বণিক বার্তা আয়োজিত পলিসি কনক্লেভে নিজের বক্তব্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের নানা সংকট তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি। তিনি বলেন, দীর্ঘ সময়ের অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের জ্বালানি খাত এখন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সেই সক্ষমতা কাজে লাগানোর মতো জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি।
তিনি বলেন, কনক্লেভের শুরু থেকে উপস্থিত থাকতে না পারায় কিছুটা আক্ষেপ রয়েছে। সরকারি দায়িত্ব পালনের কারণে অনুষ্ঠানে দেরিতে পৌঁছাতে হয়েছে। তবে পরে আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। এ ধরনের আয়োজন নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বক্তব্যে তিনি দেশের সামগ্রিক প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বিষয়ও তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিনের শাসন কাঠামোর কারণে বিচার বিভাগ, আইন প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থায় নানা দুর্বলতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন খাতের ব্যবস্থাপনায়।
তিনি বলেন, দায়িত্ব পাওয়ার পর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অতীতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো হলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়া হয়নি। তার মতে, বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। কিন্তু এই সক্ষমতা কাজে লাগাতে পর্যাপ্ত গ্যাস ও জ্বালানি প্রয়োজন। এ জন্য নিয়মিত অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং জ্বালানি উৎস বাড়ানোর উদ্যোগ জরুরি ছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, গত ১৭ বছরে দেশে জ্বালানি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। এমনকি একটি নতুন কূপ খননও করা সম্ভব হয়নি। ফলে দেশকে ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
তার বক্তব্য, শুধু জ্বালানি আমদানি করলেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনাও থাকতে হবে। এসব বিষয়ে আগে থেকে প্রস্তুতি থাকলে বর্তমান সংকট অনেকটাই এড়ানো যেত।
দেশের গ্যাস সংকটের পেছনে এলএনজি অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতাকেও বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। বর্তমানে দেশে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) কার্যকর রয়েছে বলে জানান তিনি। সম্প্রতি একটি এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটার পর গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, সৌভাগ্যক্রমে এলএনজিবাহী জাহাজটি তখনো টার্মিনালে পৌঁছায়নি। বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত।
তার ভাষ্য, ওই ঘটনার পর গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ গ্যাস সমস্যায় পড়েছে। অনেক সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও ক্ষুব্ধ মানুষ সড়ক অবরোধও করেছে। তিনি বলেন, গ্যাস সংকট এখন অনেক মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নতুন অবকাঠামো তৈরি এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
খুলনার তিনটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র বর্তমানে অচল রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভোলার গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে এসব কেন্দ্র আবার চালু করা সম্ভব হতে পারে। তবে ভোলার গ্যাস পরিবহনের জন্য পাইপলাইন নির্মাণের আগে দীর্ঘমেয়াদি হিসাব করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি। পাইপলাইন নির্মাণে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেটি ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর হবে এবং গ্যাসের মজুদ কতদিন থাকবে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো তৈরি করলেই হবে না, বিনিয়োগের দীর্ঘমেয়াদি সুফল নিশ্চিত করাও জরুরি।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নিয়েও সমস্যার কথা তুলে ধরেন তিনি। তার মতে, কয়লা খনি ও বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মধ্যে সমন্বয় থাকলে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হতো। তিনি বলেন, দেশে উন্মুক্ত কয়লা খনি না থাকায় ভূগর্ভস্থ খনি থেকে সীমিত পরিমাণ কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কয়লা আহরণ করা যায়।
তার বক্তব্য, কয়লাখনির কাছাকাছি কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্র থাকলেও পর্যাপ্ত কয়লা সরবরাহ না থাকায় অনেক সময় এসব কেন্দ্র বন্ধ রাখতে হয়। ফলে একদিকে কয়লার মজুদ বাড়ে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়।

