বিশ্বকাপ মানেই শুধু ৯০ মিনিটের ফুটবল নয়। একটি বল, ২২ জন খেলোয়াড় আর একটি মাঠের বাইরেও এই আয়োজন ঘিরে চলে বিশাল এক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। এখানে প্রতিযোগিতা হয় ব্যবসা, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ড, পর্যটন, আবেগ ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের।
বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ একই সময়ে একটি ম্যাচ দেখে, একটি গোলের আনন্দ ভাগ করে নেয়, আবার একটি হারে সমানভাবে হতাশ হয়। রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা আন্তর্জাতিক উত্তেজনার মধ্যেও ফুটবল এমন একটি অভিজ্ঞতা তৈরি করে, যা মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে।
তবে এই আবেগের আড়ালে রয়েছে কয়েক হাজার কোটি ডলারের একটি শক্তিশালী বাণিজ্যিক কাঠামো। ফিফা বিশ্বকাপ এখন শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন নয়, এটি আধুনিক অর্থনীতিরও একটি বড় উদাহরণ। যেখানে মানুষের আগ্রহ, প্রযুক্তি, ব্র্যান্ড মূল্য, সম্প্রচার অধিকার ও ভোক্তার অভিজ্ঞতাকে অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করা হয়।
ক্রীড়া অর্থনীতিবিদ স্টেফান সিমানস্কি তার ২০০৯ সালের বই Playbooks and Checkbooks: An Introduction to the Economics of Modern Sports-এ দেখিয়েছেন, আধুনিক ক্রীড়া আর শুধু মাঠের প্রতিযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাজার, গণমাধ্যম, বিনিয়োগ, জননীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবাহ। বিশ্বকাপ এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি।
বিশ্বকাপের আয় বাড়ছে দ্রুত গতিতে:
ফিফার আর্থিক হিসাব দেখলেই বোঝা যায়, বিশ্বকাপ কীভাবে একটি বিশাল বাণিজ্যিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের চক্রে ফিফার আয় ছিল ৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের চক্রে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭৫৭ কোটি ডলারে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সময়ের জন্য ফিফার সম্ভাব্য বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ শেষে এই আয় ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বকাপ যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে, এর বাণিজ্যিক মূল্যও তত বেড়েছে। এই বিশাল অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি, আতিথেয়তা, পণ্য বিপণন ও মেধাস্বত্ব। ফিফার সবচেয়ে বড় সম্পদ কোনো স্টেডিয়াম বা অবকাঠামো নয়; বরং ‘বিশ্বকাপ’ নামের ব্র্যান্ড এবং এর সঙ্গে যুক্ত কোটি মানুষের আবেগ।
আবেগই এখন অর্থনৈতিক সম্পদ:
একসময় অর্থনীতির মূল শক্তি ছিল কারখানা, যন্ত্রপাতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে অনেক প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি, ধারণা ও মানুষের আস্থা। অ্যাপল, ডিজনি, নেটফ্লিক্স কিংবা গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের শক্তি শুধু তাদের ভৌত সম্পদে নয়; বরং প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা ও ব্যবহারকারীর সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্পর্কের মধ্যে। ফিফার ক্ষেত্রেও একই বিষয় কাজ করছে। বিশ্বকাপের ব্র্যান্ড মূল্য, সম্প্রচার অধিকার এবং সমর্থকদের দীর্ঘদিনের আনুগত্যই এর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘মনোযোগের অর্থনীতি’। ডিজিটাল যুগে মানুষের মনোযোগ নিজেই একটি মূল্যবান সম্পদ। বিশ্বকাপ চলাকালে কোটি কোটি মানুষ ম্যাচ দেখে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা করে, ভিডিও দেখে এবং দল নিয়ে নানা ধরনের কনটেন্ট তৈরি করে। এই বিপুল দর্শক আগ্রহ বিজ্ঞাপনদাতা, সম্প্রচারকারী ও স্পন্সরদের কাছে বড় বাজার তৈরি করে।
৯০ মিনিটের খেলা, কিন্তু ব্যবসা চলে সারা বছর:
বিশ্বকাপ এখন আর শুধু মাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তির কারণে একটি ম্যাচের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। ডিজিটাল সম্প্রচার, অনলাইন স্ট্রিমিং, মোবাইল অ্যাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশ্লেষণধর্মী অনুষ্ঠান, ফ্যান্টাসি ফুটবল ও বিভিন্ন ধরনের অনলাইন কনটেন্ট বিশ্বকাপকে ২৪ ঘণ্টার বৈশ্বিক অভিজ্ঞতায় পরিণত করেছে।
একটি ম্যাচ শেষ হওয়ার পরও তার আলোচনা, ভিডিও, বিশ্লেষণ ও দর্শকের প্রতিক্রিয়া চলতে থাকে। ফলে একটি ম্যাচের অর্থনৈতিক মূল্য শুধু ৯০ মিনিটে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্বকাপ একই সঙ্গে ‘অভিজ্ঞতার অর্থনীতি’রও বড় উদাহরণ। একজন দর্শক শুধু একটি আসনের টিকিট কেনেন না, তিনি কেনেন একটি স্মৃতি, একটি অনুভূতি এবং একটি পরিচয়ের অংশ হওয়ার সুযোগ।
স্টেডিয়ামে জাতীয় সংগীতের মুহূর্ত, প্রিয় দলের জার্সি পরে হাজারো মানুষের সঙ্গে উদযাপন কিংবা বিশ্বকাপের শহরে কয়েক দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করে। এই আবেগের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে বিশেষ টিকিট, বিলাসবহুল আতিথেয়তা ও করপোরেট প্যাকেজের বাজার।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—এই খেলা এখন আসলে কার? ফুটবল ঐতিহাসিকভাবে সাধারণ মানুষের খেলা। একটি বল থাকলেই যে কেউ খেলতে পারে। অর্থনৈতিক অবস্থান বা সামাজিক পরিচয় কখনোই ফুটবল ভালোবাসার শর্ত ছিল না কিন্তু বাণিজ্যিকীকরণের কারণে বিশ্বকাপের সরাসরি অভিজ্ঞতা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে।
টিকিটের দাম ছাড়াও রয়েছে ভ্রমণ ব্যয়, বিমান ভাড়া, আবাসন, স্থানীয় পরিবহন ও অন্যান্য খরচ। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের মধ্যবিত্ত ফুটবলপ্রেমীদের জন্য মাঠে বসে বিশ্বকাপ দেখা এখন অনেক সময় বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ। করপোরেট আতিথেয়তাও এই পার্থক্যকে স্পষ্ট করেছে। বিশেষ আসন, আলাদা প্রবেশ সুবিধা, খাবার ও অন্যান্য সুবিধাসহ তৈরি হচ্ছে উচ্চমূল্যের প্যাকেজ। ব্যবসার ভাষায় এটি ভোক্তার সক্ষমতা অনুযায়ী মূল্য নির্ধারণের কৌশল। এতে আয় বাড়ে, কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে—জনগণের খেলা হিসেবে ফুটবলের সহজলভ্যতা কতটা বজায় থাকছে?
প্রযুক্তি তৈরি করেছে নতুন বৈপরীত্য:
বিশ্বকাপে সরাসরি উপস্থিত হওয়া আগের তুলনায় ব্যয়বহুল হলেও ঘরে বসে বিশ্বকাপ দেখা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে সহজ। টেলিভিশন, অনলাইন সম্প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তের মানুষকে একই সময়ে খেলার সঙ্গে যুক্ত করছে অর্থাৎ দর্শক হিসেবে ফুটবল আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে, কিন্তু সরাসরি মাঠে উপস্থিত হওয়ার সুযোগ অনেকের জন্য আরও সীমিত হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য বিশ্বকাপের অর্থনৈতিক শিক্ষা:
বিশ্বকাপের অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা দেয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে তৈরি পোশাক শিল্প ও শ্রমনির্ভর উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে এগিয়েছে। এই খাত এখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা শুধু কম খরচে উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। জ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, দক্ষতা, ব্র্যান্ড তৈরি এবং মানুষের অভিজ্ঞতা নির্ভর অর্থনীতি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশকে তাই উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার পাশাপাশি জ্ঞান ও সেবাভিত্তিক খাতেও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ডিজিটাল দক্ষতা, সৃজনশীল শিল্প, পর্যটন, ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক মানের নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।
বিশ্বকাপ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—সাফল্য কখনো হঠাৎ আসে না। একটি শক্তিশালী ফুটবল দলের পেছনে থাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, তৃণমূল পর্যায়ের প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচিং, প্রতিভা অনুসন্ধান এবং শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।
একই বিষয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। সড়ক, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো প্রয়োজন। কিন্তু এর পাশাপাশি শিক্ষা, গবেষণা, প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি না হলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো কঠিন। তরুণদের শুধু চাকরির সুযোগ দিলেই হবে না, তাদের এমন দক্ষতা দিতে হবে যাতে তারা পরিবর্তিত বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—অর্থনৈতিক সাফল্য শুধু আয়ের পরিমাণ দিয়ে বিচার করা যায় না। একটি আয়োজন বিপুল অর্থ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই সুবিধা যদি সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে তার সামাজিক মূল্য কমে যায়। একইভাবে একটি দেশের অর্থনীতি দ্রুত বড় হতে পারে, কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল যদি সবার কাছে সমানভাবে না পৌঁছায়, তাহলে উন্নয়নের উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না।
তাই প্রশ্ন শুধু কত অর্থ তৈরি হচ্ছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো সেই অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় কত মানুষ অংশ নিতে পারছে, কতটা বৈষম্য কমছে এবং মানুষ নিজেদের সেই সাফল্যের অংশ মনে করছে কি না। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের অর্থনীতি শুধু ফুটবলের গল্প নয়। এটি ভবিষ্যতের অর্থনীতিরও প্রতিচ্ছবি। যেখানে কারখানা ও অবকাঠামোর পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রযুক্তি, সৃজনশীলতা, প্রতিভা, ব্র্যান্ড, আস্থা ও মানুষের অংশগ্রহণ।
বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জও তাই শুধু প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়। এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তোলা, যা হবে উদ্ভাবনী, উৎপাদনশীল এবং একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক। কারণ বিশ্বকাপ হোক কিংবা অর্থনীতি—শেষ প্রশ্ন একটাই, সাফল্যের অংশীদার হতে পারছে কি সাধারণ মানুষ?
- ফাহমিদা খাতুন: অর্থনীতিবিদ ও নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)

