বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ২০১০ সালে বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের যাত্রার মধ্য দিয়ে এ খাতে ব্যবসায়িক উদ্যোগের সূচনা হলেও কাঙ্ক্ষিত গতি এখনো আসেনি। সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি রূপান্তরের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে বাস্তবায়নের পথে নীতি, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত নানা বাধা রয়ে গেছে।
এক নীতি সংলাপে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তারা বলেন, বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বর্তমানে বৈশ্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৪৯ শতাংশ আসছে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। বিপরীতে বাংলাদেশে এ উৎসের অবদান এখনো মাত্র আড়াই থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। মোট স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার হিসাবেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ প্রায় ৫ শতাংশ। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয় বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে রূপান্তরের পথ কীভাবে দ্রুত করা যাবে।
শিল্প খাতের দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্যোক্তারা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের আগ্রহ রয়েছে দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু বাস্তব বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকল্প, নিশ্চয়তা ও কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। তাদের দাবি, স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক (আইপিপি) মডেলে এ পর্যন্ত প্রায় ৫৫টি দরপত্র আহ্বান করা হলেও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ প্রত্যাশিত মাত্রায় আসেনি। এর অন্যতম কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করছেন অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তার অভাব এবং ব্যাংক ঋণের উপযোগী নথির ঘাটতিকে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, অনেক বিদেশি বিনিয়োগকারী নিয়মিত যোগাযোগ করলেও তাদের সামনে কার্যকর বিনিয়োগের সুযোগ তুলে ধরা যাচ্ছে না। কারণ বিনিয়োগের জন্য পর্যাপ্ত প্রকল্পই নেই।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) মডেল নিয়েও রয়েছে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ। উদ্যোক্তাদের মতে, এখন পর্যন্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পূর্ণাঙ্গ পিপিপি প্রকল্পের দৃশ্যমান উদাহরণ তৈরি হয়নি। অন্যদিকে মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট (এমপিপি) নিয়েও নানা জটিলতা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সিঙ্গেল লাইন ডায়াগ্রাম (এসএলডি) এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবহারের খরচ বা হুইলিং চার্জ এখনো পুরোপুরি নির্ধারিত হয়নি। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য এ খাতেও অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতেও করের চাপ:
সৌরবিদ্যুতের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের কথা বলা হলেও এখানেও নীতিগত বাধার অভিযোগ রয়েছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, একদিকে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে কর সুবিধার কথা বলছে, অন্যদিকে যন্ত্রপাতি আমদানিতে করের চাপ বাড়ছে। আগে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সরঞ্জাম আমদানিতে যেখানে ১ শতাংশ শুল্ক ছিল, বর্তমানে তা বেড়ে ১৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করছেন তারা।
এর মধ্যে ১৫ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে ২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর যুক্ত হয়েছে। উদ্যোক্তাদের প্রশ্ন, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কর ছাড় দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে নতুন করে অগ্রিম আয়করের চাপ কেন তৈরি করা হচ্ছে। তাদের মতে, ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) এবং অগ্রিম আয়করের কারণে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আগ্রহ হারাচ্ছে।
নীতির অসঙ্গতিতে পিছিয়ে যাচ্ছে রূপান্তর:
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে সরকারের লক্ষ্য ও বাস্তব নীতির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। একদিকে শূন্য করের ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নানা শর্তের কারণে বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসতে পারছেন না। তারা বলেন, কর বাড়িয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দাম কমানোর আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ করের চাপ শেষ পর্যন্ত উৎপাদন খরচ বাড়ায়।
উদ্যোক্তাদের মতে, জ্বালানি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। শুধু ঘোষণা দিয়ে নয়, বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের বড় সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে সমুদ্রভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ও অফশোর উইন্ড বা সমুদ্রভিত্তিক বায়ুবিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণা ও পরিকল্পনা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। তাদের মতে, বিশ্বের অনেক দেশ সমুদ্র এলাকায় বড় আকারের নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বাংলাদেশেরও এ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে বলছেন, জ্বালানি রূপান্তরে দেরি হলে শিল্প খাত বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহে সংকট দেখা দিলে তার প্রভাব সরাসরি শিল্প উৎপাদনে পড়ে। তাদের মতে, কয়লা ও গ্যাসের সম্ভাবনা যাচাইয়ের পাশাপাশি এখনই নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। কারণ বিশ্ব যে পথে এগোচ্ছে, বাংলাদেশকেও সেই পথেই দ্রুত এগোতে হবে।
তবে বিনিয়োগকারীদের প্রধান প্রশ্ন এখনো একই—নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ থাকলেও প্রকল্প কোথায়? আইপিপি, এমপিপি কিংবা পিপিপি—কোনো ক্ষেত্রেই যদি পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি না হয়, তাহলে বিনিয়োগ আসবে কীভাবে?
- মোস্তফা আল মাহমুদ: সভাপতি, বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)।

