পে-স্কেল বাড়ানোর উদ্যোগের মূল লক্ষ্যই হল বেতন বৈষম্য কমানো ও সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। কিন্তু বেতন বাড়ানোর এই উদ্যোগ কতটা বাস্তবসম্মত, আর এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ওপর কীভাবে পড়বে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন পে স্কেলে দ্বিগুণেরও বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ
১ জুলাই ২০২৬ থেকে জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫-এর পরিবর্তে ২০২৬ সালের নতুন বেতন স্কেল কার্যকর করা হয়েছে।সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনভাতা ১০০ থেকে ১৪০/১৪৭ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।সর্বনিম্ন স্তরে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সুবিধা পাচ্ছেন অল্পসংখ্যক, চাপে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ২০২৬ সালের জাতিসংঘের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী প্রায় ১৭ কোটি ৭৮ লাখ।দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন পে স্কেলের আওতায় প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত সামরিক ও বেসামরিক সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ অবসরপ্রাপ্তরা রয়েছেন যা মোট জনসংখার মাত্র ১.৮৬ শতাংশ।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের স্বার্থ রক্ষা করা নয় বরং দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পে-স্কেলের আগেই কেন বাড়ে বাজারদর?
কর্মকর্তা কর্মচারীরা সেই বেতন এখনও হাতে পায়নি।নভেম্বর মাসে বিগত কয়েক মাসের বকেয়া সহ সেই বেতন হাতে দেয়া হবে।ধাপে ধাপে মূল বেতন বাড়বে,আর নতুন ভাতার হার কার্যকর হবে ২০২৮ সালের জানুয়ারি থেকে।কিন্তু তাতেই মূল্যস্ফীতি শুরু হয়ে গিয়েছে।
এমনকি চিকিৎসা ও শিক্ষার মতো মৌলিক খাতেও প্রভাব পড়ে।অসৎ ব্যবসায়ীরা পে-স্কেলের গন্ধ পেলেই জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেয়।যা সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার বহু ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। জিনিসপত্রের লাগামহীন দাম,পরিবহনে বাড়তি ভাড়া এক অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি করে।
ঘুষের অভিযোগ যখন জনসেবার বাস্তবতা
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও সুযোগসুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি জনগণ কতটা উপকৃত হচ্ছে তাদের দ্বারা তাও দেখা উচিৎ।বিশাল বিশাল ভবন আছে কিন্তু এসব জায়গায় জনগণের সেবা শূন্য বা তার চেয়েও কম কারণ ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না।
সম্প্রতি বাংলাদেশের দুই বন্ধু সাইফ কবির ও শাহেদ শরিফ আহমেদ ঘুষের দাবির অভিজ্ঞতা থেকে ‘ঘুষ.সাইট’ (Ghush.site) চালু করেছেন যাতে মাত্র ৯ দিনের মধ্যে ৯ হাজার ৬৬৫টি অভিযোগ জমা পড়েছিল।
সরকারি বেতন বৃদ্ধি বনাম বেসরকারি খাতের স্থবিরতা
গত দুই বছরে জাতীয় অর্থনীতি নানা সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে, যার বড় ধাক্কা সামলাতে হয়েছে বেসরকারি খাতকে। এই খাতেই কর্মসংস্থান হয়েছে লাখ লাখ মানুষের, যাদের অনেকেই আয় কমে যাওয়া, চাকরির অনিশ্চয়তা ও বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে রয়েছেন।কাজেই কোটি কোটি সাধারণ মানুষকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়ে মাত্র ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করার প্রস্তাব কতটুকু যৌক্তিক, তা ভেবে দেখা দরকার।
এই অবস্থায় সব থেকে বেশি বিপদে আছেন বেসরকারি খাতের মানুষেরা।বিনিয়োগে স্থবিরতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের উচ্চমূল্য এবং ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের কারণে দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের মূল চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত এমনিতেই থমকে আছে। সরকারি খাতে বেতনভাতা বাড়ানোর সঙ্গে বেসরকারি খাতের সামঞ্জস্য কিভাবে হবে তা আসলে চিন্তার বিষয়।
পে-স্কেল ঘিরে প্রত্যাশা ও বৈষম্যের হিসাব
সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেলের সুপারিশে বেতন বৈষম্য কমানোর দাবি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন সরকারি কর্মচারি দাবি আদায় ঐক্য পরিষদের মুখ্য সমন্বয়ক ওয়ারেছ আলী। তাঁর দাবি, সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং ১:৪ অনুপাতে বেতনকাঠামো পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন।
নতুন নিয়মে দশম গ্রেডে বেতন ৩২ হাজার টাকা। এরপর নবম গ্রেডে ৪৫ হাজার ১০০ টাকা। এতে বেতনের পার্থক্য ১৩ হাজার টাকা। অথচ ২০ গ্রেড থেকে ১১ গ্রেড পর্যন্ত বেতনের পার্থক্য ৫ হাজার টাকা। আবার ২০, ১৯ ও ১৮ গ্রেডে বেতনের পার্থক্য মাত্র ৫০০ টাকা। প্রস্তাবিত কাঠামোয় বিভিন্ন গ্রেডের বেতনেরও বৈষম্য রয়েছে।
বেতন বাড়লেই কি বাড়বে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা?
শুধু বেতন বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়,নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। সরকারের বড় বড় আমলারা চাইলেই অর্থনীতির সব ধরনের স্ট্র্যাটেজি ব্যবহার করে জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রমক্ষমতার মধ্যে রাখতে পারে।বেতন বৃদ্ধি তখনই প্রকৃত স্বস্তি দেবে, যখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং বাড়তি আয় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
কৃষিবিদ নুয়াল আল যুগমী মৈত্রী
রিসার্চার (ফিন্যান্স, ট্রেড ও কমার্স)সিটিজেন্স ভয়েস

