মেধাপাচার বলতে সাধারণত উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ মানুষের দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যাওয়াকেই বোঝানো হয়। প্রকৌশলী, চিকিৎসক, গবেষক কিংবা তথ্যপ্রযুক্তিবিদ উন্নত সুযোগের সন্ধানে বিদেশে পাড়ি জমালে সেটিকে মেধাপাচার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অভিবাসনের পরিসংখ্যান- সবখানেই মেধাপাচারের হিসাব খোঁজা হয়। কিন্তু মেধাবী মানুষ দেশেই থেকে গেলে তার মেধা ও দক্ষতার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নটি অনেক সময় আলোচনার বাইরে থেকে যায়।
ধরা যাক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে একজন শিক্ষার্থী তড়িৎ ও ইলেকট্রিক্যাল প্রকৌশল (Electrical Engineering) পড়লেন। চার বছর কঠিন পড়াশোনা শেষে তিনি প্রকৌশল পেশায় না গিয়ে ব্যাংকের চাকরির প্রস্তুতি শুরু করলেন। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান (Computer Science) বিভাগের একজন গ্র্যাজুয়েট যদি কয়েক বছর বিসিএসের (BCS) প্রস্তুতিতে বাংলা ব্যাকরণ ও সাধারণ জ্ঞান মুখস্থ করতে ব্যস্ত থাকেন, তাহলে তিনি দেশ ছাড়ছেন না ঠিকই, কিন্তু তার অর্জিত বিশেষায়িত দক্ষতা কতটা কাজে লাগছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
একই বাস্তবতা দেখা যেতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও। একজন শিক্ষক যদি গবেষণা, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি কিংবা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা উন্নয়নের পরিবর্তে ফাইল, কমিটি, অনুমোদন ও দাপ্তরিক কাজে দিনের বড় অংশ ব্যয় করেন, তাহলে তার মেধা ও দক্ষতার সর্বোচ্চ ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অর্থাৎ মানুষটি প্রতিষ্ঠানে আছেন, বেতন পাচ্ছেন এবং কাজও করছেন; কিন্তু যে দক্ষতার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে তাকে তৈরি করা হয়েছে, তার বড় অংশ যদি কাজে না লাগে, তাহলে সেটিও এক ধরনের মেধা অপচয়।
এই বিষয়টি বোঝাতে একটি উদাহরণ গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশ যদি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি এমআরআই (MRI) যন্ত্র কিনে সেটি দিয়ে হাসপাতালের উপস্থিতির তালিকা ছাপানোর কাজ করে, তাহলে যন্ত্রটি দেশে থাকলেও তার প্রকৃত সক্ষমতার ব্যবহার হচ্ছে না। ৫০ লাখ টাকার একটি অত্যাধুনিক যন্ত্র দিয়ে ৫ হাজার টাকার প্রিন্টারের কাজ করানো এবং সেই যন্ত্রের সম্ভাবনা নষ্ট করার মধ্যে অর্থনৈতিক দিক থেকে বড় পার্থক্য নেই। মানুষের ক্ষেত্রেও বিষয়টি একইভাবে দেখা যায়।
একজন প্রকৌশলী তৈরি করতে একটি পরিবার ও রাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় বিনিয়োগ করতে হয়। প্রায় দুই দশকের শিক্ষাজীবন পেরিয়ে একজন মানুষ একটি বিশেষায়িত দক্ষতা অর্জন করেন। পরিবার তার পেছনে অর্থ ব্যয় করে, রাষ্ট্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তুকি দেয়, শিক্ষকরা সময় ও শ্রম দেন। একজন তরুণ তার জীবনের সবচেয়ে শেখার উপযোগী সময়টুকু ব্যয় করেন একটি কঠিন পেশাগত দক্ষতা তৈরিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যদি তাকে এমন একটি চাকরি বা দায়িত্বে নিয়োজিত করা হয়, যেখানে তার অর্জিত দক্ষতার সামান্য অংশও কাজে লাগে না, তাহলে সেই দীর্ঘ বিনিয়োগের একটি বড় অংশ অপচয় হয়ে যেতে পারে।
এর সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ হতে পারে সরকারি চাকরির প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। চার বছর প্রকৌশল পড়া একজন তরুণ চাকরির নিরাপত্তার আশায় বছরের পর বছর সাধারণ জ্ঞান, বাংলা ব্যাকরণ কিংবা বিভিন্ন প্রবাদ-প্রবচন মুখস্থ করছেন। পদার্থবিজ্ঞানে ভালো ফল করা একজন শিক্ষার্থীকে হয়তো জানতে হচ্ছে কোন জেলার সঙ্গে কোন বিভাগের অবস্থান, কোনো জেলার পুরোনো নাম কী কিংবা কোনো উপজেলায় কতটি উপজেলা রয়েছে। এসব জ্ঞান পরীক্ষায় প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এ প্রক্রিয়ায় একজন বিশেষায়িত প্রকৌশলী বা বিজ্ঞানীর অর্জিত দক্ষতার কতটা ব্যবহার হচ্ছে?
এক পর্যায়ে সেই তরুণ সরকারি চাকরিতে সফল হলে সমাজ তাকে প্রতিষ্ঠিত হিসেবে বিবেচনা করে। পরিবারও স্বস্তি পায়, কারণ একটি নিরাপদ ও স্থায়ী কর্মসংস্থান নিশ্চিত হয়। কিন্তু তখন খুব কমই হিসাব করা হয়, যে মস্তিষ্ক ও দক্ষতা তৈরিতে পরিবার এবং রাষ্ট্র প্রায় দুই দশক বিনিয়োগ করেছে, তার কত শতাংশ বাস্তবে কাজে লাগছে। একজন প্রকৌশলী যদি প্রকৌশল জ্ঞান ব্যবহার না করেন, একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী যদি প্রযুক্তিগত কাজ না করেন কিংবা একজন গবেষক যদি গবেষণার সুযোগ না পান, তাহলে তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত হলেও জাতীয় অর্থনীতিতে তাদের পূর্ণ সম্ভাবনার ব্যবহার নিশ্চিত হয় না।
এখানেই মেধাপাচারের প্রচলিত সংজ্ঞা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি হয়। একজন প্রকৌশলী যদি জার্মানিতে গিয়ে প্রকৌশল পেশায় কাজ করেন, নতুন ব্যবস্থা তৈরি করেন, গবেষণা করেন কিংবা পেটেন্ট করেন, তাহলে তার দক্ষতা অন্তত কাজে লাগছে। বাংলাদেশ হয়তো তার শ্রম ও মেধার সরাসরি ফলাফল হারাচ্ছে, কিন্তু ওই ব্যক্তি তার দক্ষতার ব্যবহার করতে পারছেন এবং নতুন জ্ঞান ও প্রযুক্তি তৈরিতে অবদান রাখছেন।
অন্যদিকে একই প্রকৌশলী যদি বাংলাদেশে থেকেও এমন কোনো পেশায় যুক্ত হন, যেখানে তার প্রকৌশল দক্ষতার কোনো উল্লেখযোগ্য ব্যবহার নেই, তাহলে দেশ তার উপস্থিতি পেলেও তার সম্ভাব্য উৎপাদনশীলতা পাচ্ছে না। অর্থাৎ মানুষটি বাংলাদেশে আছেন, তার মেধাও বাংলাদেশেই আছে, কিন্তু সেই মেধার যে নির্দিষ্ট ব্যবহার করার জন্য তাকে তৈরি করা হয়েছিল, সেটি আর হচ্ছে না। এই অবস্থাকে সরাসরি প্রচলিত অর্থে মেধাপাচার বলা না হলেও এটি নিঃসন্দেহে মেধা ব্যবহারের সংকট এবং মানবসম্পদের বড় ধরনের অপচয়।
সমস্যাটির আরেকটি দিক হলো, নিরাপদ চাকরির প্রতি সামাজিক আকর্ষণ। বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি স্থায়ী সরকারি বা ব্যাংকের চাকরি অনেক পরিবারের কাছে উচ্চশিক্ষার স্বাভাবিক ও কাঙ্ক্ষিত পরিণতি হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী যে বিষয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দক্ষতা অর্জন করেছেন, সেই বিষয়ে ক্যারিয়ার গড়ার চেয়ে নিরাপদ চাকরির প্রস্তুতিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতে পারেন। ব্যক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে এটি হয়তো যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত; কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভিন্ন হতে পারে।
কারণ একটি দেশের উন্নয়নের জন্য শুধু শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা যথেষ্ট নয়; তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার কার্যকর ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ কিংবা গবেষক তৈরি করার পর যদি তাদের বড় অংশকে নিজেদের বিশেষায়িত ক্ষেত্রের বাইরে চলে যেতে হয়, তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থায় বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক ফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে শুধু একজন ব্যক্তির ক্যারিয়ার বদলায় না, জাতীয় পর্যায়েও দক্ষ মানবসম্পদের ব্যবহার কমে যায়।
তাই মেধাপাচারের হিসাব শুধু কতজন মানুষ বিদেশে গেলেন, সেই সংখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখলে সমস্যার একটি বড় অংশ অদৃশ্য থেকে যেতে পারে। একই সঙ্গে দেখতে হবে, দেশে থাকা উচ্চশিক্ষিত মানুষের কতজন নিজেদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজে যুক্ত আছেন। কতজন গবেষণা করছেন, কতজন নতুন প্রযুক্তি তৈরি করছেন, কতজন শিল্প ও উৎপাদনে নিজেদের বিশেষায়িত জ্ঞান ব্যবহার করছেন এবং কতজন কেবল নিরাপদ চাকরির জন্য নিজেদের মূল পেশা থেকে সরে যাচ্ছেন- এসব প্রশ্নও জাতীয় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ সূচক হতে পারে।
সবচেয়ে বড় মেধা অপচয় হয়তো তখনই শুরু হয়, যখন একজন মেধাবী তরুণ বুঝতে পারেন যে তার বিশেষায়িত দক্ষতার চেয়ে একটি নিরাপদ চাকরির মূল্য বেশি। তখন তিনি দেশ ছাড়েননি, তার পাসপোর্টেও কোনো বিদেশি ভিসা লাগেনি। তবু তার মেধার সম্ভাব্য ব্যবহার থেকে দেশ বঞ্চিত হতে শুরু করে। বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে যে মেধাপাচার গোনা হয়, তার অনেক আগেই হয়তো দেশের ভেতরে শুরু হয়ে যায় মেধা অপচয়ের সেই প্রক্রিয়া।
ফলে মেধাপাচারকে শুধু দেশত্যাগের সমস্যা হিসেবে দেখলে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাদ পড়ে যায়। একজন দক্ষ মানুষ বিদেশে গিয়ে নিজের দক্ষতা কাজে লাগালে দেশ তার শ্রম ও উৎপাদন হারায়। কিন্তু একজন দক্ষ মানুষ দেশে থেকেও যদি নিজের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ না পান, তাহলে দেশ তার উপস্থিতি পেলেও তার সম্ভাব্য অবদান থেকে বঞ্চিত হয়। এই পার্থক্যটি বোঝা এবং মানবসম্পদ ব্যবহারের নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

