দুর্গাপূজার ছুটি নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ককে শুধু সরকারি ছুটির সংখ্যা কিংবা অর্থনৈতিক ক্ষতির হিসাব দিয়ে দেখলে এর গভীরতর দিকটি আড়ালে থেকে যায়। বিতর্কের ভেতরে দুটি প্রশ্ন বিশেষভাবে সামনে আসে;ধর্মীয় উৎসবের ছুটির ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর অবস্থান কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং বাংলাদেশের জনপরিসরে বিভিন্ন ধর্মের দৃশ্যমান উপস্থিতিকে কি একই মানদণ্ডে দেখা যায়?
পূজার ছুটি বাড়ানো নিয়ে আপত্তির অন্যতম যুক্তি হচ্ছে অর্থনীতিতে দীর্ঘ ছুটির প্রভাব। কিন্তু একই যুক্তি যদি রাষ্ট্রীয় ছুটির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সব ধর্মীয় উৎসবের ক্ষেত্রেই একই অর্থনৈতিক মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের উৎসবের ছুটিকে অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর বলা হবে, অথচ অন্য ধর্মীয় উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটির দাবি নিয়ে একই প্রশ্ন তোলা হবে না,এমন অবস্থান থেকেই ‘নির্বাচিত হিসাব’এর প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
এখানে সরকারি ছুটির ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। ঈদ, দুর্গাপূজা, বড়দিন বা বুদ্ধপূর্ণিমার ছুটি সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামাজিক জীবনের স্বীকৃতিও বহন করে।একটি বহুধর্মীয় রাষ্ট্রে কোনো ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে সরকারি ছুটি দেওয়া হলে সেটিকে সেই ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের আনুগত্য বা সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ওপর অন্য ধর্ম চাপিয়ে দেওয়ার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ছুটি একটি প্রশাসনিক ও নাগরিক ব্যবস্থা;ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের প্রক্রিয়া নয়।
নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন প্রযোজ্য। কোনো পূজামণ্ডপ হামলার ঝুঁকিতে থাকলে সেখানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা দেওয়া ‘বিশেষ সুবিধা’ কি না—এ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। তবে সমান আচরণ মানেই প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সমসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা নয়। বরং ঝুঁকি অনুযায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বাস্তবিক অর্থে সমান অধিকার নিশ্চিত করার একটি পদ্ধতি।
জনশৃঙ্খলার প্রশ্নেও ধর্মের পরিবর্তে আচরণকে বিবেচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে। পূজার মিছিল যদি অবৈধভাবে রাস্তা বন্ধ করে, তাহলে আইন প্রয়োগ হবে; একইভাবে কোনো ওয়াজ মাহফিল, ঈদের জমায়েত, রাজনৈতিক সমাবেশ বা অন্য কোনো অনুষ্ঠান জনচলাচলে একই ধরনের বাধা সৃষ্টি করলে সেখানেও একই আইন প্রয়োগ করা উচিত। অর্থাৎ নিয়মের ভিত্তি হওয়া উচিত কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় পরিচয় নয়।
পরিবেশের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সামঞ্জস্যের দাবি এসেছে। প্রতিমা বিসর্জনে জলদূষণ হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা যৌক্তিক। কিন্তু পরিবেশগত বিধিনিষেধ কেবল একটি ধর্মীয় আচারকে কেন্দ্র করে কঠোর হলে প্রশ্ন উঠবে শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক, পয়ঃবর্জ্য, নদী দখল কিংবা কোরবানির বর্জ্যের ক্ষেত্রেও কি একই মাত্রার গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে?পরিবেশ রক্ষার নীতি সর্বজনীন না হলে সেটি নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে।
আরও স্পর্শকাতর বিষয় হলো ভারতের মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের সঙ্গে বাংলাদেশের হিন্দুদের দায় যুক্ত করার প্রশ্ন। কোনো দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যকে অন্য দেশের একই ধর্মাবলম্বীদের কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হলে তা ব্যক্তির পরিবর্তে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণের দিকে যেতে পারে। আধুনিক নাগরিকত্বের ভিত্তি ঠিক এর বিপরীত। একজন মানুষ তার নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী; অন্য কেউ একই ধর্মের, একই জাতিগোষ্ঠীর বা একই পরিচয়ের মানুষ—শুধু এই কারণে তার কর্মকাণ্ডের দায় তার ওপর বর্তাতে পারে না।
এই যুক্তিগুলো শেষ পর্যন্ত এসে দাঁড়ায় ‘সমান নাগরিকত্ব’-এর প্রশ্নে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উপস্থিতি যেমন স্বাভাবিক সামাজিক বাস্তবতা, তেমনি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব ও প্রকাশ্য উপস্থিতিকেও কেবল ‘বিশেষ সুবিধা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের অধিকার তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কম-বেশি হওয়ার কথা নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের জন্য যা স্বাভাবিক নাগরিক অধিকার, সংখ্যালঘুর জন্যও তা একইভাবে স্বাভাবিক হওয়াই সমান নাগরিকত্বের মূল পরীক্ষা।
সব মিলিয়ে, পূজার ছুটি কত দিনের হওয়া উচিত এতে সীমাবদ্ধ নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, একই আইন, একই অধিকার এবং একই নাগরিক মর্যাদা কি ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হচ্ছে?
- নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স), সিটিজেন্স ভয়েস

