ড. ইজাজ হোসেন, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক অধ্যাপক। সম্প্রতি তিনি দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকট এবং সমাধানে করণীয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেছেন।
দেশে চাহিদার তুলনায় প্রাথমিক জ্বালানির অপ্রতুল মজুদ, আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো, বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়া, এমন নানামুখী সংকটে থাকা বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কী ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন?
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি মোটেই ভালো না। কারণ সমস্যাগুলো ব্যাপক এবং দিন দিন আরো জটিল হচ্ছে। আমরা এমন এক অবস্থায় আছি, যেখানে বলা যায় পানির ওপর কোনোভাবে মাথাটা টিকিয়ে রেখেছি। যদি নতুন করে আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন চলা সংঘাতের বিষয়টি যদি সাময়িকভাবে বাদও দিই, তার পরও আমাদের জ্বালানি সংকট অত্যন্ত গভীর। তার ওপর এ সংকট যুক্ত হওয়ায় চাপ আরো বেড়েছে। সম্প্রতি জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, গত কয়েক মাসে শুধু এ সংকটে জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে।
আমরা যেখানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কয়েক বিলিয়ন ডলার বাড়ানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করছি, সেখানে অল্প সময়ের মধ্যে ২ বিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে আমি মনে করি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকারকে অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশে কীভাবে জ্বালানি ব্যবহার হচ্ছে, কোন খাতে কতটা ব্যবহার হচ্ছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে সে অনুযায়ী নীতিগত দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
সরকারকে এক্ষেত্রে আরো দৃঢ় হতে হবে। আগের মতো চললে হবে না। বিদ্যুৎ খাতে এরই মধ্যে প্রায় ৭৫ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রয়েছে। এ বাস্তবতায় কৃচ্ছ্রসাধনের পাশাপাশি নীতিগত জায়গায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে জ্বালানি আমদানি করতে গিয়ে সরকারকে দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে না হয়।
সেক্ষেত্রে কী ধরনের নীতিগত পদক্ষেপকে সবচেয়ে জরুরি মনে করেন?
প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিল্প খাতে কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন ও কার্যকরভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, সেটি নিয়ে কাজ করা। এজন্য শিল্প উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বসে সমাধান বের করতে হবে। বিশেষ করে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, যেন অতিরিক্ত জ্বালানিনির্ভর শিল্পের কারণে পরিস্থিতির আরো অবনমন না ঘটে। কারণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্তমান জ্বালানির মূল্য তাদের পক্ষে বহন করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই সরকার আবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর কথা বলেছে। অথচ সরকার সবাইকে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহও করতে পারছে না। অর্থাৎ আমাদের এখন দুটি বড় সমস্যা—একটি সরবরাহ সংকট, অন্যটি উৎপাদনের ঘাটতি। যদি গ্যাস আমদানি করতেই হয়, তাহলে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের যে কার্যক্রম চলছে, সেগুলো আরো গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। প্রয়োজন হলে বর্তমান উদ্যোগের চেয়েও বাড়াতে হবে। আর নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এখন একেবারেই অপরিহার্য। সরকার এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এখনই তাদের মূল্যায়ন করার সময় হয়নি। তবে আমি মনে করি, এক বছর পর এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হয়েছে, সেটি মূল্যায়ন করা উচিত।
গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রেও অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। অনেক দিন ধরেই বলে আসছি, গৃহস্থালি খাতে পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহ ধীরে ধীরে বন্ধ করা উচিত। গৃহস্থালির চাহিদা এলপিজি বা বিদ্যুৎ ব্যবহার করে পূরণ করা যেতে পারে। স্থানীয় উৎপাদিত গ্যাস শিল্প ও উৎপাদনমুখী খাতে ব্যবহার করা বেশি যৌক্তিক।
একইভাবে যদি সিএনজির ব্যবহার (সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস) চালু রাখতেই হয়, তাহলে সেখানেও মূল্য সমন্বয় করতে হবে। অর্থাৎ জ্বালানির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি চুরি ও অপচয় কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ একদিকে দাম বাড়ানো হবে, অন্যদিকে চুরি চলতেই থাকবে—এভাবে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না।
শিল্প খাতেও বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বিবেচনা করতে হবে। কোথাও কয়লা ব্যবহার করা যেতে পারে, কোথাও বিদ্যুতায়ন বাড়ানো যেতে পারে। অর্থাৎ খাতভিত্তিক উপযুক্ত বিকল্প খুঁজে বের করাই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। মূলত এগুলোই আমার সুপারিশ।
একদিকে আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানির কথা বলছি, অন্যদিকে আবার কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর কথাও বলছি। এতে কি একটি নীতিগত দ্বন্দ্ব তৈরি হয় না?
যারা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলার নেতৃত্ব দিচ্ছে, তারাও নিজেদের প্রয়োজনের ক্ষেত্রে বাস্তবতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। আমরা উন্নয়নশীল দেশ। আমাদের আগে বাঁচতে হবে, তারপর পরিবর্তনের কথা ভাবতে হবে। আমার অবস্থানও সেটিই। এ মুহূর্তে আমাদের প্রথম লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অবশ্যই আমি নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপক্ষে নই, বরং সরকার যে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
তারা সেটি অর্জন করতে পারবে কিনা, সেটি সময়ই বলে দেবে। আমাদের অবশ্যই সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটাতে হবে। তবে বাস্তবতা হলো ভারত সৌরবিদ্যুতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করার পরও তাদের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ আসে সৌরবিদ্যুৎ থেকে। সে বাস্তবতায় আমরা যদি ২০ শতাংশের লক্ষ্য নির্ধারণ করি, তাহলে সেটি বাস্তবায়নে ব্যাপক প্রস্তুতি ও সক্ষমতা প্রয়োজন। তাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বিদ্যমান সংকট মোকাবেলার জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ প্রয়োজন তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে আলোচনার পরও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হচ্ছে না কেন?
নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রতিবন্ধকতাগুলো সম্পর্কে আমরা মোটামুটি সবাই অবহিত। যদি এসব প্রতিবন্ধকতা না থাকত, তাহলে সরকারকে ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্য ঘোষণা করতে হতো না, কিংবা বিভিন্ন সংস্থা ও এনজিওকে সৌর প্যানেলের ওপর কর প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনও করতে হতো না।
বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এখনই তাদের মূল্যায়ন করা ঠিক হবে না। অন্তত এক বছর সময় দিতে হবে। সরকার যদি সত্যিই ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের লক্ষ্য অর্জন করতে পারে, তাহলে এটি দেশের জ্বালানি খাতে একটি মৌলিক পরিবর্তন এনে দেবে।
সফলতা মূল্যায়নে অবশ্যই সময় প্রয়োজন। তবে এখন পর্যন্ত সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে যে নীতিগুলো নিয়েছে, সেগুলোকে কতটা কার্যকর?
বর্তমান নীতিগুলো যথেষ্ট নয়। সরকার কিছু কর-সুবিধা দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি মূলত এরই মধ্যে যাদের প্রকল্প বাস্তবায়নের অনুমতি রয়েছে, তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অথচ সৌর প্যানেলসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির আমদানিকে আরো ব্যাপকভাবে শুল্কমুক্ত করা উচিত ছিল। অন্তত দুই বছরের জন্য সম্পূর্ণ করমুক্ত সুবিধা দেয়া প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিগত সংস্কার। এমন একটি নীতিকাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যাতে ব্যক্তি ও বেসরকারি খাত সহজেই নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে পারে। এছাড়া জরুরি হলো নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা, বিশেষত ভূমিসংক্রান্ত নীতিতে পরিবর্তন এনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ করা।
পাশাপাশি সরকারকে এমন একটি আর্থিক সহায়তা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগকারীরা সহজ শর্তে অর্থায়ন পান। যেমন সরকার যদি বাজেটে ঘোষণা দিত যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে নির্দিষ্ট পরিমাণ তহবিল রাখা হয়েছে এবং এসব প্রকল্পে ঋণের সুদ কমানো হবে, তাহলে সেটি বড় ধরনের উৎসাহ তৈরি করত।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা। বাংলাদেশে যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। এ জটিলতা কমিয়ে কার্যকর ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা প্রয়োজন। এর বাইরে কার্বন ফাইন্যান্সিং নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। এ বিষয়ে একটি শক্তিশালী ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বা অফিস গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে দক্ষ জনবল থাকবে।
উদাহরণ হিসেবে বায়ুবিদ্যুৎ ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কথা ভাবা যেতে পারে। দেশে দুটোরই সম্ভাবনা রয়েছে, কিন্তু উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। অবশ্য এ অতিরিক্ত ব্যয়ের একটি অংশ আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নের মাধ্যমে পাওয়া সম্ভব। প্যারিস চুক্তির আওতায় এ ধরনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো সে সুযোগ যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। যদি আমরা কার্যকরভাবে কার্বন ফাইন্যান্সিং ব্যবহার করতে পারি, তাহলে অন্তত চার-পাঁচ হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে এখন বড় ধরনের লোকসানি খাত হিসেবে দেখা হয়। এ প্রেক্ষাপটে খাতটির পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ভর্তুকি কাঠামোর পুনর্বিন্যাস কতটা জরুরি?
শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতের লোকসানের বোঝা জনগণকেই বহন করতে হয়। কারণ ভর্তুকির অর্থও আসে জনগণের অর্থ থেকেই। এবার সরকার সরাসরি বিদ্যুতের দামই বাড়িয়েছে। যদিও এবার মানুষ সেটি মেনে নিয়েছে; কিন্তু প্রতিবার মেনে নেবে না। তাই বারবার শুধু দাম বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় কমাতে হলে পরিচালন দক্ষতা বাড়াতে হবে এবং ভর্তুকির কাঠামোও নতুন করে মূল্যায়ন করতে হবে। এখানেই সবচেয়ে বড় সংস্কারের প্রয়োজন।
সংস্কারের ক্ষেত্রে কী সুপারিশ দেবেন?
সরকারকে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। সরকার বলতে পারে যে পাঁচ বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি কমিয়ে আনা হবে। তবে ভর্তুকি কমানোর আগে কিছু সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে। যেমন আমাদের লাইফলাইন ট্যারিফ রয়েছে, যা অবশ্যই থাকা উচিত। সমস্যা হলো, দীর্ঘদিন ধরে এ ট্যারিফের কাঠামো বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে সমন্বয় করা হয়নি। ফলে লাইফলাইন ও সাধারণ ট্যারিফের মধ্যে ব্যবধান অনেক বেড়ে গেছে।
যদি বিপুলসংখ্যক গ্রাহক দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত কম দামে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, তাহলে বিদ্যুৎ খাতকে আর্থিকভাবে টেকসই করা কঠিন হবে। আবার সমাধান হিসেবে শুধু উচ্চ আয়ের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিলেও হবে না। বাস্তবে আমরা গরিব মানুষকে সহজে চিহ্নিত করতে পারি, কিন্তু ‘ধনী’ বলতে কাদের বোঝানো হবে, সেটি সবসময় স্পষ্ট নয়, অনেক সময় মধ্যবিত্ত পরিবারই সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে পড়ে। একটি পরিবার হয়তো বহু কষ্টে সঞ্চয় করে একটি এয়ার কন্ডিশনার কিনেছে। কিন্তু সেটির ভিত্তিতেই যদি তাকে উচ্চ আয়ের ভোক্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে সেটি ন্যায়সংগত হবে না। তাই ট্যারিফ কাঠামো পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে বাস্তবতা ও সামাজিক ভারসাম্য—দুটিই বিবেচনায় রাখতে হবে।
এছাড়া তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধাপে ধাপে বন্ধ করতে হবে। বিকল্প হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, লোডশেডিংকে পরিকল্পিতভাবে ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। অনেক সময় একদিন লোডশেডিং না হওয়াকে বড় সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সীমিত পরিসরে পরিকল্পিত লোডশেডিং করলে জ্বালানি ব্যয় কমে এবং সরকারের অর্থ সাশ্রয় হয়। তাই প্রয়োজন হলে পরিকল্পিত ও ন্যায়সংগতভাবে এটি পরিচালনা করতে হবে। তৃতীয়ত, সিস্টেম লস কমাতে হবে।
সর্বোপরি আমার প্রস্তাব হলো, পাঁচ বছরের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা উচিত। তখন সরকার প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে সে ভর্তুকি বহন করতে পারবে।
ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। এর মীমাংসাায় কী করণীয়?
ক্যাপাসিটি চার্জের বিষয়ে আমি দুটি চরম অবস্থানের কোনোটির সঙ্গেই একমত নই। একদল বলে, ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া উচিত নয়। অন্যদল বলে, এটি নিয়ে কিছুই করার নেই।
প্রশ্ন হলো, সরকার কীভাবে এ পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে কম ক্ষতিতে বেরিয়ে আসবে। আমার প্রস্তাব হলো, বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর মালিকদের সঙ্গে বসে নতুন করে আলোচনা করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে বড় বড় কোম্পানি বিভিন্ন কারণে জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে সমঝোতায় আসে। আমাদেরও সে ধরনের বাস্তববাদী আলোচনার পথে যেতে হবে।
সরকারের উচিত ছিল এসব কোম্পানির কাছ থেকে কিছু না কিছু আদায় করা। সেটি সরাসরি অর্থ হতে পারে, আবার অন্য ধরনের সামাজিক বা অবকাঠামোগত অবদানও হতে পারে। এক্ষেত্রে সরকার কার্যকরভাবে আলোচনা করতে পারেনি। ফলে একদিকে সরকারের ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে কোম্পানিগুলোর সঙ্গেও অপ্রয়োজনীয় বিরোধ তৈরি হয়েছে।
বাস্তবতা হলো, ক্যাপাসিটি চার্জ পুরোপুরি বন্ধ করা এখন সম্ভব নয়, কারণ এগুলো চুক্তিভিত্তিক দায়বদ্ধতা। তবে এটি কমানোর সুযোগ অবশ্যই রয়েছে। পাশাপাশি সরকারের উচিত হবে, এ কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে অন্যভাবে জাতীয় স্বার্থে কিছু সুবিধা আদায় করা।
আমাদের গবেষণা ও উন্নয়ন প্রয়োজন। অনেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গ্যাসের অভাবে বসে আছে; সংশ্লিষ্টদের বলা যেতে পারে—আপনারা গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন বা দক্ষতা বৃদ্ধির মতো খাতে বিনিয়োগ করুন। অর্থাৎ শুধু ক্যাপাসিটি চার্জ নেয়া নয়, দেশের জন্যও কিছু মূল্য সংযোজন করুন। অতীতের ভুল নিয়ে অনন্তকাল বিতর্ক করে লাভ নেই। এখন সরকার, বিদ্যুৎ কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে সামনে এগোতে হবে। সূত্র: বণিক বার্তা

