প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির যুগে দক্ষ প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা দেশের শিল্পায়ন ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ লক্ষ্য পূরণে প্রকৌশল শিক্ষার সুযোগ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়া প্রয়োজন। আঞ্চলিক পর্যায়ে মানসম্মত প্রকৌশল শিক্ষা নিশ্চিত হলে একদিকে যেমন বৈষম্য কমবে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি হবে দক্ষ মানবসম্পদ।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০১৮ সালে দেশের চার বিভাগ—চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও রংপুরে সরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হয়। উদ্যোগটি সময়োপযোগী হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতি এখন বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। কারণ কোনো প্রকল্পের সফলতা শুধু পরিকল্পনা গ্রহণে নয়, বরং সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করে।
প্রকল্পটির প্রায় এক দশক পার হলেও বাস্তব অগ্রগতি খুবই সীমিত। এখন পর্যন্ত কয়েকটি প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কাজ এগোয়নি। প্রকল্পের সার্বিক বাস্তবায়ন অগ্রগতি মাত্র ২৫ শতাংশ। আর মোট বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৭ শতাংশ অর্থ। অর্থাৎ সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই প্রকল্পটি পিছিয়ে রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় কোনো প্রকল্প হাতে নেয়ার আগে সম্ভাব্যতা যাচাই অপরিহার্য। স্থানীয় চাহিদা, জমির প্রাপ্যতা, অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ, ব্যয়ের হিসাব, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা যাচাই না করে প্রকল্প গ্রহণ করলে পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়।
দেশে এমন বহু প্রকল্পের উদাহরণ রয়েছে, যেখানে যথাযথ সমীক্ষা ছাড়াই কাজ শুরু করা হয়েছে। পরে দেখা গেছে, প্রকল্পগুলো প্রত্যাশিত ফল দিতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় হয়েছে, আবার কোথাও কোথাও প্রকল্প দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করেছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ স্থাপন প্রকল্পেও একই ধরনের পরিকল্পনাগত দুর্বলতার চিত্র দেখা যাচ্ছে।
শুধু প্রকৌশল কলেজ নয়, উচ্চশিক্ষা খাতের অনেক প্রকল্পেও একই সমস্যা রয়েছে। দেশে একের পর এক বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজ অনুমোদন দেয়া হলেও সব ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় শিক্ষক, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, আবাসন সুবিধা এবং আধুনিক অবকাঠামো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
ফলে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থায়ী ক্যাম্পাস তৈরি হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। কোথাও অস্থায়ী ভবনে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম, কোথাও রয়েছে শিক্ষক সংকট। গবেষণার সুযোগ সীমিত থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান অনেক ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারছে না। এর ফলে উচ্চশিক্ষার প্রসার ঘটলেও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে না।
ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, একাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, সীমানাপ্রাচীর, ডরমিটরি, মাল্টিপারপাস ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় অংশের কাজ এখনো শুরু হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়নি। ফলে যেসব জায়গায় কয়েক বছর আগে শিক্ষার্থীদের পাঠদান হওয়ার কথা ছিল, সেসব জমি এখন স্থানীয়দের বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতিই নয়, বরং তদারকি ও জবাবদিহির ঘাটতিরও ইঙ্গিত দেয়।
বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে শিল্পায়ন, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করা জরুরি। সে কারণে আঞ্চলিক প্রকৌশল শিক্ষার বিস্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হতে পারে। কিন্তু দুর্বল পরিকল্পনা ও ধীর বাস্তবায়নের কারণে সেই সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
বিশ্বের অনেক দেশ পরিকল্পিতভাবে আঞ্চলিক প্রকৌশল শিক্ষা সম্প্রসারণ করে সফল হয়েছে। প্রতিবেশী ভারত এর একটি বড় উদাহরণ। দেশটি বিভিন্ন অঞ্চলে প্রকৌশল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আগে শিল্পের প্রয়োজন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শিক্ষক নিয়োগ, অবকাঠামো ও আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছে। এর ফল হিসেবে দেশটি প্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতে বড় ধরনের দক্ষ জনবল তৈরি করতে পেরেছে। বাংলাদেশের জন্যও এ অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বড় প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করা জরুরি।
এ ক্ষেত্রে সরকারের কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন। প্রথমত, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া বড় কোনো অবকাঠামো প্রকল্প অনুমোদন দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প শুরুর আগে জমি, নকশা, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, দীর্ঘসূত্রতা ও অনিয়মের জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-কে। নির্মাণকাজের মান, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে প্রকল্পগুলো দেশের উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। পরিকল্পনাহীন প্রকল্প নয়, প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। কারণ একটি ভুল পরিকল্পনা শুধু অর্থের অপচয় করে না, এটি দেশের উন্নয়নের গতিও দীর্ঘ সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে পারে।

