোগ ব্যয় বাড়ানোর বার্তা দিচ্ছেন।
২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পরও এ নিয়ে বিতর্ক হয়। তবে অর্থনীতির বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন। বুশ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তির দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন—আর তা হলো ভোক্তাদের ব্যয়।
গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে পারিবারিক ভোগ ব্যয় থেকে। গড়ে প্রায় ৫৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির পেছনে ছিল মানুষের ব্যক্তিগত ব্যয়। এই প্রবণতা বিশ্বের অন্য বড় অর্থনীতিগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রকে আলাদা করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ভোগনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি হয়েছে দুটি কারণে। প্রথমত, বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের আধিপত্য। দ্বিতীয়ত, কয়েক দশক ধরে গৃহীত সরকারি নীতি, যা ভোক্তা ব্যয়কে উৎসাহ দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ডলারের ব্যাপক চাহিদা যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের চলতি হিসাবের ঘাটতি বহন করার সুযোগ দিয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে ডলারের প্রয়োজনীয়তা দেশটিকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক অর্থ প্রবাহ এনে দিয়েছে।
তবে এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তৈরি হয়েছে। ডলার শক্তিশালী থাকায় মার্কিন পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তুলনামূলক ব্যয়বহুল হয়েছে। এতে রপ্তানি প্রতিযোগিতা কমেছে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়েছে দেশটির উৎপাদন খাতেও। তবে শুধু ডলারের শক্তিই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্তও ভোগনির্ভর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে বাড়ি কেনাকে উৎসাহ দিতে বিভিন্ন কর সুবিধা ও ভর্তুকি চালু রয়েছে। গৃহঋণের সুদে কর ছাড়সহ নানা সুবিধার কারণে অনেক মানুষ বাড়ির মূল্যকে সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করে অতিরিক্ত ঋণ নিয়েছেন। একই সঙ্গে আর্থিক খাতে সরকারি সহায়তা ও তারল্য সুবিধা ঋণপ্রবাহ বাড়িয়েছে। এর ফলে এমন একটি আর্থিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর নির্ভর করে বর্তমান সময়ে বেশি ব্যয় করা অনেকের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।
এই ভোগপ্রবণ অর্থনীতির পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জ্বালানি। যুক্তরাষ্ট্রের জীবনযাত্রা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ জ্বালানি ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত। দেশটির বড় আকারের বাড়ি, ব্যাপক গাড়ি ব্যবহার, দীর্ঘ দূরত্বে যাতায়াত এবং উচ্চ কার্বননির্ভর পণ্যের ব্যবহার—সবকিছুই বেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
এ ক্ষেত্রে সরকারের জ্বালানি নীতিও বড় ভূমিকা রেখেছে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তেল ও গ্যাস শিল্প বিভিন্ন ধরনের কর সুবিধা পেয়েছে। বিশেষ করে ‘ইনট্যানজিবল ড্রিলিং কস্ট’ নামে পরিচিত কর সুবিধা তেল-গ্যাস খাতকে দীর্ঘদিন সহায়তা দিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে একটি নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে।
বদলে যাচ্ছে জ্বালানি বাস্তবতা:
বর্তমানে সেই বাস্তবতায় পরিবর্তন আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোর জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন খরচ কমছে। তবে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তির অন্যতম ভিত্তি হলো সস্তা ও সহজলভ্য জ্বালানি। তার নীতিতে সেই জ্বালানির অর্থ মূলত তেল ও গ্যাস।
ট্রাম্প প্রশাসনের ‘ড্রিল, বেবি, ড্রিল’ নীতি যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। একই সঙ্গে তার প্রশাসন ওয়ান বিগ বিউটিফুল বিল অ্যাক্ট–এর মাধ্যমে তেল ও গ্যাস খাতের জন্য সুবিধা বাড়িয়েছে এবং ইনফ্লেশন রিডাকশন অ্যাক্ট–এর আওতায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানির জন্য দেওয়া অনেক কর সুবিধা বাতিল করেছে।
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের জিরো ল্যাবের গবেষণায় বলা হয়েছিল, এই নীতির কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবার ও ব্যবসার জ্বালানি ব্যয় প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে।
পরিস্থিতি আরও জটিল করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত সরবরাহ সংকট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টারের দ্রুত সম্প্রসারণ বিদ্যুতের চাহিদা বাড়াচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদ্যুৎ চাহিদার বড় অংশই এখন ডেটা সেন্টার থেকে আসছে। এর ফলে আগামী কয়েক বছরে কিছু অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিল উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে বিশ্ব:
অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির খরচ দ্রুত কমছে। ২০২৪ সালে বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ অনেক ক্ষেত্রে জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কম ব্যয়বহুল ছিল।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন জ্বালানি নিরাপত্তা ও খরচ কমানোর জন্য নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে এগোচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের পর অনেক দেশ সৌর প্রযুক্তি ও অন্যান্য সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও বৈদ্যুতিক গাড়ির চাহিদা বাড়ছে। মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যেও অনেক ভোক্তা দীর্ঘমেয়াদি খরচ কমানোর লক্ষ্য নিয়ে নতুন প্রযুক্তির গাড়ির দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভোগনির্ভর অর্থনীতি ভবিষ্যতে শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারবে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে দেশটিকে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
অবশ্য চীনের সবুজ প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক নীতিনির্ধারকের উদ্বেগ রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এই সমস্যা মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো—গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি যেমন ইনভার্টারসহ কিছু উপাদানের উৎপাদন নিজ দেশে বাড়ানো এবং একই সঙ্গে কম খরচের প্রযুক্তি আমদানি চালু রাখা। এর জন্য প্রয়োজন আধুনিক শিল্পনীতি, যা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াবে এবং জ্বালানি খরচ কমাবে।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে উপেক্ষা করে শুধু জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। কারণ যে সস্তা জ্বালানির ওপর দেশটির ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধির মডেল দাঁড়িয়ে আছে, সেই জ্বালানিই যদি ক্রমে ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে, তাহলে পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো চাপের মুখে পড়তে পারে।
- ড্যানিয়েল ড্রিসকল: ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক এবং রুজভেল্ট ইনস্টিটিউটের নন-রেসিডেন্ট ফেলো

