বাংলাদেশকে বলা হয় ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষার রয়েছে আলাদা গুরুত্ব। তীব্র গরমে যখন জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তখন বর্ষার বৃষ্টি নিয়ে আসে স্বস্তি। প্রকৃতিকে করে তোলে সতেজ ও প্রাণবন্ত।
বাংলাদেশে বর্ষার মূল নিয়ামক মৌসুমি বায়ু। বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্প নিয়ে আসা এই বায়ু দেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে হিমালয়ে বাধাপ্রাপ্ত হয়। এর ফলেই সৃষ্টি হয় ব্যাপক বৃষ্টিপাত। সাধারণত আষাঢ় ও শ্রাবণ বর্ষার প্রধান দুই মাস হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব শুরু হয় জ্যৈষ্ঠ থেকেই এবং স্থায়ী হয় আশ্বিন পর্যন্ত।
অঞ্চলভেদে বর্ষার স্থায়িত্বেও পার্থক্য দেখা যায়। হাওর এলাকায় বর্ষার প্রভাব ছয় মাসেরও বেশি সময় থাকতে পারে। অন্যদিকে দেশের মধ্যাঞ্চলে এটি স্থায়ী হয় প্রায় চার মাস। এই সময়ে মাঠ-ঘাট, নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে ভরে যায়। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায় প্রকৃতির ময়লা-আবর্জনা। সবুজ হয়ে ওঠে গাছপালা, দেখা দেয় নানা ফল ও ফুলের সমারোহ। তবে বর্ষা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের ঋতু নয়, এটি বাংলাদেশের কৃষির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়। দেশের কৃষি উৎপাদনের বড় অংশই নির্ভর করে এই মৌসুমের ওপর।
বর্ষার ধানেই আসে মোট উৎপাদনের বড় অংশ:
বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান। দেশের তিন প্রধান ধানের মধ্যে আউশ ও আমন চাষ হয় বর্ষা মৌসুমে। বোরো ধানের উৎপাদন হয় মূলত শীতকালীন সময়ে। বর্তমানে দেশের মোট ধান উৎপাদনের মধ্যে আউশের অবদান প্রায় ৮ শতাংশ এবং আমনের অংশ প্রায় ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ বর্ষাকালেই উৎপাদিত হয় মোট ধানের প্রায় ৪৬ শতাংশ।
একসময় বোরো উৎপাদন বাড়াতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে অতিরিক্ত সেচনির্ভরতা, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং পানির সংকটের কারণে এখন কৃষকদের মধ্যে আউশ ও আমনের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার বাড়ায় এসব ধানের উৎপাদনও বাড়ছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্ষার অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং শুষ্ক মৌসুমের খরায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা।
এবার বন্যার কারণে আউশ ধানের উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি এলাকায় আমনের বীজতলাও ক্ষতির মুখে পড়েছে। কোথাও কোথাও জমিতে চারা রোপণে দেরি হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আউশ উৎপাদনের প্রায় ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর আগে হাওরের বন্যায় বোরো উৎপাদনেও ক্ষতি হয়েছে। সব মিলিয়ে ছয় থেকে সাত লাখ টন পর্যন্ত চাল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বাজারে চালের সরবরাহ কমে দাম বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি বাড়তে পারে চাল আমদানির প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষাকালীন ধান উৎপাদন ধরে রাখতে বন্যাসহিষ্ণু আউশ জাত এবং প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সক্ষম আমনের জাত সম্প্রসারণ জরুরি। পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ব্যবহার বাড়াতে হবে। হাওর এলাকার জন্য প্রয়োজন গভীর পানিতে টিকে থাকতে সক্ষম আমনের জাত।
বর্ষার ফসল ক্ষতির ঝুঁকি কমাতে কৃষকদের জন্য শস্যবীমা চালুর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এতে কৃষকদের ক্ষতি সামাল দেওয়া সহজ হবে এবং বর্ষাকালীন কৃষিতে আগ্রহ বাড়বে।
সোনালি আঁশ পাটে নতুন সম্ভাবনা:
বর্ষাকালের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল পাট। একসময় বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস ছিল এই সোনালি আঁশ। এক পর্যায়ে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত এসেছিল পাট থেকে। বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতের আধিপত্যের কারণে পাটের অংশ কমে প্রায় ৩ শতাংশে নেমেছে।
তবে পরিমাণের দিক থেকে পাট উৎপাদন বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ১৭ লাখ একর জমিতে পাট চাষ হয় এবং উৎপাদন হয় প্রায় ৮৪ লাখ বেল পাট। পাট গবেষণায় বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য সাফল্য রয়েছে। উচ্চফলনশীল সাদা পাট, তোষা পাট, কেনাফ ও মেস্তার বেশ কিছু নতুন জাত উদ্ভাবন হয়েছে। মাঠপর্যায়ে এসব জাত ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ চলছে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন লবণাক্ততা, খরা ও ঠান্ডা সহনশীল পাটের জাত উদ্ভাবনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি গবেষণাগারে পাওয়া ফলন ও কৃষকের মাঠের ফলনের পার্থক্য কমাতে হবে। পাটের বড় একটি সমস্যা হলো জাগ দেওয়া বা পচানোর প্রক্রিয়া। পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি না থাকলে পাটের মান নষ্ট হয়। তবে এবার অতিবৃষ্টির কারণে খাল-বিল ও জলাশয়ে পর্যাপ্ত পানি থাকায় কৃষকরা পাট জাগ দেওয়ার সুবিধা পাচ্ছেন। ভালো দাম থাকায় পাটচাষিরাও লাভের আশা করছেন। তবে উন্নতমানের বীজের সংকট এখনো বড় সমস্যা। দেশের মাত্র প্রায় ২০ শতাংশ জমিতে দেশীয় বীজ ব্যবহার হয়। বাকি অংশে আমদানিকৃত বীজের ওপর নির্ভর করতে হয়।
সবজি উৎপাদনে বর্ষার চ্যালেঞ্জ:
বর্ষাকালে বিভিন্ন ধরনের সবজি উৎপাদন হয়। এর মধ্যে রয়েছে ঢেঁড়স, পটোল, মিষ্টিকুমড়া, চালকুমড়া, কাঁকরোল, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা, করলা, শসা, লালশাক ও পুঁইশাক। তবে অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে অনেক সময় সবজি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন বাজারে দাম বেড়ে যায়। বর্ষায় মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও টমেটোর সরবরাহ কম থাকায় এগুলোর দামও তুলনামূলক বেশি থাকে।
বর্তমানে প্রযুক্তির ব্যবহারে কিছু শীতকালীন সবজিও গ্রীষ্ম ও বর্ষায় উৎপাদন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আরও গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন অঞ্চলে হিমায়িত সংরক্ষণাগার তৈরি করা গেলে সারা বছর সবজির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। এবার ভারি বৃষ্টি ও বন্যায় কয়েকটি এলাকায় সবজি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শীতকালীন সবজি বাজারে আসা পর্যন্ত দাম কিছুটা বেশি থাকতে পারে।
ফল, ফুল ও মৎস্য খাতেও বর্ষার প্রভাব:
বর্ষাকালে দেশীয় ফলের সরবরাহ বাড়ে। আম, কাঁঠাল, আনারস, তাল, আমড়া, পেয়ারা ও সবুজ মালটা এ সময় বাজারে পাওয়া যায়। গবেষণার মাধ্যমে নতুন নতুন জাত উদ্ভাবন হওয়ায় ফল উৎপাদনও বাড়ছে। সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত সুবিধা বাড়ানো গেলে বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে আরও এগিয়ে যেতে পারে।
বর্ষায় প্রকৃতিতে দেখা যায় নানা ফুলের সমারোহ। কদম, কেয়া, কামিনী, বেলি, বকুল, শাপলা, হাসনাহেনাসহ বিভিন্ন ফুল এ সময় ফোটে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখন বাণিজ্যিকভাবে ফুল চাষ হচ্ছে। রপ্তানির সুযোগও তৈরি হয়েছে। এই খাতকে এগিয়ে নিতে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা ও বাজার সম্প্রসারণ।
বর্ষার পানিতে নদী-নালা ও উন্মুক্ত জলাশয় মাছের প্রজননের উপযোগী হয়ে ওঠে। এ সময় জেলেদের মাছ ধরার ব্যস্ততা বাড়ে। তবে অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে দীর্ঘদিন ধরে উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের উৎপাদন কমছে। এ পরিস্থিতিতে নিয়মিত পোনা অবমুক্ত করার কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন। এবার বন্যায় দক্ষিণাঞ্চলের অনেক মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুকুর থেকেও মাছ বেরিয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের পুনর্বাসনে সহায়তা প্রয়োজন।
বর্ষাকাল বাংলাদেশের কৃষির জন্য একদিকে সম্ভাবনার, অন্যদিকে ঝুঁকির সময়। এই মৌসুমে কম খরচে ধান, ফল, ফুল, সবজি উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়। মাছের উৎপাদন বাড়ে, পশু-পাখির খামারেও সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে অতিবৃষ্টি, বন্যা, রোগবালাই ও খাদ্য সংকট কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এ সময় পশু-পাখির রোগ প্রতিরোধ, সাইলেজ তৈরি এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সহায়তা দেওয়া জরুরি।
বর্ষায় সবুজ হয়ে ওঠে দেশের বনভূমিও। তাই এ সময় বেশি করে গাছ লাগানো এবং সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। সঠিক পরিকল্পনা, গবেষণা ও কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বর্ষাকাল বাংলাদেশের কৃষির বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে। এতে খাদ্য উৎপাদন বাড়বে, শক্তিশালী হবে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা।

