ইতিহাসের বড় পরিবর্তনের পেছনে আসলে কার ভূমিকা বেশি? একজন অসাধারণ নেতার, নাকি সেই সময়ের সমাজ, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির?
এই প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর নেই। ইতিহাসে এমন অনেক নেতা আছেন, যাঁদের সিদ্ধান্তের প্রভাব তাঁদের সময়কে ছাড়িয়ে গেছে। আবার এমন নেতার উদাহরণও আছে, যাঁরা হয়তো শুধু এমন একটি সময় পেয়েছিলেন, যখন পরিবর্তনের জন্য মাটি আগে থেকেই তৈরি ছিল।
তাহলে একজন নেতা কি সত্যিই ইতিহাস বদলান? নাকি ইতিহাসের তৈরি পরিস্থিতিই কোনো একজন মানুষকে সামনে নিয়ে আসে?
মার্কিন লেখক জ্যারেড ডায়মন্ড তাঁর নতুন বই Profits, Prophets, Coaches, and Kings: (When) Do Leaders Make a Difference এ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। তাঁর আগের বইগুলোতে যেখানে সভ্যতার বিকাশে ভূগোল, পরিবেশ ও বড় সামাজিক শক্তির ভূমিকা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, এবার তিনি নজর দিয়েছেন ব্যক্তির দিকে।
ডায়মন্ড দেখতে চেয়েছেন, একজন নেতা আসলে কতটা পরিবর্তন আনতে পারেন। আর সেই পরিবর্তন আনতে হলে তাঁর সামনে কী ধরনের পরিস্থিতি থাকা দরকার।
একজন মানুষ না থাকলে কি ইতিহাস বদলে যেত?
বইয়ের শুরুতেই ডায়মন্ড এমন একটি ঘটনা তুলে ধরেছেন, যা এই পুরো বিতর্ককে খুব সহজভাবে বোঝায়।
১৯৩০ সালের মার্চ মাসে অ্যাডলফ হিটলারের গাড়িতে একটি বড় ট্রাক ধাক্কা দেয়। হিটলার বেঁচে যান। তিন বছর পর তিনি জার্মানির চ্যান্সেলর হন। এরপর তাঁর নেতৃত্বে ঘটে হলোকাস্ট ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ ঘটনা। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারান।
এখন প্রশ্ন হলো, ওই দুর্ঘটনায় হিটলার মারা গেলে কী হতো?
হয়তো ইতিহাস অন্যরকম হতো। আবার এমনও হতে পারে, জার্মানির তখনকার পরিস্থিতি অন্য কাউকে সামনে নিয়ে আসত।
কারণ হিটলারের উত্থানের আগে থেকেই জার্মানি গভীর সংকটে ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভার্সাই চুক্তির চাপ, অর্থনৈতিক দুরবস্থা, অতিমুদ্রাস্ফীতি এবং সমাজে দীর্ঘদিনের ইহুদিবিদ্বেষ দেশটিকে অস্থির করে তুলেছিল।
তাই শুধু হিটলারকে দিয়ে সেই সময়ের ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায় না। একই সঙ্গে তাঁকে বাদ দিয়েও পুরো ঘটনাটি বোঝা কঠিন।
এই জায়গাটিই ডায়মন্ডের মূল প্রশ্ন। একজন নেতা কি ইতিহাসের গতিপথ বদলে দেন, নাকি ইতিহাসের পরিস্থিতি একজন নেতাকে সেই সুযোগ করে দেয়?
নেতাদের নিয়ে তিন ধরনের ভাবনা
ডায়মন্ড এই বিতর্কে তিনটি মতের কথা বলেছেন।
একটি মত মনে করে, অসাধারণ নেতারাই ইতিহাস তৈরি করেন। তাঁদের ব্যক্তিগত প্রতিভা, সাহস ও সিদ্ধান্তই বড় পরিবর্তনের মূল কারণ।
আরেকটি মত এর পুরো বিপরীত। এই মত অনুযায়ী, একজন নেতা যত শক্তিশালীই হোন, সমাজ ও অর্থনীতির বড় কাঠামোর বাইরে তাঁর যাওয়ার সুযোগ খুব কম।
তৃতীয় মতটি মাঝামাঝি। কখনো একজন নেতা বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারেন। আবার কখনো একই ধরনের নেতা খুব বেশি কিছু করতে পারেন না।
ডায়মন্ড মূলত এই তৃতীয় অবস্থানটিই অনুসরণ করেছেন। তাঁর প্রশ্নও তাই একটু আলাদা। তিনি জানতে চান, কোন পরিস্থিতিতে একজন নেতা সত্যিই পার্থক্য তৈরি করতে পারেন?
‘হ্যামলেট পরীক্ষা’ কেন গুরুত্বপূর্ণ
নেতার ভূমিকা বোঝার জন্য ডায়মন্ড একটি ধারণা ব্যবহার করেছেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন ‘হ্যামলেট পরীক্ষা’।
সহজ করে বললে, প্রশ্নটা হলো, ওই ব্যক্তি না থাকলে তাঁর জায়গায় অন্য কেউ কি একই কাজ করতে পারতেন?
উইলিয়াম শেক্সপিয়রের কথা ধরা যাক। শেক্সপিয়ার হ্যামলেট না লিখলে তাঁর সময়ের অন্য কেউ কি একই ধরনের নাটক লিখতে পারতেন? ডায়মন্ডের যুক্তি হলো, শেক্সপিয়রের ক্ষেত্রে উত্তর সম্ভবত না।
অর্থাৎ এখানে ব্যক্তির নিজস্ব প্রতিভাই বড় বিষয়।
রাজনীতিতে এর উদাহরণ হিসেবে তিনি বতসোয়ানার প্রথম প্রেসিডেন্ট সেরেতসে খামার কথা বলেছেন।
স্বাধীনতার পর বতসোয়ানা গৃহযুদ্ধের পথে যায়নি। দেশটির হীরার সম্পদও বড় ধরনের অপচয়ের শিকার হয়নি। ডায়মন্ডের মতে, খামার নেতৃত্ব ও নীতির এতে বড় ভূমিকা ছিল।
অবশ্য বতসোয়ানার কিছু সুবিধা আগে থেকেই ছিল। খামার উপজাতীয় নেতাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও কাজে লেগেছিল। কিন্তু ডায়মন্ড মনে করেন, একই জায়গায় অন্য কেউ থাকলে হয়তো একই ফল পাওয়া যেত না।
এখানে ব্যক্তি ও পরিস্থিতি দুটোই একসঙ্গে কাজ করেছে।
শুধু প্রতিভা থাকলেই কি হয়?
ডায়মন্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য হলো, একজন নেতা যত প্রতিভাবানই হোন, সব সময় তিনি বড় পরিবর্তন আনতে পারবেন না। এর জন্য সময় ও পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ।
চেঙ্গিস খানের উদাহরণ তিনি এ কারণেই এনেছেন। চেঙ্গিস খান ইতিহাসের অন্যতম বড় স্থলসাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর সামরিক ও প্রশাসনিক দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ নেই।
কিন্তু ডায়মন্ড মনে করেন, প্রকৃতিও তাঁকে কিছুটা সাহায্য করেছিল। তাঁর জন্মের সময় মধ্য এশিয়ার স্তেপ অঞ্চলে দীর্ঘ সময়ের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাতের একটি সময় শুরু হয়েছিল।
এর ফলে ওই অঞ্চলের অর্থনীতি, জনসংখ্যা ও সামাজিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। এই অনুকূল পরিস্থিতি চেঙ্গিস খানের উত্থানকে সহজ করেছিল বলে ডায়মন্ডের বিশ্লেষণ।
অর্থাৎ একজন অসাধারণ মানুষ থাকলেই ইতিহাস বদলে যায় না। তাঁকে এমন একটা সময়ও পেতে হয়, যখন তাঁর সামর্থ্য কাজে লাগানোর সুযোগ থাকে।
সব নেতা কি সত্যিই অপরিবর্তনীয়?
ডায়মন্ড আধুনিক সময়ের ২২ জন পরিচিত নেতাকে নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর মতে, একজন ঐতিহাসিক নেতা ভালো বা খারাপ দুই ধরনের প্রভাবই ফেলতে পারেন।
কেউ একটি দেশকে স্বাধীনতার পথে নিয়ে যেতে পারেন। কেউ আবার এমন এক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন, যা তাঁর চলে যাওয়ার পরই দুর্বল হয়ে পড়ে।
কোনো নেতার হাতে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া ও তা বাস্তবায়নের ক্ষমতা থাকে, তাহলে তাঁর প্রভাব বাড়তে পারে। আর যদি সময় ও পরিস্থিতিও তাঁর পক্ষে থাকে, তাহলে সেই প্রভাব আরও বড় হতে পারে।
ডায়মন্ড আরও একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, যাঁরা সত্যিই বড় পার্থক্য তৈরি করেছেন, তাঁদের অনেকেই সহজে ক্ষমতা ছাড়েননি। এর ব্যতিক্রম হিসেবে তিনি নেলসন ম্যান্ডেলা ও লি কুয়ান ইউয়ের কথা উল্লেখ করেছেন।
নেতার শিক্ষাকেও তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। লি কুয়ান ইউ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট থাবো এমবেকির উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, অর্থনীতি সম্পর্কে তাঁদের প্রশিক্ষণ তাঁদের নেতৃত্বে প্রভাব ফেলেছিল বলে তাঁর বিশ্লেষণে উঠে আসে।
বেজোস, গেটস বা মাস্ক কি ইতিহাস বদলেছেন?
রাজনীতির বাইরে ব্যবসার জগতেও একই প্রশ্ন করা যায়। জেফ বেজোস, বিল গেটস, ইলন মাস্ক ও মার্ক জাকারবার্গের মতো ব্যক্তিদের প্রায়ই বলা হয়, তাঁরা বিশ্বকে বদলে দিয়েছেন।
কিন্তু ডায়মন্ড এখানে একটু ভিন্ন প্রশ্ন করেছেন। তাঁরা না থাকলে কি একই পরিবর্তন ঘটত না? তাঁর ‘হ্যামলেট পরীক্ষা’ অনুযায়ী, এই ব্যবসায়ীদের কেউই পুরোপুরি অপরিবর্তনীয় নন।
উদাহরণ হিসেবে বেজোসের কথা বলা যায়। তিনি অ্যামাজন তৈরি করেছেন এবং অনলাইন ব্যবসার জগতে বড় পরিবর্তন এনেছেন। কিন্তু ডায়মন্ডের যুক্তি হলো, ইন্টারনেটের দ্রুত বিস্তারের কারণে অনলাইন কেনাকাটার বাজার তৈরি হওয়ার সময় তখন এসেই গিয়েছিল। বেজোস না থাকলে হয়তো অন্য কেউ সেই সুযোগ কাজে লাগাতেন।
তাই ব্যবসায়ীরা বড় পরিবর্তন আনতে পারেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের জায়গায় অন্য কেউ কখনোই আসতে পারতেন না, এমন নয়।
তাহলে ইতিহাস আসলে কার?
ডায়মন্ডের বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি সম্ভবত এখানেই।
ইতিহাসে একজন নেতার প্রভাব বুঝতে হলে শুধু তাঁর ব্যক্তিগত গুণ দেখলে হবে না। দেখতে হবে তিনি কোন সময়ে ক্ষমতায় এসেছেন, তাঁর হাতে কতটা ক্ষমতা ছিল, সমাজের অবস্থা কী ছিল এবং তাঁর সামনে কী ধরনের সুযোগ ছিল।
কখনো সময় একজন নেতাকে বড় পরিবর্তনের সুযোগ দেয়। আবার কখনো পরিস্থিতি এতটাই কঠিন থাকে যে সবচেয়ে দক্ষ নেতার পক্ষেও ফল বদলানো সম্ভব হয় না।
ডায়মন্ডের ভাষায়, যে পরিস্থিতিতে একজন মানুষের পক্ষে ফল বদলে দেওয়া প্রায় অসম্ভব, সেখানে নেতার প্রভাবের সম্ভাবনাও সবচেয়ে কম।
তবে বইটি নিয়েও প্রশ্ন আছে। ‘যদি এমন হতো’ ধরনের কাল্পনিক বিশ্লেষণ অনেক জায়গায় বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা দুটি দেশ বা প্রতিষ্ঠানের তুলনা করাও সব সময় সহজ নয়।
আরেকটি প্রশ্ন হলো, একজন নেতার ব্যক্তিগত গুণের মধ্যে কোন বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ? ক্যারিশমা, শিক্ষা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, নাকি অন্য কিছু? ডায়মন্ড এসব প্রশ্নের কিছু উত্তর দিয়েছেন, কিন্তু সবকিছু পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করেননি।
তারপরও বইটির গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি আমাদের আবার সেই পুরোনো প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়।
ইতিহাস কি মহান মানুষ তৈরি করেন? নাকি ইতিহাসের বিশেষ মুহূর্তই কিছু মানুষকে মহান করে তোলে?
হয়তো দুটোই সত্য। একজন মানুষ একা ইতিহাস তৈরি করেন না। আবার ইতিহাসও সব সময় মানুষের ভূমিকা মুছে দেয় না।
কখনো সময় সুযোগ তৈরি করে। আর সেই সুযোগ কাজে লাগান একজন মানুষ।

