পাকিস্তান আমলের দীর্ঘ সময়জুড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল উত্তাল। বিরোধী দলের বহু নেতা-কর্মী বিভিন্ন সময়ে কারাবরণ করেছেন। তখন রাজপথের অন্যতম পরিচিত স্লোগান ছিল—‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’। সভা-সমাবেশ থেকে শুরু করে শহরের দেয়ালজুড়েও এই দাবির প্রতিধ্বনি দেখা যেত। শুধু পাকিস্তান আমল নয়, ব্রিটিশ শাসনকালেও এই স্লোগানটি ছিল রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি পরিচিত অংশ।
তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক পরিসরে এই স্লোগানের ব্যবহার কার্যত হারিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক সরকারের সময় বিরোধী দলগুলো মাঠে সক্রিয় থেকেছে। ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ছাড়া প্রায় সব সরকারের আমলেই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতি ছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি করার ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ হিসেবে বহু নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, এমনকি ‘ক্রসফায়ার’-এর নামে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের অভিযোগও উঠেছে। কিন্তু কারাবন্দি রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তান আমলের মতো ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ স্লোগান আর শোনা যায়নি। এর পরিবর্তে বিভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট কোনো নেতার মুক্তি দাবিতে ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক ভাইকে আনব’ ধরনের স্লোগান দেখা গেছে।
রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড, ষড়যন্ত্র কিংবা রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, লেখক ও বুদ্ধিজীবীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তবে এসব মামলার অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি। ফলে অভিযুক্তদের অনেকেই আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি পেয়েছেন।
পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ ছিল সবচেয়ে আলোচিত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাগুলোর একটি। সামরিক শাসক আইয়ুব খানের আমলে শেখ মুজিবসহ কয়েকজন সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভাঙার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল। পরে প্রবল গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯ সালে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়।
এরপর আরেক সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের আমলেও শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলায় সামরিক আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে। তবে সেই রায় কার্যকর হয়নি।
ইতিহাসের এক বড় রাজনৈতিক পরিহাস হলো, যিনি একসময় পাকিস্তানের অখণ্ডতার প্রশ্নে শেখ মুজিবের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছিলেন, সেই জুলফিকার আলী ভুট্টোই পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের ক্ষমতায় এসে শেখ মুজিবকে মুক্তি দেন। একই সময়ে ইয়াহিয়া খানকে গৃহবন্দি করা হয়।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তি বা দলের সংঘাতের গল্প নয়; বরং রাষ্ট্রক্ষমতা, বিরোধী মত, আইনের ব্যবহার এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের জটিল সম্পর্কেরও প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিভাষা থেকে ‘রাজবন্দি’ শব্দটি ধীরে ধীরে কেন হারিয়ে গেল—এ প্রশ্নটি এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। একসময় রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল এই শব্দটি। বিরোধী দলের নেতাদের কারাবন্দি করা হলে তাঁদের ‘রাজবন্দি’ হিসেবে উল্লেখ করা হতো এবং তাঁদের মুক্তির দাবিও উঠত রাজপথে। কিন্তু বর্তমান সময়ে শব্দটি আর আগের মতো রাজনৈতিক অভিঘাত তৈরি করে না। তাহলে কি বাংলাদেশ রাজনীতিশূন্য হয়ে পড়েছে? নাকি বিরোধী দলহীন বাস্তবতায় ‘রাজবন্দি’ শব্দটির অর্থ বদলে গেছে? সময়ের সঙ্গে রাজনৈতিক ভাষা ও বাস্তবতার পরিবর্তনের কারণেই হয়তো এই শব্দের ব্যবহারও কমে এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ব্যাপক রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে। ওই সময়ের সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, প্রশাসনের কর্মকর্তা, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের সদস্য, সাংবাদিক এবং বুদ্ধিজীবীদের অনেকেই গ্রেপ্তার হন।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের অনেকে আটক রয়েছেন। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা কয়েক ডজন ছাড়িয়েছে বলেও সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
তবে গ্রেপ্তারের সংখ্যা আরও বাড়তে পারত বলে মনে করেন অনেকে। কারণ, রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন পেশার কয়েক শ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে তাঁদের অনেকেই দেশ ছাড়ার সুযোগ পেয়েছেন বলেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর একটি হলো সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার। অতীতের তুলনায় একই সময়ে এত বেশি সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার বিষয়টি উদ্বেগ তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক সংগঠন ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ (সিপিজে)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কয়েকজন সাংবাদিক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন এবং আরও অনেক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগে মামলা হয়েছে। অন্যদিকে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জেলায় দায়ের হওয়া ফৌজদারি মামলায় বহু সাংবাদিককে অভিযুক্ত করার তথ্য উঠে এসেছে। তবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও সমালোচক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছিল।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান, শওকত মাহমুদ, শফিক রেহমান, রুহুল আমিন গাজীসহ কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা আলোচনায় আসে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। বর্তমান সময়ে আটক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মূলত ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—রাজনৈতিক মামলা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং বিরোধী মত দমনের অভিযোগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভূমিকা কী হওয়া উচিত?
‘রাজবন্দি’ শব্দটি হারিয়ে গেলেও রাজনৈতিক গ্রেপ্তার, মামলা এবং বিরোধী মতের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রশ্ন এখনো বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে আছে। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পালাবদলের পর যাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অনেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। তবে তাঁদের কতদিন কারাগারে থাকতে হবে, কিংবা বিচারপ্রক্রিয়া কোন পথে এগোবে—তা এখনো অনিশ্চিত।
অন্যদিকে, যাঁরা গ্রেপ্তার এড়িয়ে বিদেশে চলে গেছেন কিংবা দেশের ভেতরে আত্মগোপনে রয়েছেন, তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। কবে তাঁরা দেশে ফিরতে পারবেন বা স্বাভাবিক জীবনে ফিরবেন, তা নির্ভর করছে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার ওপর। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধেই জামিন অযোগ্য মামলা রয়েছে।
তবে আলোচনার বিষয় হলো, যাঁদের নিয়ে এত আলোচনা, তাঁদের অনেকেই রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তি হলেও তাঁদের ‘রাজবন্দি’ বলা হচ্ছে না। এমনকি আত্মগোপনে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক পরিভাষায় ব্যবহৃত ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকা’ শব্দটিও পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়। কারণ তাঁদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে নয়, বরং বিভিন্ন ফৌজদারি অভিযোগের ভিত্তিতে।
হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, অপহরণ, নির্যাতন, অর্থ পাচার, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ, সম্পত্তি দখল ও চাঁদাবাজির মতো অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—যাঁরা রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, তাঁরা কেন রাজবন্দির স্বীকৃতি পাচ্ছেন না?
রাজবন্দির প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কিংবা সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করে নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার কারণে গ্রেপ্তার হলে তাঁকে রাজবন্দি বলা হয়। যদিও এটি প্রচলিত রাজনৈতিক শব্দ, এর কোনো সর্বজনস্বীকৃত আইনি সংজ্ঞা নেই। সময় ও পরিস্থিতি অনুযায়ী বিভিন্ন দেশে শব্দটির ব্যবহারও ভিন্ন হয়েছে।
রাজবন্দির ধারণার সঙ্গে ‘বিবেকের বন্দি’ বা ‘প্রিজনার অব কনশেন্স’ ধারণাটিও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। ১৯৬১ সালে পর্তুগালের স্বৈরশাসক আন্তোনিও সালাজারকে ব্যঙ্গ করার অভিযোগে দুই ছাত্রকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা থেকে এই শব্দটির ব্যবহার শুরু হয় বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। পরে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা পিটার বেনেনসন এই ধারণাটিকে জনপ্রিয় করেন।
তবে ‘বিবেকের বন্দি’ ধারণার পরিধি শুধু রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। ধর্ম, সংস্কৃতি, মতপ্রকাশ কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের কারণে যাঁরা রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হন, তাঁরাও এই শ্রেণির মধ্যে পড়তে পারেন। অন্যদিকে রাজবন্দির ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো রাজনৈতিক বিশ্বাস ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড।
কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর যাঁরা কারাগারে রয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ মূলত রাজনৈতিক মত প্রকাশ বা সরকারের বিরোধিতা করার কারণে নয়; বরং ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে। তাঁদের অনেকেই আগের সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন বা সরকারের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রেখেছেন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটি নতুন কোনো চিত্র নয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে অপরাধমূলক অভিযোগকে সামনে এনেছে। সমালোচকদের মতে, অনেক সময় এসব মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়ার সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক সবসময়ই বিদ্যমান ছিল।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কিছু প্রতিবেদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা উল্লেখ করা হলেও বাংলাদেশকে সেই তালিকায় না রাখার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, আন্তর্জাতিক সংজ্ঞায় বাংলাদেশে বর্তমানে স্বীকৃত অর্থে রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যা নেই। আর এ কারণেই একসময় রাজপথে বহুল ব্যবহৃত ‘রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ কিংবা ‘জেলের তালা ভাঙব, অমুক নেতাকে আনব’—এ ধরনের রাজনৈতিক স্লোগানও এখন আর আগের মতো শোনা যায় না।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাই প্রশ্নটি রয়ে গেছে—রাজবন্দি শব্দটি কি হারিয়ে গেছে, নাকি বদলে গেছে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভাষার ধরন? সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক স্লোগান ও বক্তৃতার জায়গাতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। একসময় রাজপথ, পল্টন ময়দান কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য ও আন্দোলনের প্রধান ক্ষেত্র। এখন সেই জায়গার বড় অংশ দখল করেছে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক বক্তব্য, প্রচারণা ও প্রতিক্রিয়া মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে।
তবে এই নতুন রাজনৈতিক পরিসরে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবির চেয়ে প্রতিপক্ষকে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি বেশি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের প্রতিশোধমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘাত ও অপরাধপ্রবণতাকে উৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, অনেক সময় গ্রেপ্তার হওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিদের দীর্ঘদিন বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে থাকতে হয়েছে। পরে তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ভিত্তিতে সাধারণ অপরাধীর মতো বিচার ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
স্বাধীনতার পর গত কয়েক দশকের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সমাজে পরিচিত ও প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি, যাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, তাঁরা বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে আদালতের রায়ে দণ্ডিত হয়েছেন। আবার রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁদের কেউ কেউ নতুন সরকারের সময়ে মুক্তি পেয়েছেন বা রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত হয়েছেন। ফলে অপরাধ, রাজনীতি ও ক্ষমতার সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, একসময় দণ্ডিত ব্যক্তিরাই পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়ে আবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কারামুক্তির পর তাঁদের ঘিরে দলীয় নেতা-কর্মীদের উচ্ছ্বাস, সংবর্ধনা এবং রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়ার ঘটনাও বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন নয়। প্রশ্ন হলো, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হামলা, মামলা ও প্রতিশোধের যে প্রবণতা দেখা যায়, তা থেকে বাংলাদেশ কখন বেরিয়ে আসবে? এ নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
সমালোচকদের মতে, ক্ষমতায় থাকা দলগুলো অনেক সময় জনগণের কল্যাণের চেয়ে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করা এবং দলীয় নেতা-কর্মীদের সুবিধা দেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছে। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিরোধী পক্ষের ওপর দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক মামলার ব্যবহার—এসব অভিযোগ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকারের বিরুদ্ধে উঠেছে।
তবে ইতিহাস বলে, কোনো সরকারই স্থায়ী নয়। ক্ষমতা যত দীর্ঘ হোক, জনগণের ক্ষোভ ও অসন্তোষ একসময় রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। একটি সরকারের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে জমা হয় এবং উপযুক্ত সময়ে তার প্রকাশ ঘটে।
আওয়ামী লীগের শাসনামল নিয়েও একই ধরনের সমালোচনা রয়েছে। বিরোধীদের অভিযোগ, ক্ষমতার দীর্ঘ সময়ে দলটি বিভিন্ন বিষয়ে জনঅসন্তোষকে গুরুত্ব দেয়নি। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংসতা নিয়েও দলটির ভূমিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই ঘটনায় দায় ও জবাবদিহির প্রশ্নে দলটির অবস্থান জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা হলো, প্রতিশোধের রাজনীতি কোনো পক্ষের জন্যই দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনে না। একটি দলের কঠোর অবস্থানের জবাবে অন্য পক্ষও একই ধরনের আচরণ করলে সংঘাতের চক্র আরও দীর্ঘ হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতির বড় চ্যালেঞ্জ তাই শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন। প্রতিপক্ষকে দমন নয়, বরং মতের পার্থক্যকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জবাবদিহিমূলক রাজনীতি নিশ্চিত করাই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ।
- লেখক: আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু: যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক, সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

