একটি সমাজ তখনই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, যখন অপরাধীরা মনে করতে শুরু করে— অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। কারণ তখন শুধু একটি অপরাধ ঘটে না, দুর্বল হয়ে পড়ে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে সংঘটিত একের পর এক হত্যাকাণ্ড সেই উদ্বেগকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। এর পর দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা শুধু একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এসব ঘটনা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জবাবদিহির কাঠামো নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সংবাদমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই হত্যাকাণ্ডের খবর উঠে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে স্থানীয় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ফুটপাত দখল, ডিশ ও ইন্টারনেট ব্যবসা, ঠিকাদারি এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের সংঘাত। রাজনৈতিক পরিচয় অনেক সময় এসব বিরোধকে আরও জটিল করে তুলছে। এর মধ্যে কয়েকজন বিএনপি নেতাকর্মী নিহত হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় এসেছে।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে ৩৪৭টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫৫ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬৩৬ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে দলীয় অভ্যন্তরীণ বিরোধ থেকে সৃষ্ট সহিংসতা। এখন প্রশ্ন হলো— মানুষ কেন এত সহজে হত্যার মতো চরম অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে?
এর অন্যতম কারণ হতে পারে শাস্তির ভয় কমে যাওয়া। সমাজের একটি অংশের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হলে যে রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতার প্রভাব বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর আশ্রয় অপরাধের পরও রক্ষা করতে পারে, তখন অপরাধের প্রবণতা বাড়ে। একজন অপরাধী যদি বিশ্বাস করে যে তার পরিচয় তাকে আইনের আওতার বাইরে রাখবে, তাহলে অপরাধের আগে তার মধ্যে যে ভয় কাজ করার কথা, তা অনেকটাই কমে যায়।
অপরাধবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো— অপরাধ দমনে শুধু কঠোর শাস্তি যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নিশ্চিত শাস্তি। অর্থাৎ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর দ্রুত তদন্ত, অপরাধী শনাক্তকরণ, বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন এবং শাস্তি কার্যকর হওয়ার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। কারণ অপরাধীর কাছে সবচেয়ে বড় বার্তা হলো— সে ধরা পড়বে কি না এবং তার অপরাধের পরিণতি কী হবে।
তাই প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা শুধু একটি মামলাকে দুর্বল করে না, বরং সমাজে এমন একটি ভুল বার্তা তৈরি করে যে প্রভাবশালীরা অপরাধ করেও রেহাই পেতে পারে।
বিশেষ করে কোনো হত্যাকাণ্ডে ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী বা সমর্থকদের নাম এলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ তখন জনগণ শুধু অভিযুক্ত ব্যক্তির বিচার নয়, রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাও পর্যবেক্ষণ করে। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া, তদন্তে সহযোগিতা করা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক দলের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতার সঙ্গে থাকা অবস্থায় কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়কে ব্যক্তিগত প্রভাব ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করে। স্থানীয় ব্যবসা, পরিবহন, বাজার নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার, ফুটপাত বা বিভিন্ন সেবাখাতে আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে রাজনীতি যুক্ত হলে আদর্শের জায়গা দখল করে নেয় স্বার্থের সংঘাত। তখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ অনেক সময় পরিণত হয় অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীতে। আর সেখান থেকেই সহিংসতার জন্ম নেয়।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব শুধু বক্তব্য দেওয়া নয়। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে— হত্যা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের কোনো স্থান নেই। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে— এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
তবে এই নীতি শুধু ক্ষমতাসীন দলের জন্য নয়। দেশের সব রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হতে হবে। কারণ অপরাধের বিচার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। একটি দলের অপরাধ অন্য দলের অপরাধকে বৈধতা দিতে পারে না। রাষ্ট্রের কাছে অপরাধীর একমাত্র পরিচয়— সে অপরাধী।
বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়, বরং রাজনৈতিক জবাবদিহি। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো অপরাধী মনে করবে না যে ক্ষমতা তাকে রক্ষা করবে, কোনো দল মনে করবে না যে রাজনৈতিক পরিচয় আইনের ঊর্ধ্বে এবং কোনো সাধারণ নাগরিক ভাববে না যে বিচার শুধু দুর্বলদের জন্য।
খুনের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান কেবল বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সেটি রাষ্ট্রের কার্যক্রম, রাজনৈতিক দলের আচরণ এবং বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতায় দৃশ্যমান হতে হবে। কারণ একটি সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি হলো মানুষের জীবনের মূল্য। আর সেই জীবন রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি।

