শহর বাড়ছে। বহুতল ভবন বাড়ছে। একের পর এক আবাসিক প্রকল্পের বিজ্ঞাপনও বাড়ছে। শুধু কমছে একটি জিনিস-সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে একটি নিরাপদ, মানসম্মত ও স্থায়ী ঠিকানা পাওয়ার সুযোগ।
আজ বিশ্ব আবাসন দিবস। সবার জন্য পর্যাপ্ত ও নিরাপদ আবাসনের কথা বলা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। অথচ বাংলাদেশের বাস্তবতায় আবাসন এখন আর কেবল মাথা গোঁজার জায়গার প্রশ্ন নয়; এটি ক্রমেই হয়ে উঠছে আয়, সম্পদ, বৈষম্য ও নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন।
প্রশ্নটা তাই খুবই সহজ, ইট-বালুর এই শহরে মধ্যবিত্তের ঠিকানা কোথায়?
ফ্ল্যাট আছে, কিন্তু ক্রেতা কোথায়?
ঢাকার আকাশরেখা দেখলে মনে হতে পারে আবাসনের কোনো সংকট নেই। চারদিকে ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট, আবাসিক কমপ্লেক্স। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
ফ্ল্যাটের দাম বাড়ছে, নির্মাণ ব্যয় বাড়ছে, জমির দাম বাড়ছে; বিপরীতে সাধারণ মানুষের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। ফলে আবাসন বাজারে সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি হয়েছে দাম ও ক্রয়ক্ষমতার ব্যবধানকে ঘিরে।
একজন তরুণ চাকরিজীবী মাসের শেষে সংসার চালাতে গিয়ে হিমশিম খান। সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা, যাতায়াত, খাদ্য ও অন্যান্য ব্যয় মেটানোর পর সঞ্চয়ের সুযোগ সীমিত। অথচ একটি মাঝারি মানের ফ্ল্যাট কিনতে প্রয়োজন হয় বহু বছরের সঞ্চয়- কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি।
তাই প্রশ্ন ওঠে, যে শহরে চাকরি আছে, সেখানে কি চাকরিজীবীর নিজের থাকার জায়গা নেই?
জমি যেন মধ্যবিত্তের জন্য নিষিদ্ধ এলাকা
ঢাকার আবাসন সংকটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো জমির মূল্য।
এক টুকরো জমির দাম অনেক পরিবারের কয়েক প্রজন্মের সঞ্চয়ের সমান। ফলে ব্যক্তিগতভাবে জমি কিনে বাড়ি বানানো মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে বহু আগেই।
অন্যদিকে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য, শ্রমিকের মজুরি, ইউটিলিটি সংযোগ, কর, নিবন্ধন ও অন্যান্য খরচ যুক্ত হয়ে একটি ফ্ল্যাটের চূড়ান্ত মূল্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
ফলে আবাসন বাজারে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে- যাদের থাকার জায়গা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তাদের কাছেই ফ্ল্যাট সবচেয়ে কম সাশ্রয়ী।
ভাড়াটিয়া কি নাগরিক নয়?
বাংলাদেশে আবাসন নিয়ে আলোচনায় একটি বিষয় প্রায়ই আড়ালে থেকে যায়- ভাড়াবাসন।
দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজের বাড়ির মালিক নন। তারা বছরের পর বছর ভাড়া দিয়ে শহরে বসবাস করছেন। কিন্তু ভাড়াবাসনকে দীর্ঘমেয়াদি আবাসন নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখার প্রবণতা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
বাড়িভাড়া বাড়ে। সঙ্গে বাড়ে সার্ভিস চার্জ, গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ ও অন্যান্য খরচ। আয় একই গতিতে না বাড়লে পরিবারকে শেষ পর্যন্ত বাসার আয়তন কমাতে হয়, দূরে সরে যেতে হয় কিংবা জীবনযাত্রার অন্যান্য প্রয়োজন ছাঁটাই করতে হয়।
নিজের বাড়ি নেই- তাই কি একজন নাগরিকের নিরাপদ আবাসনের অধিকারও নেই?
ঢাকা কি মানুষের জন্য নাকি ভবনের জন্য?
আবাসন মানে শুধু একটি ফ্ল্যাটের চাবি নয়।
একটি বাসস্থান তখনই বাসযোগ্য, যখন তার আশপাশে নিরাপদ সড়ক, গণপরিবহন, স্কুল, হাসপাতাল, খেলার মাঠ, পার্ক, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকে।
কিন্তু ঢাকার বহু আবাসিক এলাকায় ভবন তৈরি হয়েছে পরিকল্পিত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত হওয়ার আগেই। কোথাও রাস্তা সরু, কোথাও খেলার মাঠ নেই, কোথাও পর্যাপ্ত সবুজ নেই। কোথাও স্কুলে যাওয়ার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট পেরোতে হয়।
ফলে আমরা অনেক সময় ফ্ল্যাট কিনছি, কিন্তু বাসযোগ্যতা কিনতে পারছি না।
এটাই নগর আবাসন পরিকল্পনার বড় ব্যর্থতার জায়গা।
জলবায়ু পরিবর্তনও বাড়াচ্ছে আবাসনের চাপ
বাংলাদেশের আবাসন সংকটকে শুধু ঢাকা শহরের জমি ও ফ্ল্যাটের দামের হিসাব দিয়ে দেখা যাবে না।
নদীভাঙন, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও জীবিকার সংকটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকা ও অন্যান্য বড় নগরে এই অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ তৈরি করছে নতুন আবাসন সংকট।
যারা জলবায়ুর অভিঘাতে বাস্তুচ্যুত হচ্ছেন, তাদের বড় অংশই নিম্নআয়ের মানুষ। তাদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা না থাকলে তারা অনানুষ্ঠানিক বসতি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের দিকে ঠেলে পড়বেন।
অর্থাৎ আগামী দিনের আবাসন সংকট শুধু ‘কে ফ্ল্যাট কিনবে’- এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না; প্রশ্ন হবে ‘কোথায় এবং কীভাবে লাখ লাখ নতুন নগরবাসী বাস করবে?’
সংকটের মধ্যেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনা
তবে বাংলাদেশের আবাসন খাতকে কেবল সংকটের চোখে দেখলে ভুল হবে।
এখানে বিশাল আবাসন চাহিদা রয়েছে। নির্মাণ খাতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অসংখ্য শিল্প, ব্যবসা ও কর্মসংস্থান। পরিকল্পিতভাবে এই চাহিদাকে কাজে লাগানো গেলে আবাসন খাত অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হতে পারে।
প্রয়োজন শুধু বিলাসবহুল আবাসিক প্রকল্প নয়; প্রয়োজন সাশ্রয়ী আবাসনের বাজার তৈরি করা।
সরকারি জমি ব্যবহার করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য আবাসন প্রকল্প, দীর্ঘমেয়াদি কম সুদের গৃহঋণ, ভাড়াভিত্তিক সামাজিক আবাসন, গণপরিবহনকেন্দ্রিক নতুন নগরায়ণ এবং ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থানভিত্তিক শহর গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
একই সঙ্গে নির্মাণ ব্যয় কমাতে আধুনিক প্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব উপকরণ ও স্থানীয় নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার বাড়াতে হবে।
মধ্যবিত্তকে শহর থেকে তাড়িয়ে দিলে শহর কার?
একটি শহর তখনই টেকসই হয়, যখন সেখানে শ্রমিক থেকে চিকিৎসক, শিক্ষক থেকে উদ্যোক্তা- সব শ্রেণির মানুষের বসবাসের সুযোগ থাকে।
শুধু উচ্চবিত্তের জন্য বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট আর নিম্নআয়ের মানুষের জন্য অনিরাপদ বস্তি- এই দুই মেরুর মাঝখানে যদি মধ্যবিত্তের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়, তাহলে নগর উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে ভাবতেই হবে।
কারণ মধ্যবিত্ত শুধু ফ্ল্যাটের ক্রেতা নয়। তারা এই শহরের শিক্ষক, সাংবাদিক, প্রকৌশলী, কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, উদ্যোক্তা, সংস্কৃতিকর্মী ও অসংখ্য পেশাজীবী।
তাদের জন্য যদি শহরে জায়গা না থাকে, তাহলে সেই শহরের উন্নয়ন কাদের জন্য?
আবাসন দিবসে আসল প্রশ্ন
বিশ্ব আবাসন দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- আবাসন কোনো বিলাসপণ্য নয়। এটি মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
বাংলাদেশে এখন প্রয়োজন নতুন করে আবাসন দর্শন নির্ধারণ করা। শুধু কত হাজার ফ্ল্যাট তৈরি হলো, কতটি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হলো, এই হিসাব দিয়ে আবাসনের সাফল্য মাপা যাবে না।
প্রশ্ন করতে হবে—
- কতজন সাধারণ মানুষ সেই ফ্ল্যাট কিনতে পারল?
- কতজন নিরাপদ ও সাশ্রয়ী ভাড়াবাসন পেল?
- কতজন জলবায়ু-বাস্তুচ্যুত মানুষ নিরাপদ ঠিকানা পেল?
আর সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা- ইট-বালুর এই শহরে একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ কি তার জীবদ্দশায় নিজের একটি মর্যাদাপূর্ণ ঠিকানা পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারবে?
কারণ ভবনের উচ্চতা দিয়ে শহরের উন্নয়ন মাপা যায়; কিন্তু মানুষের নাগালের মধ্যে নিরাপদ ঠিকানা নিশ্চিত না হলে সেই উন্নয়ন কতটা মানুষের- সেটিই আসল প্রশ্ন।

