বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার তৌফীক নাওয়াজের জীবনাবসানে ফিরে আসছে আইনি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পেশাগত জীবনে নানা উল্লেখযোগ্য কাজ করলেও গ্রামীণ ব্যাংক-সংক্রান্ত মামলাটি ছিল তার অন্যতম স্মারক লড়াই। মুহাম্মদ ইউনূসের মতো নোবেলজয়ীর বিপরীতে দাঁড়িয়েও আবেগের বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন বিশুদ্ধ আইনের পথ।
সেই তৌফীক নাওয়াজ আর নেই। ১৮ অগাস্ট ২০২৬ রাতে ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির স্বামী। পেশাগত জীবনে তিনি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বহু আইনি বিষয়ে কাজ করেছেন।
তৌফীক নাওয়াজের দীর্ঘ আইনজীবী জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি নিঃসন্দেহে ২০১১ সালের গ্রামীণ ব্যাংক-সংক্রান্ত সেই বহুল আলোচিত মামলা—যেখানে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে দাঁড়িয়ে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বহাল থাকার বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন।
এই মামলাটি নিয়ে পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, ব্যক্তিগত বিরোধের অভিযোগ এবং আবেগপ্রবণ বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু আদালতের নথি সামনে রাখলে একটি বিষয় পরিষ্কার: মামলাটির কেন্দ্রে ছিল আইনের প্রশ্ন—গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মুহাম্মদ ইউনূসের বহাল থাকার আইনগত ভিত্তি ছিল কি না। আর সেই আইনি প্রশ্নটির মোকাবিলায় তৌফীক নাওয়াজের উপস্থাপিত যুক্তিগুলোই বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ব্যক্তি নয়, আইনের প্রশ্ন
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যানকে জানায় যে মুহাম্মদ ইউনূস ৬০ বছর বয়স অতিক্রম করার পরও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বহাল আছেন এবং তার এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন ছাড়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৭ ফেব্রুয়ারির চিঠিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে তিনি অবসর গ্রহণের নির্ধারিত বয়স ৬০ অতিক্রম করার পরও বোর্ডের সিদ্ধান্তে পদে বহাল ছিলেন এবং এতে ১৯৮৩ সালের ‘গ্রামীণ ব্যাংক অর্ডিন্যান্সে’র ১৪(১) ধারা বলে প্রয়োজনীয় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনও ছিল না। ২ মার্চের চিঠিতেও তার পদে বহাল থাকাকে ওই বিধানের পরিপন্থী বলা হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি হাইকোর্ট এবং শেষে আপিল বিভাগে গড়ায়।
মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে পাল্টা যুক্তি দেওয়া হয়। বলা হয়, কারণ দর্শাও নোটিশ ব্যতিরেকে তাকে অপসারণ করা হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান; এর নিজস্ব অধ্যাদেশ ও পরিচালনা পর্ষদের ক্ষমতার ভিত্তিতে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল; বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণের ব্যাখ্যা এমনভাবে করা যাবে না যাতে ব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা-স্বাধীনতা নষ্ট হয়। এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে তৌফীক নাওয়াজের সাফল্য ছিল আবেগের পাল্টা আবেগ দেখানো নয়—বরং আইনের কাঠামোর ভেতরেই প্রতিপক্ষের যুক্তির ভিত্তি খণ্ডন করে দেওয়া।
আদালতে যুক্তির শক্তি
আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে তৌফীক নাওয়াজের বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ আছে। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য সমর্থন করে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন আদালতের সামনে আনেন।
প্রথমত, মুহাম্মদ ইউনূস ৬০ বছর বয়স অতিক্রম করার আগেই অবসর-সীমার প্রশ্নে পড়েছিলেন; পরবর্তী সময়ে প্রণীত ২০০১ সালের ‘গ্রামীণ ব্যাংক রেগুলেশনস’ তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করে আগের অবস্থানকে বৈধ করা যায় না।
দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ ব্যাংক অর্ডিন্যান্সের ধারা ১৪(১)-এ ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বিধান ছিল। তৌফীক নাওয়াজ আদালতে যুক্তি দেন—এই মূল বিধানকে চ্যালেঞ্জ না করে নিয়োগের বৈধতা দাবি করা যায় না।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০১১ সালের চিঠিকে তিনি নতুন করে কাউকে ‘বরখাস্ত করার’ আদেশ হিসেবে না দেখে, আইনগত অবস্থান সম্পর্কে গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
চতুর্থত, তিনি যুক্তি দেন যে একটি সংবিধিবদ্ধ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা হিসেবে অবসর-সীমা অতিক্রম করার পর কোনো ব্যক্তি পদে বহাল থাকতে পারেন না শুধুমাত্র বোর্ডের একটি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে।
পঞ্চমত, কোনো সরকারি বা সংবিধিবদ্ধ সার্ভিসে নির্ধারিত অবসর-বয়স অতিক্রম করার পর বেআইনিভাবে পদে থাকা অব্যাহত রাখার জন্য আলাদা ‘কারণ দর্শাও নোটিশ’-এর প্রশ্নটি একইভাবে প্রযোজ্য নয়।
এগুলো কোনো পরবর্তী ব্যাখ্যা নয়; সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পূর্ণাঙ্গ রায়েই তৌফীক নাওয়াজের এই যুক্তিগুলো হুবহু নথিভুক্ত করেছে। দক্ষতার মূল্যায়ন করতে হলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল হলো বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব রায়। সেখানে দেখা যায়, আদালত গ্রামীণ ব্যাংক অর্ডিন্যান্স ১৯৮৩-এর ইতিহাস, ১৯৯০ সালের সংশোধন, ১৯৯৩ সালের ‘সার্ভিস রেগুলেশনস’, ১৯৯৯ সালের বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্সপেকশন রিপোর্ট এবং ২০০১ সালের নতুন রেগুলেশনস—সবকিছু পর্যালোচনা করেছে।
বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্সপেকশন রিপোর্ট’। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মুহাম্মদ ইউনূস এবং তৎকালীন ‘উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ মো. খালেদ শামস ৬০ বছর বয়স অতিক্রম করার পরও দায়িত্ব পালন করছেন এবং বোর্ডের সিদ্ধান্তে তারা অনির্দিষ্টকাল পদে থাকার অবস্থায় ছিলেন। অর্থাৎ ২০১১ সালের ঘটনাটি হঠাৎ তৈরি হওয়া কোনো অভিযোগ ছিল না; আদালতের নথিতে দেখা যায়, ১৯৯৯ সালেই ‘বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্সপেকশন রিপোর্টে’ অবসর-বয়স এবং পদে বহাল থাকার বিষয়টি উঠে এসেছিল। এই নথিগত ধারাবাহিকতাকে আইনি যুক্তির সঙ্গে যুক্ত করাই ছিল তৌফীক নাওয়াজের কাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ইউনূসের পক্ষে বক্তব্য বনাম নাওয়াজের প্রশ্ন
মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ছিল—গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ২৮ জুলাই ১৯৯৯ তাঁকে ‘যতক্ষণ না বোর্ড অন্য কোনো সিদ্ধান্ত নেয়’ ভিত্তিতে পদে বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তৌফীক নাওয়াজের প্রশ্ন ছিল—পরিচালনা পর্ষদ কি এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে, যা সংসদীয় বা অধ্যাদেশগত আইনের বাধ্যতামূলক শর্তকে পাশ কাটিয়ে যায়?
আদালতের উত্তর শেষ পর্যন্ত ছিল—না।
আপিল বিভাগ স্পষ্টভাবে বলেছে, ১৯৯৯ সালের বোর্ডের সেই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন না থাকায় সেটি আইনসঙ্গত ছিল না। এখানেই তৌফীক নাওয়াজের আইনি কৌশলের সাফল্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণের পথে যাননি; বরং ‘বোর্ডের ক্ষমতা বনাম সংবিধিবদ্ধ প্রয়োজনীয়তা’—এই মৌলিক সংঘাতটি আদালতের সামনে দাঁড় করিয়েছিলেন।
আরেকটি জটিল প্রশ্ন ছিল ২০০১ সালের ‘গ্রামীণ ব্যাংক রেগুলেশনস’। মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে যুক্তি ছিল, পরবর্তী রেগুলেশনসের মাধ্যমে তাকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। তৌফীক নাওয়াজ আদালতে এই রেগুলেশনসের ‘মুখবন্ধ’ (Preamble)-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তার বক্তব্য ছিল—এই রেগুলেশনস মূলত পরবর্তী সময়ে ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ নিয়োগের শর্তাবলি নির্ধারণের জন্য প্রণীত; মুহাম্মদ ইউনূস ইতিমধ্যেই ৬০ বছর অতিক্রম করেছিলেন এবং তাই এই রেগুলেশনস ব্যবহার করে তার অবস্থানকে বৈধ করা যাবে না।
আপিল বিভাগ এই যুক্তির মধ্যে মেধা (Merit) খুঁজে পায়। রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়: “In view of the above, we find merit in the contention of Mr. Tawfiq Nawaz.”
আদালত শুধু তার বক্তব্য শুনেছে তা নয়; তার নির্দিষ্ট আইনি ব্যাখ্যাকে রায়ের যুক্তির অংশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তৌফীক নাওয়াজের সাফল্য ছিল মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘অপরাধী’ প্রমাণ করা নয়; বরং একজন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তির ক্ষেত্রেও আইনগত পদাধিকার যে আইনের শর্তাধীন—সেটি আদালতের সামনে প্রতিষ্ঠা করা।

হাইকোর্ট থেকে আপিল বিভাগ—আইনি লড়াইয়ের ফল
৮ মার্চ ২০১১ হাইকোর্ট মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংকের নয়জন পরিচালকের রিট খারিজ করে দেয়। আদালত মনে করে, ৬০ বছর অতিক্রম করার পর তার ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ পদে থাকা বৈধ ছিল না এবং ১৯৯৯ সালের বোর্ডের সিদ্ধান্তও বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের বিধান অতিক্রম করতে পারে না। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও তখন ঘটনাটি ব্যাপকভাবে প্রচার করে। বিবিসি ৮ মার্চের প্রতিবেদনে হাইকোর্টের সিদ্ধান্তকে মুহাম্মদ ইউনূসের অপসারণকে বৈধতা দেওয়া হিসেবে বর্ণনা করে।
এরপর মামলা যায় আপিল বিভাগে। ৫ এপ্রিল ২০১১ আপিল বিভাগ প্রাথমিকভাবে লিভ পিটিশন খারিজ করেছিল। পরে মুহাম্মদ ইউনূস পুনঃশুনানির আবেদন করেন। আদালত বিশেষ পরিস্থিতিতে আগের স্বাক্ষরবিহীন আদেশ রিকল করে পুনরায় শুনানি গ্রহণ করে। ৩, ৪ ও ৫ মে দীর্ঘ শুনানি শেষে আপিল বিভাগ ৫ মে ২০১১ পূর্ণাঙ্গ রায় দেয় এবং দুটি সিভিল পিটিশন খারিজ করে। সাত সদস্যের বেঞ্চে ছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকসহ আপিল বিভাগের বিচারপতিগণ। আর এই চূড়ান্ত শুনানিতেও আদালতে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার তৌফীক নাওয়াজ। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রথম পৃষ্ঠাতেই তার নাম এবং পক্ষে উপস্থিতির বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত আছে।
কোনো আইনজীবী একটি মামলা জিতেছেন কি না—এটি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন বড় আইনজীবীর দক্ষতার আরও বড় মাপকাঠি হলো তিনি আদালতের সামনে কোন প্রশ্নটি সঠিকভাবে দাঁড় করাতে পেরেছেন। তৌফীক নাওয়াজের ক্ষেত্রে প্রশ্নগুলি ছিল:
- কোনো প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব বোর্ড রেগুলেশনস দিয়ে কি ‘সংবিধিবদ্ধ প্রয়োজনীয়তা’ অতিক্রম করতে পারে?
- একজন ব্যক্তি কি ৬০ বছরের বাধ্যতামূলক অবসরসীমা অতিক্রম করার পরও অনির্দিষ্টকাল সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালনা থাকতে পারেন?
- ১৯৯০ সালের সংশোধনের মাধ্যমে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনের শর্ত কি বোর্ডের ১৯৯৯ সালের সিদ্ধান্তে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে আদালত অর্ডিন্যান্স, বোর্ড রেগুলেশনস, নিয়োগপত্র, এবং বাংলাদেশ ব্যাংক ইন্সপেকশন রিপোর্ট—সবকিছু পরীক্ষা করেছে এবং শেষ পর্যন্ত আপিল বিভাগ বলেছে—মুহাম্মদ ইউনূসের রিটে যোগ্যতা (merit) নেই; তার ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে বহাল থাকার আইনগত ভিত্তি ছিল না।
তৌফীক নাওয়াজের জন্য এই মামলার তাৎপর্য
একজন আইনজীবী হিসেবে তৌফীক নাওয়াজের কৃতিত্বকে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠিতে বিচার করা উচিত নয়। বরং ২০১১ সালের মামলাটি দেখায়, তিনি এমন এক সময়ে আদালতে দাঁড়িয়েছিলেন যখন তার প্রতিপক্ষ ছিলেন দেশের অন্যতম আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত ব্যক্তি এবং তার পক্ষে ছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে অভিজ্ঞ আইনজীবীদের কয়েকজন—মুহাম্মদ কামাল হোসেন, মাহমুদুল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, সারা হোসেন প্রমুখ।
তবু তৌফীক নাওয়াজ তার আইনি অবস্থানকে নথি, বিধান ও সংবিধিবদ্ধ ব্যাখ্যার ওপর দাঁড় করিয়েছিলেন। মুহাম্মদ ইউনূস ছিলেন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা-প্রেরণা এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে সর্বাধিক পরিচিত ব্যক্তিদের একজন—এ সত্য আদালতও অস্বীকার করেনি। কিন্তু কোনো ব্যক্তির ঐতিহাসিক মর্যাদা তাকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যায় না—২০১১ সালের মামলায় তৌফীক নাওয়াজের আইনজীবীসুলভ দৃঢ়তার মূল বক্তব্য ছিল সেটিই। আর আদালতের চূড়ান্ত রায় তার সেই অবস্থানকে সমর্থন করেছিল।
রায় আজও বহাল
২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের পরও সেই ২০১১ সালের রায় বাতিল হয়নি। ফলে মুহাম্মদ ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর পদে আর ফিরে আসেননি। গ্রামীণ ব্যাংকের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটে চেয়ারম্যান এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে অন্য ব্যক্তিদের দেখা যাচ্ছে। মুহাম্মদ ইউনূস ব্যবস্থাপনা কাঠামোর কোনো পদে নেই।
উল্লেখ্য, ১ জানুয়ারি ২০২৪ মুহাম্মদ ইউনূস এবং গ্রামীণ টেলিকমের আরো তিন কর্মকর্তাকে যে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও প্রত্যেককে ত্রিশ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছিল, তার সঙ্গে উপরোক্ত মামলার সম্পর্ক নেই। শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ‘শ্রম আদালত’ এই রায় দিয়েছিল। তারা জামিনে ছিলেন এবং রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। ৭ অগাস্ট ২০২৪ শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনাল সেই দণ্ডাজ্ঞা বাতিল করে দেয় এবং তাদেরকে খালাস দেয়।
স্মরণীয় হয়ে থাকবেন
তৌফীক নাওয়াজকে স্মরণ করার সময় তাই হয়তো সবচেয়ে ন্যায্য বাক্যটি হবে—তিনি কোনো ব্যক্তিকে পরাজিত করার জন্য আদালতে দাঁড়াননি; তিনি একটি আইনি অবস্থান প্রতিষ্ঠার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন।
একজন আইনজীবীর জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে—প্রতিপক্ষ যতই শক্তিশালী হোক, আদালতের সামনে আইনের ভাষায় নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করা; এবং সেই বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে স্থান করে নেওয়া।
তিনি চলে গেলেন। কিন্তু ২০১১ সালের সেই আইনি লড়াইয়ে তার যুক্তির যে স্বাক্ষর সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পাতায় রয়ে গেছে, সেটি বাংলাদেশের আইন-ইতিহাসের একটি নথিভুক্ত অধ্যায় হয়েই থাকবে।
- বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ: গবেষক ও লেখক। সূত্র: বিডিনিউজ২৪

