দক্ষিণ এশীয় ভূরাজনীতির আকাশে অবিশ্বাসের কালো মেঘ যখন ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছিল, ঠিক তখনই ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক করিডরে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব কৌশলগত মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। দিল্লির ঐতিহ্যবাহী ‘চাণক্যনীতি’ এবং সাউথ ব্লকের দীর্ঘদিনের আধিপত্যবাদী মনস্তত্ত্বের বিপরীতে ঢাকার নতুন আন্তর্জাতিক মানের সার্বভৌম ও প্রজ্ঞাবান কূটনীতি আজ দিল্লিকে এক কঠিন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি হঠাৎ করেই এক প্রতিবেদনে দাবি করে—আগামী সপ্তাহের শেষার্ধে (২২-২৩ আগস্ট) ভারত সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যা নাকি ভারতের স্বাধীনতা দিবসের ঠিক এক সপ্তাহ পর অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে ঢাকাকে সম্পূর্ণ অগোচরে রেখে এবং কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ভারতীয় মিডিয়াকে ব্যবহার করে এ ধরনের আগাম খবর ছড়িয়ে দেওয়ার নেপথ্যে দিল্লির চাণক্য কূটনীতির এক পুরোনো চাল স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নীতিনির্ধারকদের কৌশল ছিল— একতরফা খবর প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় বার্তা তৈরি করা এবং ঢাকার ওপর সফর নিশ্চিত করার মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।
কিন্তু সেগুনবাগিচা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী ও সার্বভৌম প্রজ্ঞাবান কূটনীতির নজিরবিহীন জবাবে দিল্লির এই কৌশল মুহূর্তেই ভেস্তে যায়। ঢাকা অত্যন্ত স্পষ্ট ও দ্বিধাহীন কণ্ঠে জানিয়ে দিয়েছে—অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়া ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের কোনো সুযোগ নেই। এ ঘোষণার পর এনডিটিভির সেই ‘খবর’ কেবল অপপ্রচার হিসেবেই চিহ্নিত হয়নি, বরং সাউথ ব্লকের চাণক্যনীতি এখন ঢাকা ও দিল্লির নিজস্ব ভূরাজনৈতিক কোর্টে এক কঠিন মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষায় আটকে গেছে।
এখানে বলে রাখা ভালো যে, ঐতিহাসিকভাবে ভারত তার প্রতিবেশী নীতিতে সামদান-ভেদ-দণ্ড—অর্থাৎ চাণক্যনীতির কৌশল প্রয়োগ করে নিজের আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখতে অভ্যস্ত। তবে গণঅভ্যুত্থান-উত্তর বাংলাদেশে সেই পুরোনো নীতি প্রয়োগ করতে গিয়ে দিল্লি বড় ধরনের কৌশলগত ভুল হিসাব-নিকাশ করে ফেলেছে।
ঢাকার বর্তমান কূটনৈতিক বার্তার মূল বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার— একটি সফল ও মর্যাদাপূর্ণ সরকারপ্রধান পর্যায়ের সফর কেবল প্রথাগত আলোকচিত্র, যৌথ ঘোষণা কিংবা আনুষ্ঠানিক নৈশভোজের বিষয় হতে পারে না। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক আস্থা এবং প্রকৃত ‘অনুকূল পরিবেশ’। ঢাকা নয়া দিল্লিকে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হলে দুটি মৌলিক শর্তে ভারতকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে-
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে দিল্লির মাটিতে বসে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সরকারের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক অডিওবার্তা বা সংবাদ সম্মেলন করার সুযোগ দেওয়াকে ঢাকা চরম অসৌজন্যমূলক ও সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে দেখেছে। হস্তান্তরের আবেদনের পর আইনি ও কূটনৈতিক পদক্ষেপ না নিয়ে তাকে আশ্রয় দিয়ে রাখা এবং রাজনৈতিক তৎপরতা চালাতে দেওয়া দুই দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্কের জন্য বড় বাধা। সুতরাং হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণরূপে নিষ্ক্রিয়করণ অথবা প্রত্যর্পণ ছাড়া এ বাধা দূর হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
ইনকিলাব মঞ্চের আলোচিত নেতা শহীদ ওসমান হাদি হত্যায় অভিযুক্ত আসামি ও পলাতক অপরাধীদের অবিলম্বে দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ঢাকার হাতে তুলে দিতে হবে।
এই দুটি মৌলিক ইস্যুতে ভারতের সুস্পষ্ট ও শক্ত অবস্থান দেখতে চায় বাংলাদেশ। ঢাকা এটিও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, ২০১৩ সালে কার্যকর হওয়া বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি কেবল একতরফা ব্যবহারের নথি নয়; এটি দুই দেশের সার্বভৌম আইনি কাঠামোর অংশ।
অতএব ভারতীয় মিডিয়া এনডিটিভির মাধ্যমে চাণক্য ধাঁচের ‘স্পিন ডক্টরিং’ বা আগাম সফরবার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশকে একটি পরিবর্তনহীন তথ্যের সামনে দাঁড় করানো। কিন্তু ঢাকা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় কূটনৈতিক চাল উল্টে দিয়েছে। সেগুনবাগিচা বলটি এখন পুরোপুরি সাউথ ব্লকের কোর্টে ঠেলে দিয়েছে।
দিল্লি কি একজন পতিত ও বিচারবিভাগীয় পরোয়ানাভুক্ত স্বৈরাচারকে আঁকড়ে ধরে রেখে ১৮ কোটি মানুষের বাংলাদেশের সঙ্গে স্থায়ী বৈরিতা তৈরি করবে? নাকি পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে শেখ হাসিনার বিষাক্ত ছায়া থেকে বের হয়ে পারস্পরিক সমতা, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলবে?
এখানে একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে,বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ভিত্তি অবশ্যই বহুমাত্রিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের যৌথ ইতিহাস, ভাষা-সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠতা, অভিন্ন নদী, সুবিশাল সীমান্ত এবং বিপুল দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য (যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল প্রায় ১৪.০১ বিলিয়ন ডলার)—সবই এই সম্পর্কের গভীরতা নির্দেশ করে। তদুপরি, ভারতের নিরাপত্তা ও তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ‘সেভেন সিস্টার্স’ রাজ্যের স্থিতিশীলতা রক্ষায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতা চিরকালই অপরিহার্য।
কিন্তু গত দেড় দশকে বাণিজ্য, ট্রানজিট, বিদ্যুৎ এবং বন্দর ব্যবহারের (যেমন চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর) ক্ষেত্রে চুক্তি হলেও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও সমতার ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি কোনো ভারতবিরোধী অবস্থান নয়; বরং এটি নিজ দেশের আত্মমর্যাদা, সীমান্ত সুরক্ষা, তিস্তা সহ অভিন্ন নদীর ন্যায্য পানির হিস্যা আদায় এবং জনগণের ইচ্ছাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার সার্বভৌম প্রকাশ।
ঢাকার সুদৃঢ় অবস্থানের পর সম্প্রতি নয়া দিল্লি ও সেগুনবাগিচায় যে উচ্চপর্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক তৎপরতা দেখা গেছে—তা অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ। ভারতীয় নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক এবং পরবর্তীতে নয়া দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ত্রিবেদীর দীর্ঘ আলোচনা; পাশাপাশি ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের আকস্মিক ঢাকা সফর প্রমাণ করে যে, দিল্লি এখন বুঝতে বাধ্য হচ্ছে—‘হাসিনা কার্ড’ আঁকড়ে ধরে বা চাণক্য নীতির কৌশল প্রয়োগ করে নতুন ঢাকাকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
জনসভায় চটকদার বক্তব্য দিয়ে ভারতীয় পণ্যের বর্জনের ডাক দেওয়া, আর ব্যক্তিগত জীবনে ভারতীয় পণ্য ও সংস্কৃতিতে মগ্ন থাকার এই দ্বিমুখী রাজনৈতিক ভণ্ডামি দিয়ে আধুনিক আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক লড়াই জেতা যায় না। বাংলাদেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের অর্থনৈতিক সুরক্ষা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, পানির ন্যায্য অংশ আদায় এবং বাজারের স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন আবেগহীন, ফলপ্রসূ ও শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত সার্বভৌম কূটনীতি।
পরিশেষে বলতে চাই, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি আজ বঙ্গোপসাগর থেকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে এক চরম কৌশলগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে ঢাকা দিল্লির জন্য বার্তাটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও সংহত রেখে দিয়েছে যে কূটনীতির দরজা মোটেও বন্ধ নয়, বরং ন্যায়বিচার, সমতা ও সার্বভৌম সম্মানের ভিত্তিতে বন্ধুত্বের দরজা পুরোপুরি উন্মুক্ত ।
সুতরাং ভারতের নীতিনির্ধারকদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তারা কি চাণক্য কূটনীতির পুরোনো ফ্রেমওয়ার্কে আঁকড়ে ধারা থাকবে, নাকি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক নতুন সার্বভৌম ও মর্যাদাপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করবে। ঢাকার প্রজ্ঞাবান কূটনৈতিক চালে দিল্লির চাণক্যনীতি আজ যে কঠিন পরীক্ষায় পড়েছে, তার চূড়ান্ত সমাধান দিল্লির সাউথ ব্লককের হাতেই রয়েছে বলে আমি মনে করি।
লেখক: আহসান হাবিব বরুন – সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক।

