আর্থিক ব্যবস্থাপনায় বর্তমানে সর্বাধিক চর্চিত “বাংলা কিউআর কোড” হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক (কেন্দ্রীয় ব্যাংক) কর্তৃক প্রবর্তিত অন-লাইন ভিত্তিক গ্রাহক-প্রতিষ্ঠানের পন্য-সেবা মূল্য পরিশোধের একক ও অভিন্ন মাধ্যম। প্রকৃতপক্ষেই এই অনন্য মাধ্যম প্রবর্তনের মাধ্যমে কিছু একচেটিয়া ‘কিউআর কোড’ প্রথার উলম্ফন রণভঙ হয়েছে।
যুগপৎভাবে বিভিন্ন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহে আন্ত:লেনদেনের সুযোগ প্রতিষ্ঠিত ও বাস্তবায়ন হয়েছে “বাংলা কিউআর কোড” প্রচলনের মাধ্যমে, যা অনেকদিন ধরেই অধরা হিসেবে চিহ্নিত ছিলো। “বাংলা কিউআর কোড” মাধ্যম বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার এর পারস্পারিক সংযোগে অন-লাইন ভিত্তিক আর্থিক লেনদেনের একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে, তা’ নির্দ্বিধায় বলা যায়।
বাংলা কিউআর কোড” হচ্ছে গ্রাহক/ভোক্তার আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থাপনা করার একক স্বীকৃত মাধ্যম, যার ফলে গ্রাহক/ভোক্তা-বিক্রেতা/সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান একটি বিশেষ-সতন্ত্র-বিশেষ লোগোযুক্ত ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করেই তার ঈস্পিত লেনদেন স্বাচ্ছন্দে করতে পারে; প্রকৃতপক্ষে এই লেনদেন কোডের কোন নির্দিষ্ট ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের নিজস্ব কিউআর কোড (Proprietary Code) এর ‘এক চেটিয়া’ কারবারের যবনিকা টানা হয়েছে। গ্রাহক/ভোক্তাসকল তাদের মুঠোফোনের যেকোন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারের সমর্থিত Apps ব্যবহার করে “বাংলা কিউআর কোড” এর মাধ্যমে (gateway) চাহিদামাফিক লেনদেন করতে পারছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক তথা কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর নির্দেশনা মোতাবেক ১মা জুলাই ২০২৬ ইং থেকে প্রতেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স প্রাপ্তি কিংবা নবায়নেও এই “বাংলা কিউআর কোড” গ্রহণের বাধ্যবাদকতা রয়েছে। এহেন নীতিতে, দেশের সামগ্রিক কর্তৃক অন-লাইন ভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা আরও জবাবদিতিার আওতায় আসবে মর্মে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
এক্ষেত্রে “বাংলা কিউআর কোড” এর মাধ্যমে (gateway) লেনদেনের রেকর্ড কিংবা ভবিষ্যত নীরিক্ষার বাস্তবতার আলোকে গ্রাহক/ভোক্তাসকলের লেনদেনের তথ্য-উপাত্ত আরও নতুন ও গ্রাহক বান্ধব সেবা/পণ্যের সূচনা করা সম্ভবপর হবে। গ্রাহকবান্ধব “বাংলা কিউআর কোড” সম্বলিত লেনদেন বাস্তবায়নের ফলে দেশ ও সমাজ ক্রমশ:ই নগদ লেনদেনবিহীন সমাজে (Cashless society) রূপান্তর হবে বলে ধারনা করা যাচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে নগদ লেনদেনবিহীন সমাজ বিনির্মানে লেনদেনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে বাংলাদেশ ব্যাংক সময়ের দাবীতে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ও তা বাস্তবায়নে নীতিমালা প্রনয়ন করেছে। গ্রাহক/ভোক্তাদের “বাংলা কিউআর কোড” ব্যাপক আগ্রহ-সমাদৃত-স্বাচ্ছন্দতা বিবেচনা করে বিভিন্ন ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস, পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডার প্রতিষ্ঠানসমুহ তাদের মাচেন্ট (ব্যবসা প্রতিষ্ঠান) সংগ্রহে ইতিবাচকভাবে প্রতিযোগিতা করছে, ফলশ্রুতিতে গ্রাহক/ভোক্তাদের লেনদেন করার ক্ষেত্রও ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্যহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। “বাংলা কিউআর কোড” ব্যবহারের পরিসংখ্যানে ক্রমশ: দৃশ্যত হচ্ছে যে, গ্রাহক/ভোক্তা তাদের ব্যাংক ‘ডেবিট কার্ড (গ্রাহক ব্যাংক হিসাবের সাথে যুক্ত) বহন কিংবা ব্যবহার হ্রাস করে নতুন মাধ্যমকে স্বাগত জানাচ্ছে।
সর্বস্তরে “বাংলা কিউআর কোড” ব্যবহার করে প্রকৃতপক্ষে দেশ কিংবা সমাজের উন্নয়নের চাকা সচল রাখা যাবে। প্রশ্ন থেকে যায় কিভাবে? এই উত্তর জানা প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। আসুন একটু খতিয়ে দেখি-
- এক “কিউআর কোড”, এক বাংলাদেশ
- এক “বাংলা কিউআর কোড” সব প্রতিষ্ঠানের জন্য
- “বাংলা কিউআর কোড” এর মাধ্যমে নগদবিহীন লেনদেন সমাজ
মূল সুবিধাসমূহ:
- আর্থিক অন্তর্ভূক্তি (Financial Inclusion) বৃদ্ধি
- নিরাপদ ও দ্রুত লেনদেন
- লেনদেনে স্বচ্ছতা (মুআমালাত) বৃদ্ধি
- নগদবিহীন লেনদেনের গতিপথ নিশ্চিতভাবে নথিভূক্ত
- ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য কম খরচের সমাধান
- সরকারের রাজস্ব ও সেবা আদায় সহজ করা
- ই-কমার্স ও ডিজিটাল ব্যবসা প্রসার
- জাতীয় ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো শক্তিশালী করা
- ডিজিটাল Audit Trail তৈরী করা
- করের আওতা প্রসারিত করা
- লেনদেনের বিশ্লেষণ করে চাহিদামাফিক পণ্য/সেবার উদ্ভাবন
- আর্থিক অপরাধ চিহ্নিত করা
- মানি-লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের প্রতিরোধ বা চিহ্নিত করা
- Real-time Transaction Monitoring সহজ করা
- Fraud Detection ও Anomaly Detection সহজ করা
- Data Analytics Model কার্যকর করা
- Artificial Intelligence (AI) ভিত্তিক মানি-লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়নের প্রতিরোধ
- লেনদেনের বিবাদ দালিলিক প্রমাণিক
- Regulatory Reporting ও Compliance শক্তিশালী করা
বাংলা কিউআর কোড” বাস্তবায়নের ফলে ডিজিটার আর্থিক লেনদেনের নথি দেশের ‘কর’ আহরণে ভূমিকা রাখবে, যা Tax-Budget অনুপাত বৃদ্ধিতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা Bank-led Model হওয়ায় “বাংলা কিউআর কোড” (gateway) ব্যবহারে দেশের ব্যাংকিং খাতে তারল্য প্রবাহ ইতিবাচক হবে এবং গ্রাহক/ভোক্তারা (যাদের প্রচলিত ব্যাংকিং হিসাব নেই) তারাও হিসাব খোলায় ও সঞ্চয়ে আগ্রহী হবেন। এভাবে সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টাতে, বাংলাদেশ দৃপ্ত পায়ে লেনদেনবিহীন সমাজে (Cashless society) রূপান্তর হবে।
লেখক: ম. রাশেদুল হাসান খান, সিএএমএস
স্নাতকোত্তর (তথ্য-প্রযুক্তি), এমবিএ (ব্যাংকিং ও বীমা), স্নাতকোত্তর (পরিসংখ্যান)।
ফার্স্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট,
গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি,
মানি-লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ বিভাগ।

